রক মিউজিক নিয়ে গৌতমদার কাজ নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল বাংলা গানের

আমার দু'টি গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। একটি 'মহীনের ঘোড়াগুলি'-র অ্যালবামে ছিল, 'এল কি এ অসময়ে'। এই গানটা আসলে একটা ছবির জন্য তৈরি হয়েছিল। পরে অ্যালবামে জুড়ে যায়। অন্যটি 'আরতি' বলে একটি ধারাবাহিকের জন্য তৈরি। আমাদের একটা স্টুডিও ছিল বেহালা চৌরাস্তার ওপর, 'সাউন্ড অন সাউন্ড', সেখানেই গৌতমদা রেকর্ডিং করতেন। আর আমার মেজ দাদা সঞ্জয় চৌধুরী ছিলেন রেকর্ডিস্ট। তাঁর সঙ্গেও খুব ভাল সম্পর্ক ছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের।

গৌতমদা সুরকার হিসেবে কেমন ছিলেন, তা তো নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না, তাঁর নিজস্ব স্টাইল ছিল, যা স্বতন্ত্র। মানুষ হিসেবেও গৌতমদা ছিলেন খুব সহজ, আর ততটাই মাটির কাছাকাছি। গান গাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই আমাকে ওঁর যে দিকটা আকর্ষণ করেছিল, তা হল ওঁর মেলোডি। কথা এবং সুরের মেলবন্ধন, যা আমার বাবা সলিল চৌধুরীর গানের মধ্যেও পাওয়া যায়, তা ওঁর গানেও পাওয়া যায়। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রি মিউজিক হোক বা রক, তা নিয়ে যে নিরীক্ষা উনি করেছেন, তাও এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে বাংলা গানের। বাবা যেমন জ্যাজ নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, ওঁর 'এই রোকো পৃথিবীর গাড়িটা থামাও'-তে যা দেখা যায়। গৌতমদার কাজেও সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মনটা দেখা যায়। হারমোনির ব্যবহার করেছেন আশ্চর্যভাবে।

শুনতে পারেন: এল কি এ অসময়

'এল কি এ অসময়ে' গানটিতে লম্বা লম্বা ইন্টারলিউড রয়েছে, ওই গানে অর্গান এবং লিড গিটারের সমন্বয় সেই সময় একেবারে নতুন একটা সুরের ধারা এনেছিল। এখন সকলেই এই প্রয়োগটা করে, কিন্তু পথ দেখিয়েছেন ওঁরাই। 'আরতি' ধারাবাহিকের জন্য যে শীর্ষসংগীত বা টাইটেল ট্র‍্যাকটা গেয়েছিলাম, তার রেকর্ডিং হয়েছিল চিত্রবাণী স্টুডিওতে। গানটা ছিল ব্যালাডের মতো। আর কথার মধ্য দিয়ে যেন একটা গল্প বলেছিলেন গৌতমদা। এই দুটো কাজ ওঁর সঙ্গে করে খুব ভাল লেগেছিল‍। আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন অনেকটা, বলেছিলেন, "নিজের স্টাইলে গাও।" তবলার ব্যবহার ছিল ওই গানগুলোতে, কিন্তু তবলাকে ব্যবহার করেছেন এফেক্ট হিসেবে, যেমনভাবে তবলার ব্যবহার আধুনিক গানে হয় সেভাবে করেননি মোটেই। 'এল কি এ অসময়ে' গানটাতে একটা হন্টি‌ং অনুভূতি আছে। আমি অনেকটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে ওই গানটা গেয়েছিলাম, মনে পড়ে।

বাবা খুব অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন গৌতমদাদের। বাবার কাজ থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন গৌতমদাও, নিজের একটা জায়গা তৈরি করেছিলেন‌। আর অসম্ভব ভাল মানুষ ছিলেন‌। বাবার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা করেছেন। শিল্পীদের পরস্পরের প্রতি যে শ্রদ্ধা থাকা উচিত, সেই বিষয়টা ওঁকে দেখে শেখা উচিত নতুন প্রজন্মের। অন্য শিল্পীকে কতটা শ্রদ্ধা করতে হয়, জানতেন গৌতমদা।

 

More Articles

;