তালিবান আতঙ্কেও আফগানিস্তানে পালিত হচ্ছে এই উৎসব

tiasa gupta
৪ মিনিট
তালিবান আতঙ্কেও আফগানিস্তানে পালিত হচ্ছে এই উৎসব

...চাঁদ-বাজারে এ নওরোজের

দোকান বসেছে মোমতাজের

সওদা করিতে এসেছে ফের

শাজাহান হেথা রূপ-পাগল।

হেরিতেছে কবি সুদূরের ছবি

ভবিষ্যতের তাজমহল–

নওরোজের স্বপ্ন-ফল!

কাজী নজরুল ইসলাম 'নওরোজ'– কবিতায় রূপের সওদার কথা বলেছেন। আক্ষরিক অর্থে নওরোজ হল রঙের উৎসব। মিলনের উৎসব। এবং প্রাচীন উৎসব। নব আনন্দে জাগ্রত হওয়ার উৎসব। সবেমাত্র বাংলা পালন করেছে পয়লা বৈশাখ। ক্যালেন্ডারের হিসেব মেনে দিনটা পেছনে চলে গেছে, তবে উৎসবের রেশ এখনও কাটেনি। তাই প্রাসঙ্গিকভাবে এই আবহে এল আর এক প্রাচীন বর্ষবরণ উৎসব 'নওরোজ'-এর কথা। রাষ্ট্রসংঘের সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো 'নওরোজ' উৎসবকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

'নওরোজ' শব্দটা শুনলেই বাঙালির হয়তো কাজী নজরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে। তাঁর বিখ্যাত 'নওরোজ' কবিতায় নজরুল লিখেছিলেন 'রূপের সওদা কে করিবি তোরা আয় রে আয়,/নওরোজের এই মেলায়!' এ ছাড়াও 'নওরোজ' শব্দটি বারবার ফিরে ফিরে এসেছে নজরুলের কবিতায়। নজরুলের সাহিত্যে মুসলমানি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ নানাভাবে উৎকীর্ণ থেকেছে।

আফগানিস্তান, ইরান, মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে ইসলামের উভয় প্রধান শাখা– সুন্নি এবং শিয়াদের অনুসারীরা– নওরোজ ৩,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পালন করে আসছেন। গবেষকরা বলেন, এই উৎসবের মাহেন্দ্রক্ষণে শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে কোনও ভেদ থাকে না। সকলে উৎসবে সামিল হন। রঙে-রসে-আমোদে মাতোয়ারা হন অগণিত মানুষ।

ফার্সি 'নওরোজ' শব্দটির অর্থ নতুন দিন। নওরোজ বিশ্বের প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। জনপ্রিয় এই সংস্কৃতি ও উৎসব আজ শুধু ইরানের জাতীয় উৎসব নয়, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান,

তুরস্ক ও ইরাকেও এই উৎসব জাতীয় পর্যায়ে পালিত হয়। এই উৎসব কম-বেশি পালিত হচ্ছে জর্জিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও। বসন্ত ঋতু শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় এই নববর্ষ।

ইরানি বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনটি হল মহাবিষুব, অর্থাৎ বসন্তের প্রথম দিন। মহাবিষুবের সময় সূর্য সরাসরি নিরক্ষরেখার ওপর অবস্থান করে। এই সময় সূর্যের কিরণ উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে সমানভাবে ছড়িয়ে যায়। খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে ইরানি বর্ষপঞ্জিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারসাধন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ষ শুরুর দিনটি, অর্থাৎ নওরোজকে মহাবিষুবের দিনে স্থির করে দেওয়া। এই বিষয়ে ইরানি বিজ্ঞানী নাসির আল-দিন আল-তুসি কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞা হল: "নববর্ষের প্রথম দিনটি (নওরোজ) হল সেইদিন যে দিন সূর্য মধ্যাহ্নের আগে মেষ রাশিতে প্রবেশ করবে।"

ঠিক কবে এবং কে প্রথম নওরোজ উৎসব চালু করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কবি ফেরদৌসির অমর কাব্য 'শাহনামা' ও ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী ইরানের বাদশাহ জামশিদ ছিলেন এই উৎসবের প্রথম আয়োজক। কেউ কেউ বলেন, ইরানের হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট দ্বিতীয় সাইরাস বা কুরুশ বাবেল বা ব্যাবিলন জয়ের বছর তথা খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৮ সালে সর্বপ্রথম নওরোজকে জাতীয় উৎসব হিসেবে ঘোষণা ও পালন করেন। পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউশের শাসনকালে এই উৎসব পার্সিপলিস প্রাসাদ কমপ্লেক্স বা তাখতে জামশিদে অনুষ্ঠিত হয়।

শোনা যায়, প্রথম দারিউশ নওরোজ উপলক্ষে খ্রিস্টপূর্ব ৪১৬ সনে স্বর্ণমূদ্রার প্রচলন করেছিলেন। আশকানি ও সাসানিয় সম্রাটদের যুগেও নওরোজ উৎসব পালিত হত। যদিও এই উৎসব ঘিরে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত। সে যাই হোক, উৎসবের আঁচ পেতে চোখ রাখতে হবে আফগানিস্তানের দিকে।

পশ্চিম কাবুলের কার্তে সাখিতে সখী শাহ-ই মর্দান মন্দিরের প্রবেশদ্বারে নারীদের দল ভিড় করেন, যেখানে অনেক আফগান প্রতি বছর নওরোজ উদযাপন করতে ভিড় করেন। এই উৎসব বসন্তের আগমনকে চিহ্নিত করে। তাঁরা সিকুইন-সহ রঙিন পোশাক পরে সেলফি এবং টিকটক ভিডিও-র জন্য পোজ দিয়ে মাজার চত্বর রঙিন করে তোলেন।

মার্কিন সেনা দেশে ফিরেছে। তালিবানের দখলে আফগানিস্তান। তাও অনেকদিন হল। তালিব- আমলে এটাই সেখানে প্রথম নওরোজ। তালিবান মানেই আতঙ্ক। তাই আফগান নাগরিকরা ভয় সঙ্গে নিয়ে উৎসবে মাতেন।

ইরানের নওরোজ আবার অন্যরকম। ইরানি নওরোজের দিন বাবা-মা-সহ নিকট-আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে দেখা করে মানুষ। এই সময় বেশ কয়েকদিন ছুটি থাকে এবং ইরানিরা দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সফর করেন এবং কেউ কেউ বিদেশেও যান। অনেক ইরানি নওরোজের প্রথম প্রহর বা প্রথম দিনটি পবিত্র কোনও স্থানে কাটাতে পছন্দ করেন।

নওরোজের দিন অনেকেই পরস্পরকে উপহার বা বখশিশ দিয়ে থাকেন। ছোট শিশুরা বড়দের কাছ থেকে বখশিশ পেয়ে খুব খুশি হয়। নওরোজ ইরানি, কুর্দি, তাজিক ও আজেরি জাতিসহ আরও কয়েকটি জাতির বৃহত্তম জাতীয় উৎসব।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই উৎসব পালিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম ইরান ও আফগানিস্তান। নওরোজের অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় রসনা বিলাসের আয়োজন। কাবুলের রাস্তায় নানা রঙের মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। আফগান বাড়িতে পরিবারগুলো নওরোজের প্রস্তুতি নেয় অনেকদিন আগে থেকেই। এই বছরও তার ব‍্যতিক্রম হয়নি। স্টিউ করা ভেড়া, শাক-সবজির সুগন্ধি পদ কাবুলের রাস্তায় প্লাবিত হয়েছিল এ-বছরও। ছোট বাচ্চারা আফগানিস্তানের একটি জনপ্রিয় নওরোজ খাবার হাফ্ট মেওয়ার জন্য আখরোট তৈরি করে। আঠালো সর্পিল আকৃতির ভাজা মিষ্টির স্বাদ নাকি অদ্ভুত। যিনি খেয়েছেন, তিনি তা অকপটে তা স্বীকার করেন।

পুরনো গ্লানি ভুলে নতুনের আবাহনই 'নওরোজ'। মধুরেণ সমাপয়েতের মধ্য দিয়ে রঙের উৎসব জীবনে যেন আরও রং ছড়ায়। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে দলিল, আর নওরোজ জীবনে লিখে দেবে কোনও রঙিন উপাখ্যান। এখানেই উৎসবের সার্থকতা।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।