চৈতন্য স্মৃতিধন্য সোদপুরে খাতা খুলবে বিজেপি?

Panihati Assembly Election 2026: পানিহাটি বিধানসভা এবার ২০২৬ নির্বাচনে রাজনীতির সবচেয়ে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ কি বদলে দিচ্ছে এই আসনের ভবিষ্যৎ?

inscript
৪ মিনিট
চৈতন্য স্মৃতিধন্য সোদপুরে খাতা খুলবে বিজেপি?

উত্তর ২৪ পরগনার ৩৩টি বিধানসভা আসনের মধ্যে পানিহাটি এবার ভোট রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। একসময় যে আসন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ছিল, আজ তা হেভিওয়েট লড়াইয়ের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। দমদম লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই অঞ্চলে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চতুর্মুখী। বিজেপি প্রার্থী করেছে আরজি কর কাণ্ডে নির্যাতিতার মাকে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক দুই স্তরেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। বাম শিবির থেকে লড়ছেন সিপিএমের তরুণ মুখ কলতান দাশগুপ্ত, আরজিকর আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে তীর্থঙ্কর ঘোষ। তিনি বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র হওয়ায় পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে কংগ্রেস প্রার্থী করেছে শুভাশিস ভট্টাচার্যকে। এই আসনে চারটি প্রধান শক্তির সরাসরি লড়াই তৈরি হয়েছে। জানা যাক, পানিহাটির রাজনৈতিক চরিত্র কেমন, এর ইতিহাস কী, এবং সামাজিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক রূপান্তর ও সাংস্কৃতিক প্রভাবই বা কী ভাবে এই অঞ্চলের পরিচয় গড়ে তুলেছে।

পানিহাটির ইতিহাস শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বহু শতাব্দীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সাক্ষী। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই জনপদ একসময় নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। মধ্যযুগে এখানে নৌপথে বর্ধমান, হুগলি, মেদিনীপুর-সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। চাল, ধান, কাপড় ও মশলার মতো পণ্যের আদান-প্রদান এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। সেই সময় থেকেই এখানে একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গড়ে ওঠে। এবং বিভিন্ন পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস শুরু হয়।

এই অঞ্চলের নাম নিয়েও নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, এখানে একসময় বড় একটি বাজার ছিল, যাকে ‘পণ্যহট্ট’ বলা হতো, যা পরে ধীরে ধীরে পানিহাটি নামে রূপান্তরিত হয়। আবার কেউ মনে করেন, এটি ‘পুণ্যহট্ট’ থেকে এসেছে, যার অর্থ পবিত্র বাণিজ্যকেন্দ্র। নামের উৎপত্তি যাই হোক না কেন, পানিহাটির পরিচয় শুরু থেকেই বাণিজ্য ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

ধর্মীয় দিক থেকেও পানিহাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যদেব পুরী যাওয়ার পথে এখানে আসেন। এই অঞ্চল বৈষ্ণব আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানেই বিখ্যাত চিঁড়ে-দই উৎসব বা দণ্ড মহোৎসবের সূচনা হয়, যা আজও ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অভয়া আন্দোলনের পরিণতি: দায় কার?

Abhaya movement West Bengal politics: অভয়া আন্দোলন কেন আজ রাজনৈতিক বিতর্কে আটকে? স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনের কীভাবে এই পরিণতি হলো? নেতৃত্বের বিভাজন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা কি ন্যায়বিচারের দাবিকে আড়াল করল? এই পরিণতির দায় কার?

পানিহাটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর ধর্মীয় বৈচিত্র্য। এখানে যেমন বৈষ্ণব মঠ ও আশ্রম রয়েছে, তেমনই রয়েছে মসজিদ, সুফি দরগা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। এই সহাবস্থান দীর্ঘদিন ধরে এখানে একটি সহনশীল সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ভোটের সমীকরণকে বহুমাত্রিক করে তোলে।

ব্রিটিশ শাসনামলে পানিহাটির গুরুত্ব বাড়ে। কলকাতার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এখানে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোর দ্রুত উন্নতি হয়। ১৯০০ সালে পানিহাটি পৌরসভা গঠিত হয়। এই সময়ে এখানে শিক্ষা ও শিল্পের প্রসার ঘটে এবং খাদি আন্দোলনের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মকাণ্ডও সক্রিয় হয়ে ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর সোদপুর অঞ্চলে আগমন এই এলাকার রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

স্বাধীনতার পর পানিহাটির রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে বামপন্থী আন্দোলনের প্রভাবাধীন ছিল। শ্রমিক সংগঠন, শিল্পাঞ্চল এবং সংগঠিত জনশক্তির কারণে এই অঞ্চল বাম রাজনীতির একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায়। নব্বই দশকের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অর্থনৈতিক পরিবর্তন, নগরায়ন এবং নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান পানিহাটির রাজনৈতিক চরিত্রে বড় পরিবর্তন আনে। মানুষের সমস্যা ও চাহিদার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। শ্রমিক-কেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি এখন উন্নয়ন, জল, পরিবেশ এবং কর্মসংস্থান বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন রাজনৈতিক দলগুলির কৌশলকেও বদলে দেয়।

২০১১ সালের পর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব পানিহাটিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তৃণমূল কংগ্রেস এখানে সংগঠনগতভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে বামপন্থীদের প্রভাব কমে আসে। স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প এবং সামাজিক কর্মসূচি ভোটারদের বড় অংশকে প্রভাবিত করে। নতুন আবাসন, অভিবাসী জনসংখ্যা এবং শহুরে বিস্তার তৃণমূলের অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

বিজেপি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শহুরে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়িয়েছে। জাতীয় রাজনীতির প্রভাব এবং পরিবর্তিত সামাজিক মনোভাব এখানে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বামপন্থীরাও তাদের সংগঠন এবং আদর্শের ভিত্তিতে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে। কংগ্রেস যদিও তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তবুও কিছু ক্ষেত্রে ভোট বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই অঞ্চলের রাজনীতিতে পারিবারিক ও স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ বা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা ভোটারদের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে প্রার্থী নির্বাচন শুধুমাত্র দলীয় সিদ্ধান্তের উপর নয়, স্থানীয় সম্পর্ক ও পরিচিতির উপরও নির্ভর করে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পানিহাটি আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটারদের আচরণও আগের তুলনায় অনেক বেশি ইস্যুভিত্তিক। উন্নয়ন, চাকরি, নিরাপত্তা, জল ও পরিকাঠামো এখন ভোটের মূল নির্ধারক হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রতিটি নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে এবং কোনো দলই নিশ্চিত অবস্থানে নেই। পানিহাটির দিকে এখন শুধু জেলার নয়, গোটা রাজ্যেরই নজর।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।