২০ জুলাই থেকে ২১ অগাস্ট: পেলেট-কাণ্ডে এক মাসে কী কী ঘটল?
Pellet Gun Use in Delhi Protest: ২০ জুলাই দিল্লির প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ২১ অগাস্ট এফআইআর দায়ের হওয়া পর্যন্ত কী কী ঘটল? আন্দোলনকারীদের শরীরে কীভাবে ছররার আঘাত লাগল, পুলিশ ও RAF-এর ভূমিকা নিয়ে কী তথ্য সামনে এল, হাসপাতালের নথি ও পুলিশের জেনারেল ডায়েরিতে কী উল্লেখ ছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে এফআইআর দায়ের হলো?
২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সংসদের দিকে এগোনোর চেষ্টা করছিলেন যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা। পরীক্ষাব্যবস্থা ও নিট-সহ একাধিক ইস্যুতে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘিরে সেদিন দিল্লিতে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কয়েকজনের শরীরে ছররার আঘাত লাগার অভিযোগ সামনে আসে। সেই ঘটনার এক মাস পর, ২১ অগাস্ট, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় ধর্না দেওয়ার পর দিল্লি পুলিশ অবশেষে এফআইআর দায়ের করল। দেখে নেওয়া যাক, ছররা-কাণ্ডে এক মাসে কী কী ঘটল?
২০ জুলাইয়ের ঘটনার পরই কয়েকজন আন্দোলনকারী অভিযোগ করেন, তাঁদের লক্ষ্য করে ছররা ছোড়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ১৯ বছরের সাহিল লোচাব। ২০২৬ সালের ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে সংসদ অভিমুখে পড়ুয়াদের মিছিলের সময় তিনি ছররার আঘাতে ডান চোখে গুরুতর জখম হন। তাঁকে দ্রুত দিল্লির AIIMS-এর জয়প্রকাশ নারায়ণ অ্যাপেক্স ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ২১ জুলাই তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করে আটকে থাকা ছররার গুলি বের করা হয়। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, চোখের মণি বা pupil মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকেরা দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ বলে জানিয়েছিলেন। দিল্লির নাজফগড়ের বাসিন্দা সাহিল দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওপেন লার্নিং-এর পড়ুয়া। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যতে পুলিশে যোগ দেওয়া।
রাহুল গান্ধী ছররার গুলিতে আহত সাহিলকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন
কিন্তু দিল্লি পুলিশ প্রকাশ্যে ছররা বন্দুক ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে। পুলিশের তরফে বলা হয়েছিল, Rapid Action Force বা RAF-এর কাছে anti-riot equipment-এর অংশ হিসেবে ছররা বন্দুক থাকতে পারে, কিন্তু সেদিন সেটি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে পারছে না। RAF আসলে CRPF-এর একটি বিশেষ বাহিনী, যাদের দাঙ্গা বা বড় ধরনের জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, যদি দিল্লি পুলিশ নিজে পেলেট ছোড়ার কথা অস্বীকার করে, তাহলে আহতদের শরীরে পেলেট এল কোথা থেকে?
এরপর সামনে আসে আরও কয়েকজন আহত ব্যক্তির কথা। শুধু সাহিল নন, শেখ ইরশাদ মনসুরি, নূতন টোপ্পো, এক সাংবাদিক এবং আরও কয়েকজনের শরীরে পেলেট বা projectile-এর আঘাতের অভিযোগ ওঠে। কারও ঘাড়ে, কারও হাতে, কারও মুখে বা শরীরের অন্য অংশে আঘাতের কথা চিকিৎসা নথিতে উঠে আসে।
বিক্ষোভের সময় ২৫ বছরের শেখ ইরশাদ মনসুরির মুখ ও ঘাড়ে ছররার আঘাত লাগে। একাধিক ধাতব ছররা তাঁর শরীরে ঢুকে যায়। পরে তাঁকে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইরশাদের আঘাত ছিল মূলত মুখ, কপাল, গাল এবং নাকের আশপাশে। ছররার আঘাতে তাঁর মুখে একাধিক ক্ষত তৈরি হয়। চোখের বাঁ দিকটিও রক্তাক্ত হয়ে ফুলে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর মুখ ও ঘাড় থেকে ছররা বের করার জন্য অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পরও মুখের ক্ষত শুকোতে সময় লাগছিল এবং চোখের লালভাব পুরোপুরি কাটেনি। প্রায় চার দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ইরশাদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও তাঁর শরীরে রয়ে যায় সেই দিনের আঘাতের চিহ্ন। কপাল, গাল ও নাকের ক্ষত তখনও পুরোপুরি শুকায়নি।
ইরশাদ মনসুরি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pellet Injuries: ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে পরিচিত পেলেট বন্দুক কীভাবে মানুষের চোখ, পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিচ্ছে? ২০১৬-র কাশ্মীর থেকে ২০২৬-এর দিল্লির যন্তর মন্তর—পেলেট বন্দুকের ব্যবহার নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এই অস্ত্রের আঘাতে বহু মানুষ চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন। দিল্লিতেও হাসপাতালের নথিতে পেলেটের আঘাতের তথ্য সামনে এসেছে। দেখে নেওয়া যাক, কাশ্মীর থেকে দিল্লি ‘কম প্রাণঘাতী’ পেলেট বন্দুক কীভাবে, কাদের দৃষ্টি নিয়ে নিয়েছে।
অর্থাৎ ঘটনাটি কোনো একক আহত ব্যক্তির অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে, ২০ জুলাইয়ের পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন রয়েছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের উপর ছররা বন্দুক ব্যবহারের অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করেছিল দিল্লি পুলিশ। তবে পরে সিআরপিএফের তদন্তেও উঠে আসে ভিন্ন তথ্য।
সিআরপিএফের অধীনস্থ র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (RAF) এক জওয়ান দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় ছররা বন্দুক ব্যবহার করেছিলেন। সংসদ মার্গ থানার পুলিশের নথিতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দিল্লি পুলিশের এক ডেপুটি কমিশনারের নির্দেশে র্যাফ ‘অ্যান্টি-রায়ট গান’ থেকে গুলি চালায়। ওই অস্ত্রের ব্যবহৃত ব্যালিস্টিক কার্তুজে প্লাস্টিকের ছররা ছিল। পাশাপাশি, ৫৫ রাউন্ড নন-ইলেকট্রিক্যাল শেল এবং ১৫ রাউন্ড ইলেকট্রিক্যাল শেলও ছোড়া হয়েছিল।
এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে ২০ জুলাই পড়ুয়াদের সংসদ অভিযান ঘিরে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে ছররা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়। পরে ৩০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয়, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
একদিকে পুলিশের প্রকাশ্য বক্তব্যে পেলেট ব্যবহারের বিষয়ে অস্বীকার বা অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পুলিশেরই জেনারেল ডায়রিতে anti-riot gun এবং plastic pellet ব্যবহারের উল্লেখ। ফলে ২০ জুলাইয়ের ঘটনার সরকারি বয়ান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দিল্লি পুলিশ ও CRPF—দুই তরফেই তদন্তের কথা সামনে আসে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সেই দিন কোথায় কোন আধিকারিক ছিলেন, কোন বাহিনী কোথায় মোতায়েন ছিল এবং কী ধরনের crowd-control equipment ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়।
এরপর অগাস্টের শুরুতে ঘটনাটি আইনি মোড় নেয়। ছররার আঘাতে আহতদের কয়েকজন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। crowd control-এর ক্ষেত্রে ধাতব বা অন্য ধরনের kinetic projectile ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এমন অস্ত্রের ব্যবহার কতটা গ্রহণযোগ্য?
পুলিশ ছররার বন্দুকের ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু আরটিআই-এর জবাবে হাসপাতালের নথিতে উঠে আসে অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য। প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ সাকেত গোখলের করা আরটিআই-এর জবাবে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ জানায়, ২০ জুলাই ছররার আঘাতে ৯ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সফদরজং হাসপাতাল জানায়, আরও একজন ছররার আঘাতে আহত হয়েছিলেন। অর্থাৎ, হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, অন্তত ১০ জনের ছররার-আঘাতের তথ্য সামনে এসেছে। এই তথ্য ছররার বন্দুক ব্যবহারের অভিযোগকে আরও গুরুত্ব দেয়। কারণ, ঘটনাটিকে তখন আর কেবল কয়েকজন আন্দোলনকারীর মৌখিক অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না; হাসপাতালের নথিতেও সেই ধরনের আঘাতের উল্লেখ ছিল।
তারপরও সাহিল লোচাবের অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হয়নি। শুরু হয় আরেক দফা টানাপড়েন। সাহিলের অভিযোগ ছিল, তাঁর চোখে ও শরীরে পেলেটের আঘাতের পরও পুলিশ তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নিতে গড়িমসি করছে। তাঁর পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হয়েছে, চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে, কিন্তু ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
এই পরিস্থিতিতেই ২১ অগাস্ট ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সাহিল লোচাব ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় পৌঁছন। তাঁর দাবি ছিল, আহত ছাত্রের অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর করতে হবে। পুলিশি কর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরও যখন বিষয়টির তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি হয়নি, তখন রাহুল গান্ধী থানার বাইরে ধর্নায় বসে পড়েন। তাঁর সঙ্গে কংগ্রেসের আরও নেতারাও ছিলেন।
৭ ঘণ্টারও বেশি সময় ধর্না চলে। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য ছিল, অভিযোগ নেওয়া এবং এফআইআর দায়ের করা পুলিশের দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে বলা হয়েছিল উপরমহলের নির্দেশ না থাকলে এফআইআর করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য ছিল, অভিযোগটি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত চলছিল এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত ২১ অগাস্ট দিল্লি পুলিশ সাহিল লোচাবের অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের করে। তবে এফআইআর হয়েছে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। এখন মূল প্রশ্ন, ২০ জুলাই আসলে কে পেলেট ছুড়েছিল, কোন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল, সেই অস্ত্র কোন বাহিনীর হাতে ছিল এবং কার নির্দেশে তা ব্যবহার করা হয়েছিল। সাহিলের অভিযোগে CCTV ও drone footage সংরক্ষণ, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং শরীর থেকে বের করা পেলেটের ফরেন্সিক পরীক্ষার মতো প্রমাণের কথাও রয়েছে।
প্রতিবাদ দমন করতে রাষ্ট্র কতটা শক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং সেই শক্তি ব্যবহারের পর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এক মাস ধরে ঘুরতে থাকা প্রশ্নটির উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। এফআইআর হয়েছে, কিন্তু অভিযুক্ত এখনও অজ্ঞাত। হাসপাতালের নথি আছে, আহতদের বক্তব্যআ আছে। এখন সেই সমস্ত তথ্যকে একসঙ্গে রেখে তদন্ত কতদূর এগোয়, সেটাই দেখার।






