১৭৩২ টাকা ১০ আনার পৌষ উৎসব কালে কালে যেমন দাঁড়াল

Poush Mela Shantinikatan : অতীতের পৌষমেলার চরিত্রটা অবশ্য কিঞ্চিত অন্যরকম ছিল। ইতিহাসের মহাফেজখানায় ছড়িয়ে আছে তার নানা কাহিনি।

rudranjan
৩ মিনিট
১৭৩২ টাকা ১০ আনার পৌষ উৎসব কালে কালে যেমন দাঁড়াল

ডিসেম্বরের ঝলমলে সকাল। কুয়াশায় মোড়া, নুড়ি বিছানো রাস্তার উপর দিয়ে শোভাযাত্রা চলেছে, উপাসনাগৃহ থেকে ছাতিমতলা পর্যন্ত। সঙ্গে চলেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে ছুটে আয় আয় আয়।" একটু পরে বেলা বাড়বে, হরেক কিসিমের পসরা সাজিয়ে আসবে ছোট বড় নানা দোকানি। জমে উঠবে মেলা। পৌষমেলা। শান্তিনিকেতনের প্রাণের উৎসব। এ নিয়মই চলে আসছে, বছরের পর বছর। ৭ পৌষ এলেই শান্তিনিকেতন সেজে ওঠে উৎসবের রঙে। আনন্দের পৌষ উৎসব ঘিরে তখন মহা সমারোহ। বিপুল হল্লাহাটির এই মেলা। মেলার জনসমাগমের রঙে রেঙে ওঠে সাধারণ মানুষ। অতীতের পৌষমেলার চরিত্রটা অবশ্য কিঞ্চিত অন্যরকম ছিল। ইতিহাসের মহাফেজখানায় ছড়িয়ে আছে তার নানা কাহিনি।

২১ ডিসেম্বর, ১৮৮৩, অর্থাৎ, বাংলা মতে ১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ। ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষালাভ করলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ২০ জন অনুরাগী। দীক্ষাগুরুর নাম, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। সেই থেকেই ৭ই পৌষ তারিখটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে লাগল মহর্ষির জীবনে। ব্রাহ্ম সমাজের তখন শৈশবকাল। দেবেন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় দু'বছরে সমাজের সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল প্রায় পাঁচশোর কাছাকাছি। এই উপলক্ষে তাঁর গোরিটির বাগানে, সমাজবন্ধুদের সমাগমে চলল আনন্দযাপন। পরদিন ব্রাহ্ম মুহূর্তে সকলে উচ্চারণ করলেন ব্রহ্ম ধ্বনি। তাত্ত্বিকরা মনে করেন, এখান থেকেই হয়েছিল মেলার সূচনা। ১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হল শান্তিনিকেতন আশ্রম। এ সময় মেলার পাকাপোক্ত পরিকল্পনা মহর্ষি করেছিলেন বটে, তবে, তা পরিপূর্ণ রূপ পেল ১৮৯৪ সালে। কেমন ভাবে পালিত হয়েছিল সে বছরের পৌষমেলা?

'শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা' প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক রবীন পালের দেখিয়েছেন, উৎসবের প্রাতঃকালে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে আশ্রমিকরা প্রদক্ষিণ করেছিলেন উপাসনা মন্দির। কণ্ঠে তাঁদের ছিল মধুর মঙ্গলগীত। বিশিষ্টদের আসন গ্রহণ ও বক্তৃতার পর দরিদ্রদের সেবায় দান করা হয়েছিল প্রচুর খাবারদাবার ও জমাকাপড়। বেলা গড়াতেই স্থানীয়দের উদ্যোগে আরম্ভ হল কেনাবেচা। গাওয়া হল রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান। সন্ধে নামতেই দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে দেখল উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ, আতসবাজির প্রদর্শন। তারপর বহ্নুৎসব। এ উৎসবের সামগ্রিক খরচ হয়েছিল ১৭৩২ টাকা, ১০ আনা। মেলার যে বিপুল জনসমাগমের চিত্রটি পরবর্তীকালে গড়ে উঠল, তার শুরুয়াত অবশ্য ১৯০১ সালে। এ বছর স্থাপিত হয়েছিল ব্রহ্মবিদ্যালয়। সে কারণেই অন্যান্য বারের তুলনায় মেলার আয়োজন হয়েছিল আরও বড় করে। এক দিনের এ উৎসবে যাত্রাপালা, আতসবাজির প্রদর্শন, কীর্তন এবং বাউল গান - ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

১৯২২ সালে পৌষ মেলার কলেবর আরও বড় হয়। একদিনের পরিবর্তে মেলা চলেছিল দু'দিন ধরে। সঙ্গে ছিল ম্যাকবেথ ও তারকা রাক্ষসীর অভিনয়, বায়স্কোপ, ম্যাজিক লন্ঠন ও কুস্তির মতো নবপ্রবর্তিত বিষয়। মাথায় রাখতে হবে, এ সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জোরদার হচ্ছিল ভারতের স্বাধীনতার দাবি। তা ছাড়াও নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পাল্টাচ্ছিল বিশ্ব রাজনীতির চিত্র। পৌষমেলা যে এসব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে না, তা জানাই ছিল অনেকের। 'নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়?' বিশেষ করে, সে দেবালয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা যখন স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতির একজন 'গার্জেন সেইন্ট', নাম যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

চল্লিশের দশকের প্রথম অব্দে কেবলমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়নি। কাছাকাছি সময়, ভারতের মাটিতে গড়ে উঠছিল ভারত ছাড়ো আন্দোলন। বাংলার মাটিতে ঘটছিল সাম্প্রদায়িক হানাহানি, এবং সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছিল প্রবল অর্থসঙ্কট। মেলা সে সময় স্বাভাবিক কারণে প্রাণহীন ও আনন্দবিমুখ তো ছিলই, এমনকী লাভের গোটা অংশ আমোদ প্রমোদে খরচ না করে তার কিছুটা পাঠানো হয়েছিল মেদিনীপুরের বন্যাত্রাণে। বিশ্বভারতীর কেন্দ্রীয় স্বীকৃতিলাভের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তন আসতে থাকে পৌষমেলার চরিত্রে। আঞ্চলিক থেকে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে তার পরিচিতি। বর্তমানে প্রবীণ নবীন সংঘাতে পৌষমেলাও হয়ে উঠেছে গ্লোবালাইজড। চোখে পড়বে নানা শিল্পগোষ্ঠীর স্টল। জাগো আশ্রমবাসী সকলে জাগো - বলে রবীন্দ্রনাথ যে ডাক দিয়েছিলেন ৭ পৌষ, তা লোকালের বেড়া ভেঙে গ্লোবাল বাজারে পৌঁছেছে। এই উৎসবে সমঝদারেরা যেমন আসেন, তেমনই আসেন হুজুগেরা। ভিড়ের চাপে নাভিশ্বাস ওঠে শান্তিনিকেতনের আদি বাসিন্দাদেরই।

দীর্ঘকালীন সংস্কৃত থেকে থেকে খানিক বিচ্যুত হয়ে ২০২১ সালেও মেলা আয়োজনের কোনও উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও, মেলা না হলেও বজায় থেকেছে পৌষ উৎসবের কর্মসূচি। করোনার বাতাবরণেই আম্রকুঞ্জের জহর বেদী সেজে উঠেছে আলপনার নকশায়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বৈতালিক উপাসনা। উদ্বোধনী উপস্থাপনায় ছিল শুক্ল বিলাবল রাগে রচিত রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গান, “নিত্য নব সত্য তব শুভ্র আলোকময়, পরিপূর্ণ জ্ঞানময়, কবে হবে বিভাসিত মম চিত্ত-আকাশে?”

২০২২ সালে বিশ্বভারতীতে পৌষ উৎসব শুরু হলেও, মেলা বাতিল করা হয়েছে। তবে বিশ্বভারতী উদ্যোগ না নিলেও বোলপুর পুরসভার উদ্যোগে শুরু হয়েছে বিকল্প পৌষ মেলা। সেই মেলা যেমনই হোক, উপাচার্য যেই হোন না কেন, নতুন নতুন বিতর্ক যতই দানা বাঁধুক - পৌষ এলে শান্তিনিকেতনের নিরালা পথ, প্রার্থনা ঘর নতুন উদ্ভাসে জেগে উঠবেই। মানুষের মনেও ডাক আসবে পৌষের। বাউল গানের আবহে মেতে উঠবে রাঙা মাটির পথ। পৌষের থেকে আজও এটুকুই চাওয়া বহু মানুষের।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।