এসআইআর: প্রাক্তন বিচারপতিরও নাম উঠে গেল, কী হবে সাধারণ মানুষের?
West Bengal voter list controversy: সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকায় লক্ষ লক্ষ নাম বাদ। কারও কাছে পাসপোর্ট আছে, তবুও ভোটাধিকার অনিশ্চিত। প্রাক্তন বিচারপতিও রেহাই পাননি। কারণ না জানিয়ে নাম বাদ দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ কী করবে? ট্রাইবুনাল কোথায়, প্রক্রিয়া কী কেউ জানে না।
মধ্যরাতে প্রকাশিত হলো, অতিরিক্ত ভোটার তালিকা। নির্বাচন কমিশনের পরিভাষায় যাকে ‘সাপ্লিমেন্টারি তালিকা’ বলছে মানুষজন। এখনও অবধি যা জানা গিয়েছে প্রায় ৩৭ লক্ষ ‘বিচারাধীন’ বিষয় নিস্পত্তি হয়েছে। এখনও ২৩ লক্ষ নিস্পত্তি বাকি। এক মাসেরও কম সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হতে চলেছে। তবুও, এখনও, রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকায় তাদের অবস্থান কী তা জানেন না। যাঁরা এই বিচারাধীন অবস্থা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, যাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় উঠছে, তাঁরা না হয় হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ যাঁদের নাম বাদ গেল তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে? সেই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকেরা কিছুই বলতে পারছেন না। এখনও ট্রাইবুনাল গঠন হয়নি, গঠন হলেও তা কোথায় হবে, কী ভাবে সেখানে আবেদন করা যাবে, কেউ কিছু জানেন না।
দীর্ঘদিনের উত্তর কলকাতার বাসিন্দা, অভিজিৎ মিত্র এবং তাঁর দুই ছেলের নাম প্রাথমিকভাবে বিচারাধীন ছিল। যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ৩ জনের নামই বাদ দেওয়া হয়েছে। এখনও অবধি তাঁরা জানেন না, কী কারণে বাদ দেওয়া হলো। ৩ জনের ভারতীয় পাশপোর্ট আছে। ৩ জনেই একাধিকবার বিদেশে গিয়েছেন। একজন এই মূহুর্তে ইংল্যান্ডে আছেন কাজের সূত্রে। এই লেখা চলাকালীন উৎকন্ঠিত অভিজিৎ বাবু যোগাযোগ করেছিলেন এবং প্রশ্ন করছিলেন, এরপর যদি ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক থেকে তালিকা ধরে ধরে বিদেশে পাঠিয়ে বলা হয় যে এই মানুষটি ভারতীয় নাগরিক নয়, তখন কী হবে? তাঁর ছেলেকে তো অবৈধ অভিবাসী বলে গণ্য করা হবে। তখন তো ওই দেশ থেকেও বিতারিত করা হবে তাঁর ছেলেকে। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক, তো সমস্ত নথি পরীক্ষা করেই তাঁদের নামে পাশপোর্ট দিয়েছিল। সেই পাশপোর্ট জমা করা সত্ত্বেও তাঁদের যদি এই হয়রানির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তাহলে যাঁদের নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী কোনো নথিই নেই, তাঁদের কী হবে? অভিজিৎ বাবু বলছিলেন, তিনি না হয়, আইন আদালত, তথ্য জানার অধিকার আইন ইত্যাদি জানেন কিংবা এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিফহাল, কিন্তু গ্রামের প্রান্তিক মানুষজন, তাঁরা কী ভাবে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবেন?
শুধু অভিজিৎ মিত্র নন, এইরকম বাদ পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। তার মধ্যে ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি শহিদুল্লাহ মুন্সি। তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি জানেন না এরপর তাঁর কী করণীয়। প্রথম খসড়ায় তালিকায় মুন্সি ও তার পরিবারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আমার সঙ্গে যা ঘটেছিল তা হলো প্রথম এসআইআর বিজ্ঞপ্তি বের হওয়ার পরে, আমরা আমাদের সমস্ত নথি জমা দিয়েছি। আমি, আমার স্ত্রী এবং আমার বড় ছেলে এবং আমার ছেলে, আমরা বুথ লেভেল অফিসারের কাছে আমাদের নথি জমা দিয়েছি। খসড়া এসআইআর-এ আমাদের নাম আসেনি। তাই বোঝাই গিয়েছিল আমাদের শুনানিতে ডাকা হবে। আমরা চিন্তিত ছিলাম। তারপর আমাদের বলা হয়েছিল যে আমরা যাচাইকরণ ইত্যাদির জন্য যেতে পারি। আমাদের এন্টালি অফিসে ডাকা হয়েছিল যেখানে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চালাচ্ছিলেন। যেখানে আমি আবার আমার সমস্ত নথি দিয়েছিলাম এবং আমাদের বলা হয়েছিল, আশা করি এটি এখনই পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং আপনাদের নাম তালিকায় উঠবে। তারপরে দেখা গেল আমার নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই, আমার স্ত্রী এবং সন্তানের নামও বিচারাধীন অবস্থায় দেখানো হয়েছে। আমি যে নথি জমা দিয়েছি, কী ধরনের নথি দেওয়া হয়েছে তার কোনো রসিদ আমাকে দেওয়া হয়নি। তাই তারা পরে প্রত্যাখ্যান করতে চাইলেও যে নথিগুলি অনুপযুক্ত ছিল, আমি সত্যিই জানি না কারণ আমাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি, এখন কী অবস্থায় আমি আছি আমি সেটাই জানি না। কোন গ্রাউন্ডে আমি ট্রাইবুনালে আবেদন করব সেটাই আমি জানি না।
একজন প্রাক্তন বিচারপতির যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। যদিও শেষ যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে প্রাক্তন বিচারপতির পরিবার সমেত নাম উঠেছে। কিন্তু আরও অসংখ্য মানুষ আশঙ্কায় আছেন। নির্বাচন কমিশনকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছিল, যে কোনো ব্যক্তির নাম বাদ দেওয়া হলে, তার কারণ জানাতে হবে। এখনও অবধি কোনো বাদ যাওয়া মানুষই জানেন না তাঁদের নাম কেন বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন যদি কারণ না জানানো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ট্রাইবুনালের শুনানির পরেও যে পরিস্থিতি একই থাকবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? বোঝাই যাচ্ছে ধর্ম দেখে দেখে, লিঙ্গ দেখে দেখে মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন নির্লজ্জের মতো সংবিধানের অবমাননা করে এই কাজটি করে চলেছে।
ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন দফতর থেকে কেন্দ্রীয় শাসকদলের ছাপ দেওয়া একটি নির্দেশিকা প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও কমিশন বলেছে, এটি অসাবধানতা বশত হয়েছে, কিন্তু এই বিষয়টা থেকে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির মধ্যে যে আজকে দৃশ্যত কোনো ফারাক নেই তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা কমিশন করুক না কেন, মানুষের মনে ক্রমশ সন্দেহ দানা বাঁধছে যে বাংলার এসআইআর আসলে বাংলা দখলের প্রক্রিয়া ছাড়া কিছু নয়।
সংখ্যালঘু অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোট, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের মূল ভিত্তি সেটা যে কোনো মানুষ বোঝে। তার সঙ্গে মহিলা ভোটও অস্বাভাবিক হারে বাদ যাওয়ার পিছনে যে একটা রাজনীতি আছে তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। স্বল্প সময়ের মধ্যে এই এত এত সঠিক, জীবিত ভোটারদের মুছে ফেলার কার্যকরী অর্থ হলো পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার হারাবে। গণতন্ত্রে, ভোট দেওয়ার চেয়েও কয়েকটি জিনিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার অন্যতম হলো ভোটাধিকার এবং নাগরিকত্বের অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকা। তাহলে নির্বাচন কমিশন এত মানুষকে কেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করছে?
ভারতীয় জনতা পার্টির দেওয়া রাজনৈতিক বার্তা বুঝিয়ে দেয় যে ভোটার তালিকা থেকে অ-ভারতীয়দের সরানোর জন্য এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হচ্ছে। দলটি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি মুসলমান পশ্চিমবঙ্গে বসতি স্থাপন করেছে, তাই এই অনুশীলনটি প্রয়োজনীয়। কিন্তু সত্যিই কি এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা বাদ যাচ্ছেন, নাকি অভিজিৎ মিত্র, প্রাক্তন বিচারপতি শহিদুল্লাহ মুন্সির মতো বা প্রাক্তন সাংসদ তরুণ মণ্ডলের মতো আসল মানুষেরাই বাদ পড়ছেন?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অনুশীলনটি দেখায় যে কোনো নাগরিকের ভোট কেড়ে নেওয়ার জন্য বিচারব্যবস্থাতেও প্রতিকার নেই। যদিও বেঙ্গল স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা হয়েছে, বাস্তবে অনুশীলনের বৈধতার উপর শাসন করার পরিবর্তে, আদালত আসলে বিচার বিভাগকে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আমলাতান্ত্রিক আচরণে জড়িয়ে নিয়েছে। ভারতীয় নির্বাচনী আইনে এমন কোনো বিধান না থাকলেও এখন তিনটি রাজ্যের জেলা বিচারকরা এই মহড়া চালাচ্ছেন। তার সমস্ত ত্রুটির জন্য, ভারত ১৯৫১-৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারকে উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছে। সাত দশকেরও বেশি সময় পরে এই বাংলার নির্বাচনে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে ভোট দিতে দেওয়া হবে না তা সেই প্রবণতার উদ্বেগজনক বৈপরীত্য কিন্তু বিশ্বের নানান সংবাদমাধ্যমের চোখ এড়াচ্ছে না। কী হবে তা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু প্রাক্তন সমস্ত নির্বাচন কমিশনার দ্যর্থহীনভাবে এই কর্মকান্ডের বিরোধিতা করছেন।
ওদিকে শোনা যাচ্ছে, কলকাতার নিউটাউনে ট্রাইবুনালের কাজ হবে। সেখানে অনলাইন এবং অফলাইনে শুনানি হবে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব শুনানি, সমস্ত বৈধ নথি জমা দিয়েও এত মানুষের নাম বাদ গিয়েছে এবং যাচ্ছে, তারপরও কি এটা বিশ্বাসযোগ্য যে এবার ট্রাইবুনালে সব ঠিক হয়ে যাবে? যদিও যে মানুষেরা বাদ গিয়েছেন তাঁরা কিন্তু বসে নেই। তাঁরা কিন্তু রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। বসিরহাট থেকে সামশেরগঞ্জে মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। পার্কসার্কাস থেকে নাগরিকদের মহামিছিল হয়েছে নির্বাচন কমিশন দফতর অবধি। কোচবিহারের পাতলাখওয়া গ্রামপঞ্চায়েতের মানুষজন তাঁদের ৩/২০ নম্বর বুথের ৪৯১ জন মানুষের নাম বাদ যাওয়ার প্রতিবাদে ৪ ঘন্টা ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন। মানুষ আর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের উপর ভরসা রাখতে পারছে্ন না, তাঁরা নিজেরাই সংগঠিত হচ্ছেন, এবং রাস্তায় নেমে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির যৌথ বাদ দেওয়ার কাজকে বিরোধ করছেন।
নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করে বলেছে, নাগরিকত্বের কারণে তাঁরা জনগণকে বাদ দিচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে, ভোটার তালিকায় একটি নতুন 'অযৌক্তিক অসঙ্গতি' পরীক্ষা প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্য কোনো রাজ্য তার ভোটার তালিকা সংশোধনে এই প্রক্রিয়া দেখেনি। এই পরীক্ষায় পিতামাতার নামের বানান ত্রুটি, একজনের পিতামাতার সঙ্গে বয়সের পার্থক্য যা খুব ছোট বা বড় বলে মনে করা হয়, একজনের দাদু-দিদারর সঙ্গে যথেষ্ট বয়সের ব্যবধান না থাকা বা ছয়টির বেশি সন্তান থাকার মতো বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এত কিছু দেখেও যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি চোখ বুজে থেকে দেখেও না দেখার ভান করছেন, এবং বলছেন
কেন পশ্চিমবঙ্গেই এত অসুবিধা হচ্ছে ?
তখন বলতেই হচ্ছে,
কেউ কথা বোলো না, কেউ শব্দ কোরো না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন গোলযোগ সইতে পারেন না।
পশ্চিমবঙ্গের এই চেহারাই হয়ত আগামীদিনে লড়াইয়ের অন্য মাত্রা দেবে। বাঙালির এই হার না মানা মনোভাব একদিন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁরা দেখিয়েছিল, আজ সেই বাঙালিকেই যখন রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হচ্ছে তখন ধরতে হবে, অচিরেই কেন্দ্রের এখনকার শাসকেরা বুঝতে পারবেন, একটা জাতিকে অপমান করলে কী হয়, তখন হয়ত নির্বাচনের পরে তাঁরাই বলবেন, কেন বাংলাতেই বারবার তাঁরা পরাজিত হন। অর্থনীতির অধ্যাপক শুভেন্দু দাশগুপ্ত একটি স্লোগানের মাধ্যমে সেই সুরটাই বেঁধে দিয়েছেন।
এসআইআর-এর বদলা নাও
বিজেপিকে শূন্য করে জবাব দাও
(লেখকের মতামত ব্যক্তিগত)






