হরমুজ প্রণালী: মাঝ সমুদ্রে মৃত্যুভয়ে দিন কাটছে ২০ হাজার নাবিকের
Strait of Hormuz crisis: পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের খবরে আমরা তেলের দাম দেখি, মিসাইলের সংখ্যা দেখি। কিন্তু সেই যুদ্ধে আটকে পড়া ২০ হাজার নাবিকের কথা কতটা জানি?
স্ট্রেট অব হরমুজ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কতটা জরুরি, তা আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সামনে আসছে এই জলপথে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির বড় প্রভাব। এতে শুধু তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কাই নেই, বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষও। অথচ তাঁদের কথা খুব কমই সামনে আসে। এঁরা হলেন সমুদ্রযাত্রী নাবিক যাঁরা জ্বালানি, খাদ্য, পণ্য, কনটেনার বা গ্যাস এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সচল রাখেন।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলির হিসেব বলছে, স্ট্রেট অব হরমুজ এবং তার আশপাশে এখন প্রায় ২,০০০ জাহাজ আটকে রয়েছে। সেই জাহাজগুলিতে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন অন্তত ২০,০০০ নাবিক। রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাও এই পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন সঙ্কট বলে বর্ণনা করেছে।
হরমুজ প্রণালী এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটগুলির একটি। পৃথিবীর মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই যায়। কিন্তু ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা এবং ড্রোন নজরদারির ফলে এই পথ এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বহু জাহাজকে মাঝসমুদ্রে নোঙর করে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে—না তারা এগোতে পারছে, না ফিরতে পারছে।
এই জাহাজগুলির বেশিরভাগই এখন যুদ্ধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে। মাঝেমধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, আকাশে ড্রোন ওড়ে, কখনও আবার ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ সমুদ্রে এসে পড়ে। নাবিকদের অনেককে জাহাজের বাঙ্কার বা ইঞ্জিন রুমে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ঘুম বলতে প্রায় কিছু নেই। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষাই এখন তাঁদের দৈনন্দিন সঙ্গী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য ও জলের সঙ্কট। জাহাজে যে পরিমাণ রসদ নিয়ে যাত্রা শুরু করা হয়েছিল, তা তো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এখন সেই সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে নাবিকদের জল মেপে খেতে হচ্ছে, খাবার ভাগ করে খেতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাইরের সাহায্য পৌঁছনোও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সহায়তা পৌঁছে দিতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকেও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
এই ২০,০০০ মানুষের বড় অংশই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, ইউক্রেন, রাশিয়া-সহ নানা দেশের শ্রমজীবী নাবিক। তাঁদের পরিবার দূরে বসে দিন গুনছে। ফোনে ঠিকমতো যোগাযোগ নেই, ইন্টারনেট নেই, জাহাজের অবস্থানও অনেক সময় নিরাপত্তার কারণে গোপন রাখা হচ্ছে। ফলে বাড়ির মানুষ জানতেই পারছেন না, তাঁদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না। জাহাজে আটকে থাকা নাবিকদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কবে বাড়ি ফিরতে পারবেন, আদৌ ফিরতে পারবেন কি না।
এক ভারতীয় ক্যাপ্টেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁরা এই যুদ্ধের নীরব শিকার। যুদ্ধে তাঁরা সরাসরি জড়িত নন, কিন্তু সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়েছেন তাঁরাই।
তাঁরা বন্দুক হাতে নেননি, যুদ্ধও শুরু করেননি। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্য সচল রাখার কাজ করতে গিয়েই আজ তাঁরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে আটকে পড়েছেন।
সমস্যা আরও বাড়চ্ছে শ্রম আইনের জায়গায়। বহু নাবিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের বদলি পাঠানো যাচ্ছে না। অর্থাৎ, আইনত কাজের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও তাঁরা কাজ থেকে বেরোতে পারছেন না। কেউ কেউ মজুরি নিয়েও অনিশ্চয়তায়। আবার এই অসহায়তার সুযোগ নিয়ে প্রতারকরাও সক্রিয়—নিরাপদে বের করে আনার নামে টাকা দাবি করছে, এমনকী ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অর্থ চাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন এবং নাবিক ইউনিয়নগুলি ইতোমধ্যে প্রতিবাদ শুরু করেছে। গ্রিসে নাবিকেরা ধর্মঘট করেছেন, আন্তর্জাতিক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন বিশেষ ক্ষতিপূরণ, বাড়তি মজুরি এবং বিপজ্জনক রুটে যেতে অস্বীকার করার অধিকার দাবি করেছে। কিন্তু কাগজে নানা চুক্তি বা আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে হাজার হাজার মানুষ এখনও সমুদ্রেই আটকে রয়েছেন। কারণ যুদ্ধ থামেনি, আর বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিও সহজে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে পারছে না।
আমরা পেট্রল পাম্পে গিয়ে জ্বালানি পাই, বাজারে বিদেশি পণ্য কিনি, রান্নার গ্যাস পাই—কিন্তু সেই সরবরাহের নেপথ্যে যে হাজার হাজার নাবিক মাসের পর মাস সমুদ্রে জীবন কাটান, তাঁদের কথা সাধারণত কেউ ভাবে না। যুদ্ধ না থাকলে এই শ্রম আর এই মানুষগুলির কথা খুব একটা চোখে পড়ে না।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের খবর আমরা সাধারণত মিসাইল, ড্রোন বা ক্ষয়ক্ষতির হিসেব দিয়ে বুঝি। কিন্তু হরমুজের এই পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিল, যুদ্ধের আরেকটি দিকও আছে—কত মানুষ চুপচাপ বিপদের মধ্যে আটকে পড়ে, যাদের খবর
খুব কমই সামনে আসে।






