মরমীয়া সুফি সাধনার ক্ষেত্র কাশ্মীর

Anasuya Sen
৩ মিনিট
মরমীয়া সুফি সাধনার ক্ষেত্র কাশ্মীর

কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে কয়েক হাজার সুফি তীর্থস্থান | কাশ্মীর উপত্যকা 'পীরাওয়ার' নামেও খ্যাত | 'পীরাওয়ার' কথার অর্থ হলো সুফি সাধকদের উদ্যান | বলা হয়, সুফি অতীন্দ্রিয়বাদীদের ধর্মপ্রচারের কারণেই কাশ্মীর উপত্যকার জনগণ ইসলাম ধর্মকে নিজের করে নিয়েছিলেন | এইসব ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কুবরাভি সুফি সাধক মীর সঈদ আলি হামাদানি এবং তাঁর শিষ্যগণ | কাশ্মীর চর্চার আতিনায় অন্যতম বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ চিত্রলেখক জুৎসির এমনটাই মত | এইসব সুফি সাধকরা কোনওএকটি স্থানে আবদ্ধ হয়ে থাকতেন না | তাঁরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে ধর্মের বাণী নিয়ে মানুষের দুয়ারে উপস্থিত হতেন | তাঁদের হাত ধরেই কাশ্মীরের গ্রামে গ্রামে নিত্য নতুন কারুশিল্প ও শিল্প-চর্চার দক্ষতার শিক্ষা পৌঁছেছিল | অনেকের মতে কাশ্মীরের বিখ্যাত সুফি সাধক শাহ-ই-হামাদান-এর সঙ্গী হয়ে এসেছিল একদল পরিযায়ী শিল্পী, হস্তলিপি - বিষারদ, স্হপতি ইত্যাদি | তারাই কাশ্মীর উপত্যকায় কাঠ-খোদাই, শাল-বয়ন, কার্পেট বয়ন, পুস্তকের ও চিত্রের উপড়ে অপূর্ব সুন্দর হস্তাক্ষরের অলঙ্করণ ইত্যাদি শিল্প-রীতির প্রবর্তন করেন | এআইডিওকম ভাবে কাশ্মীরের সমাজ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন সুফি সাধকরা |

সুফি অতীন্দ্রিয়বাদ এবং ভ্রাতৃজ্ঞানে সবাইকে একসঙ্গে আপন করে নিয়ে চলার শিক্ষার আবেদন আজও এই সংঘাতপূর্ণ সমস্যাসঙ্কুল কাশ্মীরের বুকে সেখানকার মানুষদের আঘাত সইবার শক্তি জোগাচ্ছে |

সেক্ষেত্রে সুফি-সাধনা এবং তার মূল্যবান দিকগুলি প্রতি আলোকপাত করা বিশেষ প্রয়োজন |

একথা বলা যায় যে একদিকে কাশ্মীরি পন্ডিত ও অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ-বিসম্বাদ চলতে থাকলেও, সামগ্রিক ভাবে উপত্যকায় ধর্মীয় সহনশীলতার বাতাবরণ এখনও মুছে যায়নি | এই সহনশীলতার মূলত দুটি উৎস ------ বিবিধ জনগোষ্ঠীর দ্বারা গড়ে ওঠা সমাজ এবং অন্যদিকে সুফি সাধকদের মানবতাবাদী শিক্ষার প্রভাব |

ইসলাম ধর্মমতের আঙিনা থেকে উঠে এলেও সুফি সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধর্মমতের মানুষদের জন্যেও এক মিলনক্ষেত্র রচনা করেছে | এর প্রকৃষ্ট প্রমান হচ্ছে সুফি ধর্মাবলম্বীদের বাৎসরিক 'উরস' উৎসব | একজন প্রাচীন সুফি-সাধকের মৃত্যুবার্ষিকীর এই উৎসবে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষরাই অংশগ্রহণ করেন | কাশ্মীর উপত্যকায় এমন বহু তীর্থস্থান আছে যেখানে কাশ্মীরি মুসলিম কাশ্মীরি পন্ডিত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা শ্রদ্ধা-ভক্তি নিবেদন করতে যান | এর অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো চতুর্দশ শতাব্দীর সাধক শেখ নুরুদ্দিন ওয়ালির স্মৃতি-বিজড়িত চারার-এ-শরিফ | অন্য দৃষ্টান্তগুলো হলো আয়িশামুকমে অবস্থিত বাবা জইনুদ্দিনের দরগা এবং শ্রীনগরে অবস্থিত শেখ হামজা মাখদম-এর দরগা |

কাশ্মীরের সুফি-সংস্কৃতি যে শুধুমাত্র বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সৌহাদ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তা নয় | এটি একইসঙ্গে পুরুষ শাসিত সমাজের মধ্যে মহিলাদের জন্যেও এক মুক্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে | এরফলে কাশ্মীরের মহিলারা এখন বৃহৎ মসজিদ ও ধর্মস্থানে উপস্থিত হয়ে নামাজ পাঠ করতে পারেন, যেমন ----- দস্তগীর সাহিব, মখদুম সাহিব, হযরতবাল মসজিদ ইত্যাদি |

কাশ্মীর উপত্যকা বর্তমানে লাগাতার সংঘাত, সংঘর্ষ ও মৃত্যুর সাক্ষী | স্বজন হারানোর ব্যাথা সেখানকার মানুষদের জীবনে গভীর ভাবে রেখাপাত করেছে | কিন্তু সুফি-সংস্কৃতির শিক্ষার প্রভাবে উপত্যকার বহু মানুষ বিশ্বাস করেন যে জীবনের কোনও আঘাত, কোনও স্বজন-বিয়োগ-ব্যথাই অর্থহীন নয় | পরম কল্যাণময় ঈশ্বরের করুনার স্পর্শ সবকিছুর মধ্যেই আছে এবং সেই করুণাই তাদের জীবনে দুঃখ-বেদনার থেকে উত্তরণ ঘটাবে | তাই সুখে-দুঃখে সম্পদে-বিপদে উপত্যকার মানুষেরা বিভিন্ন তীর্থ -স্থানের প্রতিটি অনুষ্ঠানে সমবেত হয়ে পরলোকগত সাধকদের পুন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন | বিগত বছরে (২০২০) সেখানে গুজব ছড়িয়েছিল যে আকাশ থেকে একটি গ্রহপিণ্ড খসে পড়বে এবং পৃথিবীকে পিষ্ট করে দিয়ে যাবে | কিন্তু সেই গুজবকে উপেক্ষা করেই কাশ্মীরের ভক্তরা সমবেত হয়েছিলেন চারার-এ-শরিফ তীর্থস্থানে প্রার্থনা জানাতে | ঈশ্বরের অমোঘ বিধান, তাঁর নির্দেশিত পথ মূল্যবোধকে যারা নম্রতার সঙ্গে মেনে নেন এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে যারা থাকেন তারাই সেখানে প্রকৃত মুসলমানের গুনবিশিষ্ট বলে বিবেচিত এবং সম্মানিত হন ---- এমনটাই ব্যাখ্যা করেছেন বিশিষ্ট গবেষক তারিক রামাদান | এদিক থেকে দেখলে বিবেচনায় আসে যে সুফি-সংস্কৃতি যেন জাগতিক আসক্তির বিষয়গুলি থেকে মুক্ত হতেই তৎপর |

তবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন সময় সময় সুফি আন্দোলের প্রবক্তারা রাজনীতির আঙিনাতেও অবতীর্ণ হয়েছেন | দৃষ্টান্তস্বরূপ ইতিহাসের পাতা থেকে বলা যায় যেমন ---- ফরাসী ও ইটালিয়া উপনিবেশবাদ ও তার প্রভুত্বের বিরুদ্ধের কোয়াদিরিয়া আন্দোলনে সামিল হয়েছিল আলজেরিয়ার অধিবামীবৃন্দ এবং লিবিয়ার মানুষের যোগদান করেছিল সানুসি সুফি আন্দোলনে |

এই সানুসি সুফি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওমর-আল-মুখতার | তাঁর জীবন এবং সংগ্রামকে আধারিত করে ১৯৮১ সালে একটি চলচিত্র নির্মাণ হয়েছিল Lion of the Desert --- এই নামে সেই থেকে তিনি কাশ্মীরি যুবসমাজের কাছে একজন বীর হিসাবে পরিগণিত হন |

ঠিক এইরকম ভাবে ডোগরা শাসনের হাত থেকে মুক্তিলাভের আন্দোলনেও সুফি-ধর্মনেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন|

কাশ্মীর উপত্যকার ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা করেন এমন অনেক গবেষক ব্যক্তি আছেন যারা কাশ্মীরি অস্মিতাকে, 'কাশ্মীরিয়ৎ' বলে বর্ণনা করেন | এই 'কাশ্মীরিয়ৎ' - এর অন্যতম ভিত্তিভূমি হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেকার সৌভ্রাতৃত্ত্বা ----যেটি নিঃসন্দেহে সুফি ধর্মচর্চার অবদান |

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।