নিয়মের বেড়াজালের মধ্যে থেকেই রাজনীতিটা চালিয়ে যাব: অধ্যাপক নীলাদ্রি রঞ্জন চ্যাটার্জী

Transgender Ammendment Bill পাস হওয়ার পর পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে মানুষের মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব আরও একবার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। পিতৃতন্ত্রের নিগড়ে আবদ্ধ সমাজের বহু বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে লড়াইয়ের মাধ্যমে পাওয়া ২০১৪ সালের সর্বোচ্চ আদালতের রায় যেটুকু আশা-ভরসার সঞ্চার করেছিল, একদশক পরে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ সেই অধিকারকে কেড়ে নিল।

বোধিসত্ত্ব সরকার
১৬ মিনিট
নিয়মের বেড়াজালের মধ্যে থেকেই রাজনীতিটা চালিয়ে যাব: অধ্যাপক নীলাদ্রি রঞ্জন চ্যাটার্জী

২০২৬ সালের মার্চ মাস ভারতের লিঙ্গ-রাজনীতি ও মানবাধিকারের ইতিহাসে এক বড়সড় ধাক্কা। ১৩ মার্চ লোকসভায় পেশ হওয়ার পর, মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে—২৪ মার্চ লোকসভায় এবং ২৫ মার্চ রাজ্যসভায়—কোনো গভীর বিতর্ক ছাড়াই কেবল ভয়েস ভোটে পাস হয়ে যায় অত্যন্ত বিতর্কিত 'Transgender Amendment Bill'। এর পরপরই, রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এই বিলটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়।

সমাজের বহু বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া ২০১৪ সালের সর্বোচ্চ আদালতের (NALSA) ঐতিহাসিক রায় যেটুকু আশা-ভরসার সঞ্চার করেছিল—এক দশক পরের এই নতুন আইন যেন সেই অধিকারকে অনেকটাই কেড়ে নিল। সুপ্রিম কোর্ট যেখানে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে 'সেল্ফ-আইডেন্টিফিকেশন' বা স্ব-ঘোষিত আত্মপরিচয়ের অধিকার ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের অংশ, সেখানে ২০২৬-এর এই নতুন আইন সেই অধিকার বাতিল করে চিফ মেডিক্যাল অফিসারের নেতৃত্বাধীন 'মেডিক্যাল বোর্ড'-এর সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করেছে। ট্রান্সজেন্ডার সংজ্ঞাকে সংকুচিত করে কেবল ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায় এবং ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করায় আজ তীব্র সংকটে ট্রান্সমেন, ট্রান্সউইমেন কিংবা নন-বাইনারি মানুষেরা। কাউকেও ট্রান্স হতে "প্রলুদ্ধ" বা "প্রভাবিত" করলে কঠোর শাস্তির মতো বিপজ্জনক ধারা যুক্ত করার ফলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার শাখার তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এই আইন। NALSA রায়ের স্পষ্ট লঙ্ঘন হওয়ায় আইনটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বড়সড় আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

লিঙ্গচেতনা (Gender) আর যৌনপরিচয়ের (Sexuality) সূক্ষ্ম ফারাক বুঝতে রাষ্ট্র যে কতটা অক্ষম, এই আইন তারই প্রমাণ। বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আইনের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক অভিঘাত নিয়ে আলোচনার জন্য ইনস্ক্রিপ্টের এই বিশেষ আলাপচারিতায় কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক নীলাদ্রি রঞ্জন চ্যাটার্জী-র মুখোমুখি হয়েছেন বোধিসত্ত্ব সরকার। অধ্যাপক চ্যাটার্জীর দীর্ঘদিনের অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে 'Gender Studies'।

বোধিসত্ত্ব: নমস্কার স্যার। ইনস্ক্রিপ্টে আপনাকে স্বাগত।

নীলাদ্রি: নমস্কার।

বো: আমার স্কুল জীবনের একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করছি। আমি বরাবর ছেলেদের স্কুলেই পড়েছি। সেখানে এমন বহু সহপাঠী ছিল, যাদের হাঁটাচলা বা কথাবার্তার ধরন ঠিক তথাকথিত 'পুরুষোচিত' ছিল না। এর ফলে তাদের নানাভাবে উত্যক্ত করা, খ্যাপানো এবং শারীরিক ও মানসিক হেনস্থা করার একটা অঘোষিত সামাজিক অনুমোদন যেন দেওয়াই ছিল। সেই কিশোরদের এই বিড়ম্বনায় তথাকথিত শিক্ষকদের উৎসাহও ছিল চোখে পড়ার মতো।

আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন আমার এক সহপাঠীকে কৌতুহলবশত জিজ্ঞাসা করেছিলাম—যে নিজেকে সমকামী মনে করত—"তুই এরকম মেয়েদের মতো হাঁটিস কেন? মেয়েদের মতো কথা বলিস কেন? ঈশ্বর তো তোকে ছেলেদের মতো শরীর দিয়েছেন।" ওর সংক্ষিপ্ত অথচ সংযত উত্তর ছিল, "ঈশ্বর তো আমাকে একটা মনও দিয়েছেন। সেই মন যদি আমাকে ছেলে হিসেবে মেনে নিতে না পারে?"

আমার প্রথম প্রশ্ন এখানেই—শরীর আর মন, যৌনতা (Sex) আর লিঙ্গ (Gender)-এর মূল পার্থক্যটা কোথায়? আর এই পার্থক্যটা বোঝার প্রয়োজনই বা আমাদের কেন?

নী: আমাদের একদম শুরুতেই জেনে নিতে হবে যে, আমাদের শরীরটা জৈবিক (biological) হলেও, সমাজ বা আমরা কিন্তু শরীরটাকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে বুঝি বা চিনি। সেই কারণেই নারী ও পুরুষের এই অনড় বিভাজনটা কিন্তু 'প্রকৃতি' নিজে করে না। আমাদের প্রকৃতিকে এক ধরনের রাজনীতির প্রেক্ষিতে বোঝানো হয়—সেটা হলো পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতি। পিতৃতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজকে দুটো নির্দিষ্ট ভাগে বা লিঙ্গে ভাগ করা খুব প্রয়োজন।

বো: বাইনারি (Binary) বা দ্বিমেরু তৈরির একটা সচেতন প্রয়াস বলতে চাইছেন?

নী: হ্যাঁ। কারণ সমাজকে এই দুটো ভাগে ভাগ করে রাখলে 'ও ভালো, এ খারাপ'—এই আধিপত্যের রাজনীতিটা সারাক্ষণ চালিয়ে যাওয়া যায়। এই বিভাজনটার পিছনে কিন্তু বিজ্ঞানের খুব একটা হাত নেই, হাত আছে পিতৃতন্ত্রের।

বো: কিন্তু আমরা তো একজন শিশুর যৌনাঙ্গ দেখেই বিচার করি যে সে ছেলে নাকি মেয়ে। সেক্ষেত্রে বিজ্ঞানের হাত নেই কেন?

নী: এই কারণেই নেই, কারণ সব পুরুষ কি সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম? না। সব নারীও কি সক্ষম? তাও না। কিন্তু যে পুরুষ কোনো কারণে প্রজনন করছেন না, সমাজ তো তাকে হিজড়া বলছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের পুরুষত্বের পরাকাষ্ঠা হিসেবে পুজো করা হচ্ছে। তাহলে শুধু যৌনাঙ্গের উপর ভিত্তি করে একটা মানুষের সামাজিক লিঙ্গ পরিচয় তৈরি করব কেন?

যদি যুক্তি দেওয়া হয় যে প্রজননের জন্য এটা দরকার, তাহলে তো একটা অদ্ভুত ধাঁধা তৈরি হচ্ছে। একদিকে আমি পুরুষকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করছি এই জন্য যে তার ঔরসে সন্তান সৃষ্টি হবে; আবার অন্য দিকে যে পুরুষ সন্তান সৃষ্টি করছে না বা ব্রহ্মচর্য পালন করছে, তাকে পুরুষত্বের চরম নিদর্শন হিসেবে পুজো করা হচ্ছে। তাই শুধু যৌনাঙ্গ দেখে নারী বা পুরুষ নির্ধারণ করাটাই একটা মস্ত বোকা বোকা কাজ। কিন্তু এই বোকা বোকা কাজটাই আমরা তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ ভীষণ আগ্রহের সঙ্গে শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে করে আসছি।

বো: লিঙ্গ সচেতনতাকে কোনো নির্দিষ্ট যৌন পরিচয়ের মোড়কে আজীবন বহন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অভিসন্ধিটা কোথায়?

নী: যদি তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তোমার পরিচয় (identity) কী? তখন তুমি কী বলবে? আমার বার্থ সার্টিফিকেট-এ লেখা আছে 'male'। সার্টিফিকেটটা তো তুমি লেখোনি। তার মানে আশ্চর্যভাবে, জন্মের পর তোমার ওপরে একটা লিঙ্গ পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হলো। সেটা নিয়েই তুমি বড় হচ্ছ এবং সেটা নিয়ে তুমি স্বাচ্ছন্দ্যেও রয়েছ।

আজকে যদি তুমি জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে 'দলিত' ঘোষণা করে দিতাম? তখন তোমার অসুবিধা হতো। তখন তুমি বলতে যে এই পরিচয় আমি মানব না, বা তখন বুঝতে পারতে যে এই পরিচয়টা তোমার উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ যে লিঙ্গ পরিচয় তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো, সেই পরিচয়টা যেহেতু সমাজের আধিপত্যশীল বা মূলধারার পরিচয়, তাই তুমি কোনো অত্যাচার বা বৈষম্য টের পাচ্ছ না।

আমাদের এবারে বোঝার দায়িত্ব হলো—যে পরিচয়টা নিয়ে আমি এত খুশি রয়েছি, সেটা কি আমি নিজে অর্জন করেছি? বোধহয় না। তাহলে নিজে অর্জন না-করা পরিচয় নিয়ে বোধহয় আমার গর্ব করার কোনো জায়গা নেই। ঠিক যেমন, চাপিয়ে দেওয়া পরিচয় নিয়ে সমাজের অন্য কারও হীনমন্যতায় ভোগারও কোনো কারণ নেই।

বো: 'Gender' আর 'Sex'-কে সমার্থক ভাবানোর এই চেষ্টা থেকে আমরা বিরত হচ্ছি না কেন?

নী: এই চেষ্টা আজকের নয়, বহু প্রাচীন। আমরা শুধু যৌনাঙ্গ দেখেই কাউকে পুরুষ (male) অথবা নারী (female) ঘোষণা করে দিলাম। অর্থাৎ, কেবল শরীরকে কাজে লাগিয়ে সমাজ আমাদের নারী বা পুরুষ হিসেবে মেনে নিতে শিখিয়েছে। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, পিতৃতন্ত্র আমাদের এইভাবে দুটো আলাদা ধরনের শরীর নির্দিষ্ট করে দিল, যাতে বংশবৃদ্ধি বা প্রজননের চাকাটা সচল থাকে।

অথচ নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ (Second-wave feminism) আমাদের বুঝিয়েছিল যে, sex is biological, gender is social আবার পরবর্তীকালে নারীবাদের তৃতীয় তরঙ্গ (Third-wave feminism) এসে আমাদের বোঝাল যে, Sex ও কিন্তু Social।

বো: আর যাঁরা প্রজনন করবেন না, তাঁরা কি আদৌ এই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হলেন?

নী: পিতৃতন্ত্র একসময় বুঝল যে, সবাই বোধহয় সন্তান জন্ম দিতে বা প্রজনন করতে চাইছে না। তখন সেখানে ধর্ম চলে এলো। ধর্ম এসে বলল, তুমি প্রজনন না করেও সমাজে মাথা তুলে বাঁচতে পার, যদি তুমি আমার তৈরি নির্দিষ্ট বাক্সে চলে যাও। তুমি চার্চের নান (Nun) হয়ে গেলে, ফাদার (Father) বা ব্রাদার (Brother) হয়ে কোনো আশ্রমে যোগ দিলে—তাতে আর কোনো অসুবিধা রইল না।

তার মানে দাঁড়াল, প্রজনন করলে তুমি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে; আর প্রজনন না করলে তোমাকে ধর্মীয় কাঠামোর ভিতর গিয়ে মাথা উঁচু করতে হবে।

বো: কিন্তু যাঁরা সাধারণ সমাজেই (secular community) থাকবেন, অথচ প্রজনন করবেন না?

নী: বিরাট বড় সমস্যা! (হাসি)। কারণ, তাঁদের ফেলার মতো কোনো নির্দিষ্ট বাক্স সমাজ খুঁজে পাওয়া গেল না। আর ঠিক এইখান থেকেই শুরু হয় এক ধরনের সামাজিক চাপ। চারপাশ থেকে বলা শুরু হয়—"অনেক তো হলো, এবার বিয়েটা কর।" অর্থাৎ, একটা না একটা চেনা বাক্সে তোমায় ঢুকতেই হবে।

আর যদি কেউ বিয়ে না করে, তবে অবধারিত প্রশ্ন ধেয়ে আসে—"আপনি বিয়ে করেননি কেন?" আমার নিজের জীবন থেকেই একটা অভিজ্ঞতা বলি। আমাকে শুনতে হয়েছে, "আপনি তো অধ্যাপক?" হ্যাঁ। "ইংরেজি বিষয়ের?" হ্যাঁ। "বিদেশ ঘুরেছেন?" হ্যাঁ। "তাহলে তো নিশ্চয়ই সিগারেট খান?" না। "ও, মদ তো নিশ্চয়ই খান?" না। "তাও ইংরেজি অধ্যাপক?" হ্যাঁ। "তার মানে নিশ্চয়ই নাস্তিক?" না।

ব্যাস, সমাজ চিন্তায় পড়ে গেল! যে লোকটা গড়গড় করে ইংরেজি বলছে, অথচ মদ-সিগারেট খায় না, আবার ঈশ্বরও বিশ্বাস করে; অথচ কোনো বিজেপিকে সমর্থন করে না (হাসি)—তাকে নিয়ে সমাজ এখন কী করবে? তার উপর আবার বিয়েও করেনি!

তার মানে দাঁড়াল, সমাজে টিকে থাকতে গেলে শুধু জেন্ডারের ভিত্তিতেই কিন্তু একটা গোটা পরিচয়ের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়। তারপর তার সঙ্গে এক এক করে জাত (caste), শ্রেণি (class), ধর্ম (religion) এবং জাতীয়তা (nationality) যোগ হতে থাকে। ফলে সমাজ এভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত যে, একটা বাচ্চা জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে একটা নির্দিষ্ট লিঙ্গ পরিচয় সেঁটে দেওয়া হবে এবং সে সেই পরিচয়কে কোনো প্রশ্ন না করে আজীবন মুখ বুজে পালন করে যাবে।

বো: তৃতীয় লিঙ্গ বা 'Third Gender' পরিচয়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটটা ঠিক কীরকম?

নী: ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব, খুব সুপরিকল্পিতভাবে একসময় কিছু মানুষকে খোজাকরণ বা ক্যাসট্রেট (castrate) করা হয়েছিল। তবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে সেটা কোনো উদারপন্থী সিদ্ধান্ত ছিল। আসলে রাজরাজড়াদের হারেম (harem) পাহারা দেওয়ার জন্য এমন কিছু পুরুষের দরকার ছিল, যাঁরা হারেমের মহিলাদের সন্তানসম্ভবা করতে পারবেন না।

কিন্তু যাঁদের এভাবে খোজাকরণ করা হলো, তাঁরা তো ছিলেন রাজকর্মচারী। সেই কারণে তাঁদের একটা উঁচু স্থান দেওয়া হয়েছিল। ফলে ওই যুগে এক ধরনের সংস্কৃতি তৈরি হলো, যেখানে এই খোজাকৃত পুরুষ—যাঁদের 'ইউনাক' (eunuch) বলা হতো—তাঁরা বেশ ভালো সামাজিক মর্যাদা পেতেন। এই ব্যবস্থাটা মোটামুটি আঠারো শতক পর্যন্ত চলেছিল।

বো: যে সমাজ একসময় তৃতীয় লিঙ্গকে এত উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠা দিল, তথাকথিত সম্মান জানাল—সেই সমাজই ক্রমশ তাঁদের প্রান্তিক হয়ে যেতে বাধ্য করল কেন? কেনই বা তাঁদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করার প্রক্রিয়া শুরু হলো?

নী: এর একটা পর্যায়ক্রম আছে। কারণগুলি যথাক্রমে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক।

প্রথমত, ১৮৬০ সালে লর্ড মেকলে ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে (IPC) ৩৭৭ ধারা লিখে দিলেন। সেখানে বলা হলো—'সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স এগেইনস্ট দ্য অর্ডার অফ নেচার' অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌনমিলন। এই 'প্রকৃতির নিয়ম' জিনিসটা আসলে কী? ওটা খায় না মাথায় দেয়! কারণ, আমি একটি পত্রিকায় পড়ছিলাম যে, প্রায় নয়শো প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে সমকামী সম্পর্কের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। তাহলে সমকামিতাকে 'অপ্রাকৃতিক' বলাটা তো বেশ মুশকিল। আসলে লর্ড মেকলে যেটাকে প্রাকৃতিক বা 'ন্যাচারাল' বলছিলেন, সেটা হলো কেবল সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে করা নির্দিষ্ট এক ধরনের যৌনক্রিয়া।

দ্বিতীয়ত, লর্ড মেকলের উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশের প্রজাদের (colonial subject) যৌনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা। যে নিয়ন্ত্রণ লর্ড মেকলে নিজের দেশে চালু করেছিল, সেটাই তারা ভারতের মতো উপনিবেশেও চাপিয়ে দিতে চাইল। এর ফলে পুরুষে-পুরুষে সমকামিতা বেআইনি হয়ে গেল। তবে এখানে একটা ভীষণ জরুরি বিষয় মনে রাখতে হবে—আইনে কেবল পুরুষে-পুরুষে সমকামিতাকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, লেসবিয়ানিজম বা নারীদের সমকামিতাকে নয়। কারণ, ওদের মাথায় বোধহয় এটা আসতই না যে মহিলাদের নিজস্ব কোনো যৌনজীবন থাকতে পারে! ফলে লেসবিয়ানরা এক অদ্ভুত অদৃশ্য জগতের বাসিন্দা হয়ে রইলেন—তাঁরা আইনের চোখে বৈধও ছিলেন না, আবার অবৈধও ছিলেন না। আইনে তাদের কোনো জায়গাই নেই। যেন তারা অদৃশ্য।

তৃতীয়ত, ১৮৭০ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা বুঝল, ভারতে তাদের নিজেদের তৈরি বিলিতি জিনিসপত্র তদ্দিন বেশি মাত্রায় বেচতে পারা যাবে না, যতদিন না ভারতের অত্যন্ত সমৃদ্ধ নিজস্ব হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পের বাজারকে ধ্বংস করা যাচ্ছে। তো কীভাবে ধ্বংস করা যায়? যেসব জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষ এই চমৎকার শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের এক এক করে 'ক্রিমিনাল ট্রাইব' বা জন্মগত অপরাধী জাতি হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া হলো। এইভাবেই তৈরি হলো কুখ্যাত 'ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট' (CTA)।

এই আইনের আওতায় বহু উপজাতি ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে দুটো বিশেষ জনগোষ্ঠীকেও জুড়ে দেওয়া হলো—একটি হলো সেক্স ওয়ার্কার বা যৌনকর্মী, এবং অন্যটি হলো হিজড়া সম্প্রদায়। আজ আমরা যে প্রশ্ন করি—হিজড়ারা কেন রাস্তায় এভাবে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে? এর পিছনে একটা ইতিহাস আছে। ১৮৭০ সাল থেকে তাঁদের এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তাঁরা আচমকা দেখলেন যে তাঁরা আইনের চোখে জন্মগত অপরাধী হয়ে গিয়েছেন!

তাঁদের কেন অপরাধী তকমা দেওয়া হলো? কারণ, আমাদের মহামান্য রাষ্ট্র বলল যে, এরা নাকি ছোট ছোট ছেলেদের অপহরণ (kidnap) করে খোজাকরণ করে হিজড়া বানিয়ে দেয়! যার কোনো বাস্তব প্রমাণ ছিল না। স্রেফ মনগড়া একটা ধারণার উপর ভিত্তি করে এটা করা হয়েছিল, ঠিক যেমন আজকের দিনে 'লাভ জিহাদ' নিয়ে জিগির তোলা হয়। একই উপায়ে প্রচার করা হলো যে, যৌনকর্মীরা ছোট ছোট মেয়েদের ধরে এনে জোর করে এই পেশায় নামায়। মূলত এই জায়গা থেকেই ভারতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অপরাধী করে তোলার গল্পের শুরু।

বো: এবার এই নতুন আইনের (Transgender Amendment Act) প্রসঙ্গে আসি। ২০১৪ সালের সর্বোচ্চ আদালতের যে ঐতিহাসিক 'NALSA রায়', রাষ্ট্র তো সেটা শেষ পর্যন্ত মেনেই নিতে পারল না।

নী: ২০১৪ সালের NALSA রায়ে সুপ্রিম কোর্ট একটা বিরাট বড় কাজ করেছিল। তার মধ্যে হয়তো কিছু আইনি ত্রুটি থাকতে পারত, কিন্তু সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটা ছিল স্ব-নিয়ন্ত্রণ বা 'সেল্ফ-ডিটারমিনেশন' (self-determination)। অর্থাৎ, তুমি নিজেকে যে পরিচয়ে ডাকবে, তুমি সেটাই। এখানে কোনো medical interventio-এর বাধ্যবাধকতা ছিল না—যাকে বলা হয় নিজের অনুভূতি অনুযায়ী লিঙ্গ পরিচয় (self-perceived gender identity)।

কিন্তু এতখানি সুখ তো দেওয়া যাবে না! কেন পারে না? কারণ, এই স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের ফলে আমরা যারা নিজেদের জন্মগত লিঙ্গ পরিচয়েই (পুরুষ বা নারী হিসেবে) বড় হয়েছি, আমাদের সঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের একটা মস্ত বড় তফাত তৈরি হচ্ছিল। আমরা তো আমাদের জেন্ডার বা লিঙ্গ পরিচয় নিজেরা বেছে নিইনি; কিন্তু এই রায়ের ফলে ওরা সেটা বেছে নেওয়ার আইনি অধিকার পাচ্ছিল।

বো: তার মানে এক ধরনের বাড়তি সুযোগ বা প্রিভিলেজ -এর প্রশ্ন এসে যাচ্ছিল...

নী: অথচ এটা আদতে কোনো বাড়তি সুযোগের কথা নয়, এটা তো সকলের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। আমাদের ভারতের প্রতিটি নাগরিকেরই একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর এই অধিকারটা দেওয়া হোক একটা বয়সের পরে। ধরো, কারও বয়স একুশ বছর হলো; তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হোক—তুমি পুরুষ হিসেবে থাকতে চাও, নাকি নারী হিসেবে থাকতে চাও? নাকি এই দুটো চেনা কাঠামোর বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ লিঙ্গ-মুক্ত (gender-free) হয়ে বাঁচতে চাও?

সেই choice টা সবার জন্য দেওয়া হোক। আমরা যেমন স্রেফ একটা অ্যাফিডেভিট করেই নিজেদের নাম বদলে ফেলতে পারি, ঠিক তেমনই সহজ নিয়মে জেন্ডার পরিচয়ও বদলে ফেলার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এতে তো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

বো: যে নতুন আইন বা সংশোধনী এল, সেখানে তো বলাই হচ্ছে যে তুমি নিজে আর নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার দাবি করতে পারবে না, রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে। তার মানে পুরো বিষয়টার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল?

নী: পুরো পরিণতিটাই অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ, এখন সংজ্ঞা তৈরি করে দিচ্ছে যে কে ট্রান্সজেন্ডার আর কে নয়। এর চেয়ে অবান্তর বা ভুল কাজ আর কিছু হতে পারে না। রাষ্ট্র ধরে নিচ্ছে—যাঁরা ইন্টারসেক্স (intersex বা জন্মগতভাবে উভয়লিঙ্গ), তাঁরাই কেবল ট্রান্স। অথচ একজন ইন্টারসেক্স ব্যক্তি ট্রান্সজেন্ডার হতেও পারেন, আবার নাও পারেন। তাছাড়াও আরও একটা সাংঘাতিক বিষয় এখানে যুক্ত করা হয়েছে—তুমি নিজেকে তখনই ট্রান্স বলতে পারবে, যদি তুমি নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের অংশ হও।

বো: আর সেই সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীগুলি তো মূলত হিন্দু সংস্কৃতির অংশ...

নী: তাহলেই দেখুন পুরো আইনটা নিজের ভিতরেই কতটা স্ববিরোধী। একদিকে রাষ্ট্র বলছে যে তুমি নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিজে নির্ধারণ করতে পারবে না; অথচ অন্য দিকে বলা হচ্ছে, তুমি যদি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ে যোগ দাও, তবে তোমার সেই পরিচয় মেনে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, সেই সম্প্রদায়টি যদি হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত হয়, তবে রাষ্ট্রের কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই!

আর এই মানসিকতার জেরেই সম্প্রতি মুম্বইতে পুলিশ হিজড়া সম্প্রদায়ের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এক নাবালিকা ট্রান্স মেয়েকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে। অথচ যে দুজন ট্রান্স মহিলাকে ধরা হলো, তাঁদের পদবি কিন্তু 'খান'। পুলিশ দাবি করছে, তাঁরা নাকি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী! এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে এর পিছনের আসল উদ্দেশ্যটা ঠিক কী।

বো: ওই নাবালিকা ট্রান্স মেয়েটি হয়তো পারিবারিক সমস্যার কারণেই ওদের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল?

নী: একশো বার। নিজের মা-বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য সে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে এসেছিল। রাষ্ট্র সেই নিরাপদ আশ্রয়টুকুই কেড়ে নিল।

বো: স্যার, নতুন নিয়ম অনুযায়ী নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে পরিচয় দিতে গেলে এখন ঠিক কী ধরনের চিকিৎসাগত পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হবে?

নী: তোমাকে অবশ্যই লিঙ্গ পরিবর্তন অস্ত্রোপচার (sex reassignment surgery) করাতে হবে।

বো: কিন্তু নিজেকে কোনো চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার আতশ কাঁচের তলায় না ফেলাটাও তো একজন মানুষের মৌলিক অধিকার?

নী: তাহলে রাষ্ট্র তোমাকে আর ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না। অথচ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে এতদিন কিন্তু অস্ত্রোপচার ছাড়াই আইনি স্বীকৃতি পাওয়া একেবারেই সম্ভব ছিল। এখন রাষ্ট্রের কাছে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে গেলে নিজের যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করিয়ে সার্টিফিকেট দেখাতে হবে, যা এতদিন দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।

বো: কিন্তু এই বাধ্যতামূলক চিকিৎসার পক্ষে একটা যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, সঠিক পরিচয়পত্র না থাকলে নাকি ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের যথেচ্ছ অপব্যবহার হতে পারে।

নী: এগুলি অত্যন্ত অবান্তর যুক্তি। অনেকেই বলেন, তাহলে তো সবাই ট্রান্সজেন্ডার হয়ে যাবে! আমি বলি, তাহলে আপনিই হয়ে যান না? কাল থেকে আপনি শাড়ি পরে রাস্তায় বেরোন, বলুন যে আপনি ট্রান্স হয়ে গিয়েছেন। পারবেন তো? অত সহজ নয়! একটা ভিতরের তাগিদ এতটাই প্রবল হয় যে, একজন মানুষের আর শার্ট-প্যান্ট পরে চলতে ভালো লাগে না। এটা তো কেউ শখ করে বা অপব্যবহার করতে করে না! তার মানে আমরা আইনি ক্ষেত্রে একটা অহিংস ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছিলাম, নতুন আইন করে সেটাকে আবার হিংস্র করে দেওয়া হলো।

বো: আমরা একদিকে দেখলাম 'এসআইআর' এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণের একটা চেষ্টা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ল; আবার অন্যদিকে এই ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী বিলটি পাস হয়ে গেল। এই ধরনের পদক্ষেপগুলি কি নিছকই সরকারের আলাদা আলাদা সমান্তরাল কাজ, নাকি কোথাও গিয়ে এদের মধ্যে একটা আদর্শগত মিল (convergence) তৈরি হচ্ছে?

নী: মিল যে হচ্ছে, সেটা তো একদম পরিষ্কার। মুম্বইয়ের ওই গ্রেপ্তারি থেকে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল। আমরা আসলে আস্তে আস্তে একটা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সংখ্যালঘুদের—বিশেষ করে মুসললিমদের—যত রকমভাবে সম্ভব একঘরে করা, বিচ্ছিন্ন করা এবং নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আর এবার সেই রাজনীতির কোপে ট্রান্স মুসলিমরাও চলে এলেন।

এতদিন তো ট্রান্স মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিষ্টান—সবাই একসঙ্গেই লড়াই করছিলেন। এখন আবার ভাগাভাগি তৈরি করে বোঝানো হচ্ছে—হিন্দু ট্রান্স হলে ভালো ট্রান্স, আর মুসলিম ট্রান্স হলে সে নাকি ট্রান্সই নয়! এখানে কোনো যুক্তি মানা হচ্ছে না, সমতা বা গণতন্ত্রের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এখন স্রেফ একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনার মধ্য দিয়ে সবকিছু চালনা করা হচ্ছে। ফলে এই নাগরিক তালিকা সংশোধন (SIR) এবং ট্রান্স অ্যাক্ট সংশোধনী আইন—আলাদা কোনো বিষয় নয়, ওই গ্রেপ্তারির ঘটনাতেই এরা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে।

বো: আজকে এই যে এরকম একটা সংশোধনী আইন পাস হয়ে গেল, জেন্ডার স্টাডিজ কি নতুন করে আবার গুরুত্ব পাবে?

নী: আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। আমরা ভেবেছিলাম যে আইনি লড়াইয়ে অন্তত কিছু কিছু জায়গায় আমাদের জয় এসেছে, তাই জেন্ডার স্টাডিজ হয়তো ধীরে ধীরে তার প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। কিন্তু এই আইন পাস হওয়ার পর তা আবার ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। কারণ, যে জয়টা আমরা পেয়েছিলাম, সেটা আমাদের হাত থেকে আবার ছিনিয়ে নেওয়া হলো। তার মানে আমাদের লড়াইটা এখন আরও তীব্র হবে, কারণ এর বিরুদ্ধে আমাদের লাগাতার কথা বলে যেতেই হবে।

আমি যতদূর জানি, এই আইনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আদালতে ছটা কি সাতটা জনস্বার্থ মামলা (PIL) জমা পড়েছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত জল কতদূর গড়ায়। যা হয়েছে, সেটা চূড়ান্ত রকমের অগণতান্ত্রিক। আর এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখন যুদ্ধ চলতে থাকবে।

ফলে, জেন্ডার স্টাডিজের একজন মানুষ হিসেবে আমার বড় দায়িত্ব হলো সারাক্ষণ মানুষকে একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া—আপনি যদি নিজের জন্মগত পরিচয় নিয়ে খুব সুখে আর শান্তিতে থাকেন, তবে একটু ভেবে দেখুন যে আপনার সেই আনন্দটা আদৌ কতটা যুক্তিযুক্ত। আমরা আসলে সবাই একটা অদৃশ্য ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে রয়েছি। যাঁরা এই পরিকাঠামোটাকে ঘর বলে মানতে চান না, তাঁরা আসলে এখনও পর্যন্ত সামাজিক দেওয়ালগুলির মুখোমুখি হননি বা সেখানে কোনো ধাক্কা খাননি। যেদিন ধাক্কা খাবেন, সেদিন বুঝবেন যে ওটা একটা দেয়াল ছিল।

আসলে দেওয়ালে যতক্ষণ না আপনার পিঠ ঠেকছে, ততক্ষণ এই বন্দি ঘরটাকেও আপনার একটা খোলা মাঠ মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে ঘরে বন্দি রয়েছি। তাই আমার প্রধান কর্তব্য হলো সবাইকে সারাক্ষণ মনে করিয়ে দেওয়া—খুব স্বাধীন বোধহয় আপনি নন। আর এই সত্যটা আপনি যত তাড়াতাড়ি বুঝতে শুরু করবেন, তত দ্রুত রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠবেন। সেটাই আমার কর্তব্য।

বো: নতুন শিক্ষানীতি চালু করার পর সিলেবাসে যে ধরনের বড় রদবদল আনা হয়েছে, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনি একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসরুমে কতটা স্বাধীনতা পাবেন?

নী: আমাকে স্বাধীনতা কেউ থালায় সাজিয়ে দেবে না, স্বাধীনতা আমাকে নিজের জোরে বের করে আনতে হবে। তার মানে রাষ্ট্র অনুমোদিত যে সিলেবাস আমি পড়াব, সেখানে একটা নির্দিষ্ট পেপার আছে—'ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম' (Indian Knowledge System)। এটা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র এখন খুব আনন্দে মেতে রয়েছে।

তো এই 'ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম' পড়ানোর সময় আমি যদি ক্লাসে 'বাবরনামা' পড়াই, আশা করছি তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সেখানে যদি আমি 'কামসূত্র' পড়াই, আশা করছি কোনো অসুবিধা হবে না। সেখানে যদি আমি বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান পড়াতে শুরু করি—যেমন ধরা যাক 'পদ্মপুরাণ', যেখানে অর্জুন ও কৃষ্ণের যৌনমিলনের কথা রয়েছে। আমরা যখনই রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের কথা বলি, আমাদের হয়তো এই ধরনের অন্য আখ্যানগুলিও মনে রাখা উচিত। আসলে আমরা তো ভালবাসা বলতে স্রেফ সম্পত্তি করাই বুঝি।

আমাকে যে সিলেবাস পড়ানোর চাকরি দেওয়া হয়েছে, তার নিয়মকানুনের ফাঁকফোকর কীভাবে বের করতে হয়, তা আমরা খুব ভালো করেই জানি। আর নারীবাদ বা ফেমিনিজমের ভাষায় একেই বলে 'সাবভার্সন' বা ভিতর থেকে নিয়মের রূপান্তর। আমি নিয়ম মানব, কিন্তু সেই নিয়মের বেড়াজালের মধ্যে থেকেই আমি আমার নিজের রাজনীতিটা চালিয়ে যাব।

এবার রাষ্ট্র বলুক, ঠিক কী ধরনের 'ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম' তোমার দরকার? ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম মানে কি শুধুই রামায়ণ আর মহাভারত? বেশ, চলো রামায়ণ-মহাভারতই পড়া যাক। আমি তার ভিতর থেকেও 'কুইয়ারনেস' (queerness বা প্রথাভাঙা লিঙ্গচেতনা) খুঁজে বের করে আনব। কাজটা সহজ নয়। এটা ওরা যেটা করল এটা খুব বোকা বোকা একটা কাজ করল। আমরা এই কাঠামোর মধ্যে থেকে যে জন্যে এই কাঠামোটা তৈরি করা হয়েছিল সেটাকে ধ্বংস করব।

বো: ধন্যবাদ স্যার, অনেকটা সময় দিলেন। এইরকম একটা জটিল চক্রব্যূহের মধ্য থেকে বেরোনোর পথ যে আপনারাই খুঁজে বের করবেন, সেটা আজ ভীষণভাবে প্রয়োজন—আমাদের জন্য এবং আমাদের মতো আরও অনেকের জন্য।

নী: এই ধরনের মুক্ত আলোচনাগুলি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্তরে না হয়, তাহলে আর কীসের শিক্ষকতা করলাম? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে আমি যদি ছাত্র-ছাত্রীদের মনে প্রশ্ন তুলতেই না শেখালাম, তবে আর পড়ালাম কী! আমি কি শুধুই শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে বলব? ওসব তো স্কুলে হয়, কিছুটা কলেজেও হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা হওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ হওয়া উচিত ছাত্র-ছাত্রীদের এটা শেখানো—কী করে চারপাশের চেনা সমাজকে প্রশ্ন করতে হয়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মাছ-ভাত খেয়ে দেবী বরণ আর কী কী বিশেষ রীতি পালন করা হয় ২২০ বছরের রাজকৃষ্ণ মিত্র বাড়ির দুর্গাপুজোয়?

Rajkrishna Mitra House Durga Puja: দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের বাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গাপুজোতে ২২০ বছর ধরে একই রীতি মেনে পুজো হয়ে আসছে। তবে এই পুজোর বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীনত্বে নয়, দেবীর ভোগ, নৈবেদ্য, পারিবারিক খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে দশমীর বরণ; প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব কিছু নিয়ম। যার মধ্যে অন্যতম, দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে দেবীকে বরণ করেন বাড়ির মহিলারা। আবার যে পুজোয় একসময় বলির রীতি ছিল, সেই পুজোতেই এখন বলির পরিবর্তে দেওয়া হয় চিনির নৈবেদ্য।

ইস্টবেঙ্গলের জয়ে কোমা ভেঙে চোখ মেলেছিলেন শচীনকর্তা

S D Burman's love for East Bengal: শচীনকর্তার একমাত্র পুত্র ‘পঞ্চম’ বাবার কানের কাছে চিৎকার করে উঠলেন— “বাবা… ইস্টবেঙ্গল জিতসে… পাঁচ-শূন্য!” আর তারপরই ... যে মানুষটি নির্জীব পড়েছিলেন, যাঁর স্নায়ু কোনো ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না—তাঁর চোখের কোণ সামান্য কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে শচীনকর্তা তাঁর অক্ষিপট মেলে তাকালে। ব্যাস, ওইটুকুই। এর পর আর কোনোদিন তিনি চোখ খোলেননি।

যে দুর্গাপুজোয় সাধারণের প্রবেশ ছিল নিষেধ, সেখান থেকেই যেভাবে হলো সর্বজনীন পুজোর শুরু

history of Durga Puja in Kolkata: ব্রিটিশ কলকাতায় সেই পুজোর ধরন বদলাতে শুরু করল; বদলাল গেট-টুগেদারের ধরনও। আর কলকাতার দুর্গাপুজো আদতে হয়ে উঠল কোম্পানির পুজো। মানে কোম্পানির লোকেদের তোয়াজের জন্য করা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান। সেই পুজোর থেকে ইংরেজদের মনোরঞ্জন করা প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

প্রেমে, ঈর্ষায়, ভ্রমণে মারিয়া কোদামার চোখে কেমন ছিলেন বোর্হেস?

Jorge Luis Borges: ২০১৯ সালে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে লেখকের বিধবা স্ত্রী মারিয়া কোদামা তাঁদের অনন্য সম্পর্ক ও একান্ত যাপনের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। মারিয়া কোদামা মৃত্যুবরণ করেন ২০২৩ সালের ২৬ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন পাবলো হিয়েনেরা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৯ সালে, পরে লা নাসিয়ন (La Nacion) পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। সাক্ষাৎকারটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ সাহিত্য ও বোর্হেসবিশেষজ্ঞ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন।

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।