ট্রাম্পের পরীক্ষা, বিশ্ব রাজনীতিতে ঠিক কী প্রভাব ফেলবে মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচন?

US Midterm Elections: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে? ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, ইজরায়েলের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে এই ভোটেই?

Tanvia Barua
৮ মিনিট
ট্রাম্পের পরীক্ষা, বিশ্ব রাজনীতিতে ঠিক কী প্রভাব ফেলবে মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম ইলেকশনের ফলাফল পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। কংগ্রেসে কোন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তার উপর নির্ভর করতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতি, বিদেশে অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগের স্বাধীনতাও। তাই এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সময়ে ইজরায়েলেও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দুটি দেশের ভৌগোলিক দূরত্ব প্রায় ছয় হাজার মাইল হলেও তাদের নির্বাচনী রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ইজরায়েলে কে সরকার গড়বেন এবং আমেরিকার কংগ্রেসে কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবেন, এই দুই প্রশ্নের উত্তর মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় প্রতি চার বছর অন্তর। কিন্তু রাষ্ট্রপতির মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের যে নির্বাচন হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। ৩ নভেম্বর এই নির্বাচন হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন না। ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটের সদস্যদের নির্বাচন করেন। মার্কিন কংগ্রেসের এই দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তার উপর নির্ভর করে আগামী দু'বছরে রাষ্ট্রপতি কতটা স্বাধীনভাবে নিজের নীতি কার্যকর করতে পারবেন।

প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই প্রতি দু'বছর অন্তর নির্বাচন হয়। অন্যদিকে, সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে সাধারণত এক-তৃতীয়াংশের নির্বাচন হয়। ফলে এই নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির দল কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, আবার বিরোধী দলের হাতেও ক্ষমতার ভারসাম্য চলে যেতে পারে।

তাঁর দল যদি প্রতিনিধি পরিষদ অথবা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তাহলে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাঁকে বিরোধী দলের বাধার মুখে পড়তে হবে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির তদন্ত, সরকারি কাজকর্মের জবাবদিহি এবং বিভিন্ন বিষয়ে শুনানির সুযোগও বাড়বে।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। কংগ্রেসে পাস হওয়া কোনো বিলের বিরুদ্ধে তিনি ভেটোও দিতে পারবেন। আবার রাষ্ট্রপতির ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জনগণ আগামী চার বছরের জন্য দেশের নেতৃত্ব বেছে নেন। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁরা সেই নেতৃত্বের কাজের মূল্যায়ন করার সুযোগ পান। নির্বাচনের ফল তাই শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করে না, রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কতটা শক্তিশালী থাকবে, তারও ইঙ্গিত দেয়।

এই নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে মূলত অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং তাঁর প্রশাসনের একাধিক নীতিকে ঘিরে অসন্তোষের কারণে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়েও পড়ছে।

মার্কিন ভোটারদের কাছে বিদেশনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যাকে উপেক্ষা করা যায় না। পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ, পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদনের খরচ বাড়ে। তার প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যের একটি বড় ভিত্তি ছিল অর্থনীতি শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি এবং আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্তের ফলে যদি মার্কিন নাগরিকদেরই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এই অসন্তোষকে নির্বাচনী সমর্থনে পরিণত করতে চাইবেন।

তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য সাফল্যকে শুধু ট্রাম্পবিরোধী মনোভাবের ফল বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য পরিষেবা, অভিবাসননীতি এবং প্রতিটি আসনের প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান ইরানের একাধিক সামরিক পরিকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশটির নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে হত্যা করেছে। কিন্তু এত বড় সামরিক আঘাতের পরেও ইরানের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। বরং সংঘাতের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এখান দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহণ ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারত-সহ বহু আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়তে পারে। পরিবহণ ও উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব মুদ্রাস্ফীতিতেও পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতি নিয়ে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ কংগ্রেস নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন, তাহলে যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক সহায়তা এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসে আরও কঠোর প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলালেই যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ সামরিক ও বিদেশনীতি পরিচালনায় রাষ্ট্রপতির হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে।

আবার ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সম্পর্কও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ইজরায়েলের নিরাপত্তার প্রধান রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ তাঁর সেই রাজনৈতিক অবস্থানেরই অংশ। কিন্তু যুদ্ধের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

ইজরায়েলের সংসদ নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী, অতি-দক্ষিণপন্থী এবং অতি-ধর্মীয় দলগুলির জোট পেয়েছে প্রায় ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ৪৮। আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলি সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে কোনো শিবিরের পক্ষেই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ নয়। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলির সমর্থন বা অন্য দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ক্ষমতা হারালে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর সরকারের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের চাপ বাড়তে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলিও রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, বিরোধী নেতা আইজেনকোটও ইরানকে ইজরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করেন। অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান শুধু নেতানিয়াহুর দলেরই নয়। ইজরায়েলের রাজনীতিতে এই বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে। তবে সামরিক পদক্ষেপ কতটা বাড়ানো হবে এবং যুদ্ধকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে।

নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু যদি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকেন, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার মাধ্যমে তিনি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের পক্ষে যুক্তি দেখাতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলিকে একজোট করার চেষ্টা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে পারে।

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ঘনিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। তবে কখনও কখনও ট্রাম্প নেতানিয়াহুর আচরণ নিয়ে সমালোচনাও করেছেন।

নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে নতুন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাম্পকে নতুন করে সম্পর্ক গড়তে হবে। নতুন নেতৃত্ব ইরানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করলেও সামরিক পদক্ষেপের মাত্রা নিয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে ইজরায়েলের নির্বাচন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক সম্পর্কের ভবিষ্যতেরও প্রশ্ন।

এই নির্বাচনের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলে তিনি নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে চাইতে পারেন। আবার রাষ্ট্রপতির মেয়াদের শেষ পর্যায়ে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা ‘লিগ্যাসি’ গড়ার চেষ্টায়ও মন দিতে পারেন। সেই অবস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একই সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজাও তাঁর কাছে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। কোন পথ তিনি বেছে নেবেন, তা নির্ভর করবে সামরিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির উপর।

এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কয়েকটি বড় বাধা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, সামরিক ব্যয় ও বিদেশে সহায়তার অর্থ বরাদ্দ নিয়ে কংগ্রেসে বিতর্ক বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, তার ব্যয় এবং প্রশাসনের যুক্তি নিয়ে তদন্ত ও শুনানির দাবি জোরালো হতে পারে। তৃতীয়ত, ইজরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তার পরিমাণ ও শর্ত নিয়েও নতুন করে আলোচনা হতে পারে।

কংগ্রেসের হাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। তাই বিদেশে সামরিক অভিযান চালানো এবং মিত্র দেশকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। তবে সামরিক সহায়তা কমানো বা বন্ধ করা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলের ফল নয়। এর জন্য নির্দিষ্ট আইন, অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন। একইভাবে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই আমেরিকার ইজরায়েল নীতিতে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন, এমনটা বলা যাবে না।

তবু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলাবে। ট্রাম্পের প্রশাসনকে আরও বেশি জবাবদিহি করতে হতে পারে। যুদ্ধের উদ্দেশ্য, তার খরচ এবং সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে জনসমক্ষে বিতর্ক বাড়তে পারে। এই চাপের ফলে প্রশাসনকে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হতে পারে।

অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা যদি দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখেন, তাহলে ট্রাম্প দাবি করতে পারবেন তাঁর নীতির প্রতি ভোটারদের সমর্থন রয়েছে। প্রশাসনিক নিয়োগ, আইন প্রণয়ন এবং বাজেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাঁর পথ তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে অর্থনীতি ও যুদ্ধের চাপ তখনও থাকবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালে হিউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের প্রশংসা করেছিলেন। সেই সময় দুই নেতার ঘনিষ্ঠতা ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সম্পর্ক অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।

এর অন্যতম কারণ মার্কিন শুল্কনীতি। ভারতীয় পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটনের চাপও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক, ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে মধ্যস্থতার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি এবং ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এইচ-১বি ভিসার বাড়তি খরচ নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ভারত সরকারের বক্তব্য, ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী তিনি ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে মধ্যস্থতা করেননি।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি এবং ভারতীয় অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ভারতে ক্ষোভের কারণ হয়েছে। মার্কিন রাজনীতির একাংশে ভারতীয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক বক্তব্য এই অসন্তোষকে আরও বাড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি এবং ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনও বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা কঠিন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন। নয়াদিল্লিও এখন এমন একটি মার্কিন প্রশাসন চাইতে পারে, যাকে কংগ্রেসের বিরোধী শক্তি কিছুটা সংযত রাখতে পারবে।

কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা বাড়ালেই ভারতের জন্য পরিস্থিতি সহজ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য নীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদেরও সমালোচনা থাকতে পারে। তাছাড়া ভারতের উপর চাপ সৃষ্টির পক্ষে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি হলে শুধু ট্রাম্পকে দুর্বল করে সেই নীতি বদলানো কঠিন হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়বেই। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হলে দাম বাড়তে পারে। জাহাজ চলাচল, বিমা, পরিবহণ এবং পণ্য সরবরাহের খরচ বাড়লে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমেরিকায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যেমন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়াতে পারে, তেমনই ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করেছেন, নতুন করে হামলা চালানো হলে বেসামরিক মানুষের জীবন, আঞ্চলিক দেশগুলির নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইরানি কর্মকর্তারা মার্কিন ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি বিমানবন্দর, পাইপলাইন, সমুদ্রের তলার যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি স্থাপনা এবং সমুদ্রের জল পরিশোধন কেন্দ্রের উপর পাল্টা হামলার হুমকিও দিয়েছেন।

এমন হামলা হলে সংঘাত আর কেবল ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপসাগরীয় দেশগুলির গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে জ্বালানি ও জল সরবরাহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বিপর্যস্ত হতে পারে। নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি কত দূর ছড়াবে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য যদি মার্কিন নাগরিকদের উপর পড়ে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের উপর যুদ্ধের লক্ষ্য ও কৌশল ব্যাখ্যা করার চাপ বাড়বে। অন্যদিকে, কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অবস্থান ট্রাম্পকে তাঁর নীতি চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ দিতে পারে।

দুটি নির্বাচনের সময় কাছাকাছি হওয়ায় তাদের ফলাফলকে আলাদা করে দেখা কঠিন। ইজরায়েলের নতুন সরকার যদি সামরিক সংঘাত বাড়ানোর বদলে কূটনৈতিক পথকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে আমেরিকার জন্যও নীতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে এবং ট্রাম্প কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকবে। তবে এগুলি সম্ভাব্য পরিস্থিতি।

ইজরায়েলে ক্ষমতায় কে থাকবে, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকার ভোটারদের রায়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল আসন হারালে তাঁর প্রশাসনের উপর নজরদারি বাড়তে পারে, বিদেশনীতি নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতে পারে এবং যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা থাকায় সব সিদ্ধান্তের উপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

ফলে এই নির্বাচন ট্রাম্পের নেতৃত্বের মূল্যায়ন, তাঁর প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ এবং আমেরিকার আন্তর্জাতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ। একই সঙ্গে এটি পরীক্ষা করবে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের রাজনীতি কতটা জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে সরকার কতটা নিজের নীতি বদলাতে বাধ্য হয়।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সংখ্যাগরিষ্ঠতার গরিমা অধরা, নেতানিয়াহুর দল কী কী অভিযোগ করছে?

Israel election: ইজরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে আরব দলগুলির বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ।

ইজরায়েল নির্বাচন: আরব ইজরায়েলি কারা? কেন এত ভোট পেল আরব দলগুলি?

Israel elections: আরব ইজরায়েলি কারা? বৈষম্য ও অপরাধের প্রতিবাদে তাঁদের রেকর্ড ভোট আরব দলগুলোকে ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে দিল?

কেমন হলো বাংলাদেশের দুর্গাপুজো?

Durga Puja Bangladesh: পুজোর আগে ভাঙচুর ও নিরাপত্তা উদ্বেগের অভিযোগ সত্ত্বেও, ব্যাপক নজরদারি এবং সর্বধর্মের সহযোগিতায় বাংলাদেশে দুর্গাপুজো কতটা শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় পরিবেশে সম্পন্ন হতে পেরেছে?

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ২১ সংবাদমাধ্যম, কেন আপত্তি প্রকাশকদের?

Silencing the Newsroom: ভারত সরকারের তথ্য সুরক্ষা আইনের বিরুদ্ধে ২১টি সংবাদমাধ্যমের প্রাইভেসি বনাম সাংবাদিকতার লড়াই পৌঁছল সুপ্রিম কোর্টে। মামলাকারীদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, আদানির এনডিটিভি।

হামলার অভিযোগের এক মাস পরেও বিচার অধরা? যে যে প্রশ্ন তুলছেন SRFTI-র পড়ুয়ারা

SRFTI Student Protest: আন্দোলনের এক মাসে ছাত্রদের অভিযোগ, তাঁদের দাবি পূরণের পরিবর্তে প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হচ্ছে। শোকজ নোটিশ, বহিষ্কার এবং এফআইআরের মাধ্যমে আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

পুলিশি এনকাউন্টার কি ন্যায়বিচার? যা বলছে সুপ্রিম কোর্ট

Justice or Execution: সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান স্পষ্ট, এনকাউন্টার কোনো ‘বিচার’ নয়। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং), যা সরাসরি সংবিধানের ২১ নং ধারার লঙ্ঘন।

বিজেপির মডেলেই কংগ্রেসের মুখে 'রেজিম চেঞ্জ'? কী বলে ইতিহাস?

SIR voter list protest: একদিন ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে পথে নেমেছিল জনসংঘ ও আরএসএস। আজ বিজেপি ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলছে কেন?