‘ভাই’ থেকে ‘বিরোধী’, কুড়ি বছর পর ফের একসঙ্গে: SIR যেভাবে কাছে আনল উদ্ধব ও রাজকে

Uddhav Thackeray Raj Thackeray: জনসভা থেকে রাজ ঠাকরে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, বাদ পড়া এই দুই কোটি মানুষ আসলে কারা? দিল্লির দরবারে যখন এই বিষয়ে আলোচনা হবে, তখন সমস্ত রাজনৈতিক দলের উচিত এই এসআইআর প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানানো। একই সঙ্গে তিনি ইভিএমের বদলে পুরনো ব্যালট পেপারে ভোট করানোর জোরালো দাবি তোলেন।

inscript
৩ মিনিট
‘ভাই’ থেকে ‘বিরোধী’, কুড়ি বছর পর ফের একসঙ্গে: SIR যেভাবে কাছে আনল উদ্ধব ও রাজকে

গত দুই দশক ধরে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের সম্পর্ক ছিল তীব্র তিক্ততায় ভরা। ২০০৫ সালে অবিভক্ত শিবসেনা ছেড়ে বেরিয়ে এসে মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা বা এমএনএস গড়েছিলেন রাজ। তারপর দীর্ঘ কুড়ি বছর তাঁরা চলেছেন উল্টো পথে। সেই দুই ভাই রবিবার মুম্বইয়ের রাজপথে একসঙ্গে হাঁটলেন, হাত মেলালেন এবং যৌথভাবে নেতৃত্ব দিলেন এক সুবিশাল প্রতিবাদ মিছিলের, যার নাম রাখা হয়েছিল ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’।

দক্ষিণ মুম্বইয়ের মেট্রো সিনেমা চত্বর থেকে শুরু হয়ে এই মিছিল গিয়ে পৌঁছয় বৃহন্মুম্বই পুরসভা সদর দপ্তরের সামনে। এই মিছিলে কোনো দলীয় ঝান্ডা রাখা হয়নি, অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের হাতে ছিল শুধুই ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা। দুই ভাইয়ের পাশাপাশি মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন কংগ্রেস এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি-র শীর্ষ নেতারাও। দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে দুই ঠাকরে ভাইয়ের এই মেলবন্ধন মহারাষ্ট্রের পাশাপাশি গোটা দেশের রাজনীতিতেই বড় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে।

এই মহা-আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া, যা এসআইআর নামে পরিচিত। মহারাষ্ট্রে প্রকাশিত ভোটার তালিকার খসড়ায় দেখা গিয়েছে, প্রায় দুই কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এত বিপুল সংখ্যক নাগরিকের নাম একসঙ্গে বাদ যাওয়া নিয়েই মূলত বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে।

বিরোধীদের স্পষ্ট অভিযোগ, মৃত বা স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অছিলায় আসলে বহু জীবিত ও সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মুম্বই, পুণে এবং থানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহর ছাড়াও সংখ্যালঘু-প্রধান এলাকাগুলিতে নাম বাদ পড়ার হার চোখে পড়ার মতো বেশি। কিছু বিধানসভা কেন্দ্রে তো প্রায় চল্লিশ থেকে উনপঞ্চাশ শতাংশ নাম বাদ চলে গিয়েছে।

জনসভা থেকে রাজ ঠাকরে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, বাদ পড়া এই দুই কোটি মানুষ আসলে কারা? দিল্লির দরবারে যখন এই বিষয়ে আলোচনা হবে, তখন সমস্ত রাজনৈতিক দলের উচিত এই এসআইআর প্রক্রিয়া পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানানো। একই সঙ্গে তিনি ইভিএমের বদলে পুরনো ব্যালট পেপারে ভোট করানোর জোরালো দাবি তোলেন। রাজের আরও প্রশ্ন, ২০২৪ সালের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের মাঝের মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে কীভাবে রাজ্যে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হলো এবং সেই অল্প সময়ে বিজেপির ভোটও বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেল।

অন্যদিকে উদ্ধব ঠাকরেও সুর চড়িয়ে বলেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর নামে আসলে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর বুলডোজার চালানো হচ্ছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তিনি বলেন, কমিশন আজ সম্পূর্ণভাবে শাসক দলের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।

এই আন্দোলনের নেপথ্যে আছে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন। সেখানে ফাঁস হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের ভিতরের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত দশ মাসে অন্তত চোদ্দো বার এই ভোটার তালিকা সংশোধনের নানা পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকী কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে নেওয়া হয়েছিল বলেও তাঁরা চিঠিতে উল্লেখ করেন। নির্বাচন কমিশনের ভিতরের এই মতবিরোধ বিরোধীদের তোলা অভিযোগকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে।

যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এই তালিকাটি একেবারেই প্রাথমিক খসড়া এবং কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। নাম সংশোধনের জন্য সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে এবং ভোটারদের বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করছেন কর্মীরা। অন্য দিকে বিজেপি নেতৃত্ব এই মিছিলকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও হতাশা থেকে তৈরি বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটে শোচনীয় হারের পর বিরোধীরা মানুষের নজর ঘোরাতে এমন অজুহাত তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে এই মহা-মিছিল কেবল ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ নেই। বাল ঠাকরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দুই ভাইয়ের যে পুরনো বিবাদ ছিল, অভিন্ন প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে তা আপাতত সরিয়ে রাখা হয়েছে। মহা বিকাশ আঘাড়ী জোটের সঙ্গে রাজ ঠাকরের দলের এই বোঝাপড়া মহারাষ্ট্রে এক শক্তিশালী বিরোধী অক্ষের জন্ম দিল। রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই ভাইয়ের এই লড়াই স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগামী দিনে ভোট ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে লড়াই দিল্লির রাজপথ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে মরিয়া বিরোধীরা।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

তাজির, শরিয়া ও মসজিদে আচরণ নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা, মনুষ্যত্বের চেয়ে ধর্ম বড়?

Religious dogmatism and human rights: ডগম্যাটিজম বলতে এমন এক মানসিকতাকে বোঝায় যেখানে কোনো বিশ্বাস, মতবাদ বা নিয়মকে প্রশ্নহীনভাবে, কঠোরভাবে এবং চূড়ান্ত সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। সেখানে যুক্তি, প্রমাণ, পরিস্থিতি বা মানবিক বিবেচনা গৌণ হয়ে পড়ে।

অরুণাচলে ফের মুখোমুখি ভারত-চিন সেনা, বিরোধের নেপথ্যে কী?

India-China Border: সীমান্ত বিরোধ মেটাতে একের পর এক বৈঠক, সামরিক স্তরে আলোচনা এবং শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও অরুণাচলে ভারত-চিন উত্তেজনা কেন কমছে না? প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস কী? চিনের সামরিক আধুনিকীকরণের মোকাবিলায় ভারতের প্রস্তুতি কতটা, আর কূটনীতি কি আদৌ স্থায়ী শান্তির পথ দেখাতে পারবে?

মণিপুরে কেন কুকি শিবিরের নিয়ন্ত্রণ নিল যৌথ বাহিনী?

Manipur SoO camp raid: মণিপুরে SoO চুক্তির আওতায় থাকা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর শিবিরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও ১৭ জনের গ্রেফতারি কি শান্তিচুক্তির নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনছে?

১৩ দিন ধরে অনশনে পড়ুয়ারা, কী হচ্ছে জামিয়ায়?

Jamia Millia Islamia protest: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পড়ুয়াদের অনশন ও উত্তেজনার জেরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা কি আদৌ কাটবে, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে?

জঁ দ্রেজ, কে আপনি?

Jean Dreze Economic Philosophy: দ্রেজের কাছে দারিদ্র্য দূরীকরণ মানে শুধু দরিদ্র পরিবারকে কিছু আর্থিক সাহায্য দেওয়া নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে নিজের জীবন গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ দেয়। দুই প্রশ্নের সময়ক্ষেত্র আলাদা হলেও দুটির দর্শনগত দিক একই—যেখানে শিক্ষা আনে চেতনা, আর চেতনা আনে বিপ্লব।

অরুণাচলে বাঁধবিরোধী আন্দোলনে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাসে আহত একাধিক মহিলা

Arunachal Pradesh: সিয়াং নদীর উপর প্রস্তাবিত বৃহৎ বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতায় ২৩ অক্টোবর, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়।

পুজোর আচার না মানলে... তিন খ্রিস্টান পরবিবারের উপর চড়াও বজরং দল

১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

SBI Data Leak: কীভাবে ফাঁস হলো ৩,৮৯৭ গ্রাহকের তথ্য? কীভাবে সুরক্ষিত রাখবেন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট?

SBI Data Leak: SBI-এর ৩,৮৯৭ গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় কতটা ঝুঁকিতে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট? সাইবার প্রতারণা থেকে নিজের টাকা সুরক্ষিত রাখতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করবেন?