তৃণমূল-বিজেপি-বাম-কংগ্রেস, কার ইস্তাহারে কী প্রতিশ্রুতি?
West Bengal Election 2026: তৃণমূল, বিজেপি, বাম ও কংগ্রেস—কে কী প্রতিশ্রুতি দিল ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ ভোটে? কার ইস্তাহারে রয়েছে বেশি চাকরির আশ্বাস, মহিলাদের জন্য ভাতা, অনুপ্রবেশ রোধ বা শিল্পের প্রতিশ্রুতি? ভোটারদের মন জিততে কোন দল সবচেয়ে বড় বাজি ধরল?
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে রাজনৈতিক লড়াই। ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস উন্নয়ন, সামাজিক প্রকল্প ও মহিলাদের জন্য ভাতার রাজনীতিকে সামনে রেখে ভোট চাইছে। বিজেপি আবার দুর্নীতি, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা ও অনুপ্রবেশের প্রশ্ন তুলে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে কংগ্রেস ও সিপিএম নিজেদের জোটকে মানুষের সামনে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। দেখে নেওয়া যাক, এই ভোটে কার ইস্তাহারে কী প্রতিশ্রুতি রয়েছে?
তৃণমূলের নির্বাচনী ইস্তাহারে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে সামাজিক সুরক্ষা ও মহিলাদের আর্থিক সহায়তার উপর। দলটি বুঝতে পেরেছে, গত এক দশকে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠেছে নারী ভোটব্যাঙ্ক। তাই তারা আবারও লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পকে সামনে এনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা আরও বাড়ানো হবে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন বৃত্তি, কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা, গ্রামীণ সড়ক ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় বাড়ানো এবং শিল্প বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
তৃণমূলের বড় বার্তা হলো, তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচারে বারবার বলছেন, বাংলাকে শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তাদের ইস্তাহারে। তৃণমূলের দাবি, গত ১৫ বছরে তারা যে সামাজিক প্রকল্পগুলি চালু করেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে। এবার সেই প্রকল্পগুলির পরিধি আরও বাড়ানো হবে।
তবে বিরোধীরা বলছে, শুধু ভাতা বা নগদ সহায়তা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। বেকারত্ব, দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, শিল্পের অভাব এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। এই জায়গাতেই বিজেপি তাদের প্রচারকে আক্রমণাত্মক করেছে। বিজেপির ইস্তাহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং অনুপ্রবেশ রোধ। দলটি বলছে, তারা ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং দুর্নীতিবাজদের জেলে পাঠানো হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
BJP Bengal Sankalp Patra: বাংলায় বিজেপির ‘সংকল্প পত্র’ কি দিল্লির পুরনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি? ৩ হাজার টাকার ভাতা, অনুপ্রবেশ রুখতে কড়াকড়ি—এসব কি বাস্তবে সম্ভব? শ্লোগান আর বাস্তবের ফারাক কতটা?
বিজেপির অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি হলো, মহিলাদের জন্য মাসে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা। এছাড়া যুবকদের জন্য আলাদা আর্থিক সহায়তা প্রকল্প, চাকরির প্রতিশ্রুতি, সরকারি শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং উত্তরবঙ্গে নতুন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি তৈরির কথাও বলা হয়েছে। বিজেপি মনে করছে, শুধু ধর্মীয় বা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি নয়, চাকরি ও উন্নয়নের প্রশ্নেও তারা এবার ভোট টানতে পারবে।
বিজেপির ইস্তাহারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রশ্ন। দলটি জানিয়েছে, ক্ষমতায় এলে ছয় মাসের মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ এবং দেশছাড়া করার নীতিও তাদের ইস্তাহারের বড় অংশ। বিজেপির মতে, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায় অনুপ্রবেশ রাজ্যের নিরাপত্তা ও জনসংখ্যার ভারসাম্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এই অনুপ্রবেশের প্রশ্নেই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সবচেয়ে বড় মতাদর্শগত সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিজেপি বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নাগরিকত্বের প্রশ্নে কড়া অবস্থান না নিলে রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। অন্যদিকে তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি এই বিষয়গুলিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন, নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকা সংশোধন ও অনুপ্রবেশের প্রশ্ন তুলে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে আরেকটি বড় ইস্যু হলো, বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর। বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল বলছে, এর ফলে প্রকৃত ভোটাররা বঞ্চিত হতে পারেন। বিজেপির দাবি, ভুয়ো ভোটার ও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার জন্যই এই পদক্ষেপ দরকার। ফলে ভোটার তালিকা নিয়েও রাজনৈতিক লড়াই তীব্র হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
15 Years of Trinamool Rule: ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বাংলাকে কী দিল? লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, রেশন আর স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প কি মানুষের জীবন বদলেছে? নাকি চাকরির অভাব, দুর্নীতি, নারী নিরাপত্তা আর শিল্পহীনতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে?
অন্যদিকে কংগ্রেস ও সিপিআই(এম) নিজেদের প্রচারে মূলত বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে সামনে আনছে। তাদের বক্তব্য, তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলই মানুষের প্রকৃত সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে ধর্ম, পরিচয় ও মেরুকরণের রাজনীতি করছে। কংগ্রেস এবং বাম শিবিরের দাবি, বাংলায় এমন একটি সরকার দরকার, যারা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে গুরুত্ব দেবে।
বাম ও কংগ্রেস জোটের ইস্তাহারে সরকারি চাকরির শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বেশি বিনিয়োগ এবং কৃষকদের ঋণ মকুবের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করছে, তৃণমূলের আমলে দুর্নীতি বেড়েছে এবং বিজেপি সেই দুর্নীতিকে হাতিয়ার করে বিভাজনের রাজনীতি করছে। তাদের মতে, রাজ্যের মানুষ এখন তৃতীয় বিকল্প খুঁজছেন।
এই নির্বাচনে মহিলাদের ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৃণমূল যেমন তাদের পুরনো প্রকল্পের উপর ভরসা করছে, বিজেপিও আলাদা করে মহিলাদের জন্য নগদ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি-ও সাম্প্রতিক সভাগুলিতে বারবার মহিলাদের নিরাপত্তা, সংরক্ষণ এবং আর্থিক স্বনির্ভরতার প্রসঙ্গ তুলেছেন। বিশেষ করে আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজ ধর্ষণ ও খুনের মামলার পর আইনশৃঙ্খলা এবং নারীর নিরাপত্তা এই নির্বাচনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
যুব ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল বলছে, তারা নতুন শিল্প আনবে, তথ্যপ্রযুক্তি খাত বাড়াবে এবং স্টার্টআপে জোর দেবে। বিজেপি বলছে, তারা সরকারি চাকরি দ্রুত পূরণ করবে এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগ আনবে। বাম ও কংগ্রেস বলছে, দুই প্রধান দলই শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, বাস্তবে চাকরির সুযোগ কমছে। তাই কর্মসংস্থান এখন এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।
এবারের ভোটে পরিচয় রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপি হিন্দু ভোট একত্রিত করার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায়। তৃণমূল আবার বাঙালি পরিচয়, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রাজ্যের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে আনছে।
প্রসঙ্গত, ভোটের আগে ইস্তাহারে যত বড় বড় প্রতিশ্রুতিই থাকুক, মানুষের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোন দল সত্যিই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে? কারণ বারবারই দেখা গিয়েছে, নির্বাচনের আগে চাকরি, শিল্প, ভাতা বা নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হলেও তার অনেকটাই পরে বাস্তবে রূপ পায় না।







