ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়?
West Bengal delimitation controversy: ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন হঠাৎ এত বিতর্ক? কেন্দ্র কি সত্যিই বাংলাকে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী অভিযোগ করেছেন? জনগণনা ছাড়াই ডিলিমিটেশন হলে কী বদল আসতে পারে দেশের নির্বাচনী মানচিত্রে?
ডিলিমিটেশন, আজকের ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির একটি। পশ্চিমবঙ্গেও ফের এই নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল) বাঁকুড়ার ছাতনা ও ওন্দা এবং পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ডিলিমিটেশন নিয়ে তীব্র সুরে আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, ডিলিমিটেশনের নামে যে বিভাজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাঙালিদের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তাঁর কথায়, এই প্রক্রিয়া শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাঙালি পরিচয়ের উপর আঘাত হানতে পারে। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ,
বিজেপি পরিকল্পনা করছে ডিলিমিটেশন বিল এনে বাংলাকে তিন টুকরো করার। রাজ্যের কিছু অংশ বিহার বা ওডিশার সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়, কী সমস্যা আছে এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে, এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে বোঝা জরুরি।
ডিলিমিটেশন বলতে মূলত নির্বাচনী এলাকা বা বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণকে বোঝায়। অর্থাৎ, একটি দেশে জনসংখ্যার পরিবর্তনের ভিত্তিতে কোথায় কতগুলি আসন থাকবে এবং সেই আসনগুলির ভৌগোলিক সীমানা কোথায় হবে, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়াই ডিলিমিটেশন। ভারতে এই কাজটি করে একটি স্বাধীন সংস্থা, ডিলিমিটেশন কমিশন। এই কমিশনের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না, অর্থাৎ এর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। ডিলিমিটেশনের মূল লক্ষ্য হলো, একটি ভোটের মূল্য যেন সব জায়গায় প্রায় সমান থাকে। অর্থাৎ, একটি আসনে ১০ লাখ মানুষ আর অন্য আসনে ৩০ লাখ মানুষ, এমন বৈষম্য যাতে না থাকে।
কেন ডিলিমিটেশন করা হয়? ভারতের মতো বিশাল দেশে জনসংখ্যা স্থির থাকে না। কোথাও দ্রুত বাড়ে, কোথাও ধীরে বাড়ে। ফলে পুরনো সীমানা অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকা থাকলে প্রতিনিধিত্বে অসাম্য তৈরি হয়। এই কারণেই সংবিধান অনুযায়ী প্রতি জনগণনার পরে ডিলিমিটেশন করার কথা বলা হয়েছে। ডিলিমিটেশনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো, প্রথমত, গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসনের সংখ্যা ও সীমানা ঠিক করা। তৃতীয়ত, তফসিলি জাতি (SC) ও তফসিলি উপজাতি (ST)-র জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা।
ভারতে শেষবার বড় আকারে ডিলিমিটেশন হয়েছিল ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে।
১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের আমলে ৪২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের পুনর্বিন্যাস কার্যত স্থগিত করা হয়। এর ফলে ডিলিমিটেশন প্রায় ২৫ বছরের জন্য পিছিয়ে যায় এবং ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই আসন বণ্টন স্থির থাকে। সরকারের যুক্তি ছিল, পরিবার পরিকল্পনায় সফল রাজ্যগুলি যেন জনসংখ্যা কম বৃদ্ধির কারণে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পরে এই স্থগিতাদেশ আরও বাড়িয়ে ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। ডিলিমিটেশন সাধারণত জনগণনার তথ্যের উপর ভিত্তি করে হয়। কিন্তু এখনও নতুন জনগণনা হয়নি। তাই বিরোধীরা বলছে, জনগণনা ছাড়া ডিলিমিটেশন করলে তা সঠিক হবে না।
ডিলিমিটেশন প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। তাঁর সরকারের সময় ২০০১ সালে ৮৪তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের মোট সংখ্যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে একই সঙ্গে ২০০২ সালে ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করা হয়, যা ২০০১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। এই নতুন সীমানা ২০০৮ সাল থেকে কার্যকর হয়, ফলে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য কিছুটা সংশোধিত হয়।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আশঙ্কা, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বণ্টন হলে উত্তর ভারতের প্রভাব অনেক বাড়বে। সরকার যদি ২০১১ সালের তথ্য ব্যবহার করে ডিলিমিটেশন করে, তাহলে তা বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিফলিত করবে না, এমন অভিযোগও উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, ডিলিমিটেশনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, বিশেষ করে আসন বিন্যাসে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য।
পশ্চিমবঙ্গে ডিলিমিটেশন হলে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে। প্রথমত, কিছু আসনের সীমানা বদলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমান্তবর্তী এলাকা ও অভিবাসন-প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। এই কারণেই রাজ্যে এই ইস্যু এত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।






