ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়?

West Bengal delimitation controversy: ডিলিমিটেশন নিয়ে কেন হঠাৎ এত বিতর্ক? কেন্দ্র কি সত্যিই বাংলাকে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী অভিযোগ করেছেন? জনগণনা ছাড়াই ডিলিমিটেশন হলে কী বদল আসতে পারে দেশের নির্বাচনী মানচিত্রে?

inscript
৩ মিনিট
ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়?

ডিলিমিটেশন, আজকের ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলির একটি। পশ্চিমবঙ্গেও ফের এই নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রবিবার (১২ এপ্রিল) বাঁকুড়ার ছাতনা ও ওন্দা এবং পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ডিলিমিটেশন নিয়ে তীব্র সুরে আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, ডিলিমিটেশনের নামে যে বিভাজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাঙালিদের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। তাঁর কথায়, এই প্রক্রিয়া শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও বাঙালি পরিচয়ের উপর আঘাত হানতে পারে। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ,

বিজেপি পরিকল্পনা করছে ডিলিমিটেশন বিল এনে বাংলাকে তিন টুকরো করার। রাজ্যের কিছু অংশ বিহার বা ওডিশার সাথে মিশিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডিলিমিটেশন কী, কেন করা হয়, কেন এখন আবার আলোচনায়, কী সমস্যা আছে এবং ভবিষ্যতে কী হতে পারে, এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে বোঝা জরুরি।

ডিলিমিটেশন বলতে মূলত নির্বাচনী এলাকা বা বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণকে বোঝায়। অর্থাৎ, একটি দেশে জনসংখ্যার পরিবর্তনের ভিত্তিতে কোথায় কতগুলি আসন থাকবে এবং সেই আসনগুলির ভৌগোলিক সীমানা কোথায় হবে, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়াই ডিলিমিটেশন। ভারতে এই কাজটি করে একটি স্বাধীন সংস্থা, ডিলিমিটেশন কমিশন। এই কমিশনের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না, অর্থাৎ এর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। ডিলিমিটেশনের মূল লক্ষ্য হলো, একটি ভোটের মূল্য যেন সব জায়গায় প্রায় সমান থাকে। অর্থাৎ, একটি আসনে ১০ লাখ মানুষ আর অন্য আসনে ৩০ লাখ মানুষ, এমন বৈষম্য যাতে না থাকে।

কেন ডিলিমিটেশন করা হয়? ভারতের মতো বিশাল দেশে জনসংখ্যা স্থির থাকে না। কোথাও দ্রুত বাড়ে, কোথাও ধীরে বাড়ে। ফলে পুরনো সীমানা অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকা থাকলে প্রতিনিধিত্বে অসাম্য তৈরি হয়। এই কারণেই সংবিধান অনুযায়ী প্রতি জনগণনার পরে ডিলিমিটেশন করার কথা বলা হয়েছে। ডিলিমিটেশনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো, প্রথমত, গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখা। দ্বিতীয়ত, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসনের সংখ্যা ও সীমানা ঠিক করা। তৃতীয়ত, তফসিলি জাতি (SC) ও তফসিলি উপজাতি (ST)-র জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ করা।

ভারতে শেষবার বড় আকারে ডিলিমিটেশন হয়েছিল ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে।

১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের আমলে ৪২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের পুনর্বিন্যাস কার্যত স্থগিত করা হয়। এর ফলে ডিলিমিটেশন প্রায় ২৫ বছরের জন্য পিছিয়ে যায় এবং ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই আসন বণ্টন স্থির থাকে। সরকারের যুক্তি ছিল, পরিবার পরিকল্পনায় সফল রাজ্যগুলি যেন জনসংখ্যা কম বৃদ্ধির কারণে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পরে এই স্থগিতাদেশ আরও বাড়িয়ে ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। ডিলিমিটেশন সাধারণত জনগণনার তথ্যের উপর ভিত্তি করে হয়। কিন্তু এখনও নতুন জনগণনা হয়নি। তাই বিরোধীরা বলছে, জনগণনা ছাড়া ডিলিমিটেশন করলে তা সঠিক হবে না।

ডিলিমিটেশন প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। তাঁর সরকারের সময় ২০০১ সালে ৮৪তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে লোকসভা ও বিধানসভা আসনের মোট সংখ্যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে একই সঙ্গে ২০০২ সালে ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করা হয়, যা ২০০১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। এই নতুন সীমানা ২০০৮ সাল থেকে কার্যকর হয়, ফলে প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য কিছুটা সংশোধিত হয়।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির আশঙ্কা, জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বণ্টন হলে উত্তর ভারতের প্রভাব অনেক বাড়বে। সরকার যদি ২০১১ সালের তথ্য ব্যবহার করে ডিলিমিটেশন করে, তাহলে তা বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিফলিত করবে না, এমন অভিযোগও উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, ডিলিমিটেশনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, বিশেষ করে আসন বিন্যাসে পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য।

পশ্চিমবঙ্গে ডিলিমিটেশন হলে কয়েকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হতে পারে। প্রথমত, কিছু আসনের সীমানা বদলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমান্তবর্তী এলাকা ও অভিবাসন-প্রভাবিত অঞ্চলগুলিতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। এই কারণেই রাজ্যে এই ইস্যু এত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।