মন্ত্রিত্ব থেকে কেন দূরে টালিগঞ্জ?

যারা টলিউডে হওয়া সিন্ডিকেটরাজ নিয়ে এত সরব হলেন, তারা কেন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন না?

inscript
৩ মিনিট
মন্ত্রিত্ব থেকে কেন দূরে টালিগঞ্জ?

তৃণমূল সরকারের আমলে টলিউডে দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ, দাদাগিরি, পক্ষপাতদুষ্টতা এইসব নিয়ে অভিযোগ ছিল ভুরি ভুরি। টলিউড এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তৃণমূল সরকারের খেলা হলো এবং খেলা ঘুরেও গেল। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো। রাজ্যে এল বিজেপি সরকার।

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির মন্ত্রিসভা গঠন হলো। কিন্তু সেই মন্ত্রিসভায় টলিউডের কেউ জায়গা পেল না। তাই সবচেয়ে বড় আলোচনা এখন একটাই—শুভেন্দু অধিকারীর নতুন মন্ত্রিসভায় টলিউডের কোনো চেনা মুখের জায়গা না পাওয়া। হিরণ চট্টোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা অরূপ বিশ্বাসকে হারানো পাপিয়া অধিকারীর মতো হেভিওয়েট তারকা বিধায়করা মন্ত্রী হচ্ছেন না। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন চর্চা চলছে রাজনৈতিক মহলে, ঠিক তেমনই টলিপাড়ার অন্দরেও তৈরি হয়েছে চাপা গুঞ্জন। যারা টলিউডে হওয়া সিন্ডিকেটরাজ নিয়ে এত সরব হলেন, তারা কেন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন না?

তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক, যা বিনোদন জগতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেটিও কেন কোনো তারকা বিধায়ককে দেওয়া হলো না?

এই প্রশ্নের উত্তরও বোধহয় লুকিয়ে আছে আগের সরকারের রাজত্বকালেই। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) বিগত ১৫ বছরের (২০১১–২০২৬) শাসনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, টলিপাড়ার একটা বড় অংশ সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল সরকারের সঙ্গে। ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা—সব জায়গার অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং সঙ্গীতশিল্পীদের শাসকদলের মঞ্চে দেখা যেত।

মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান, লাভলি মৈত্র, অদিতি মুন্সি থেকে শুরু করে রাজ চক্রবর্তী, জুন মালিয়া, কাঞ্চন মল্লিক কিংবা সায়নী ঘোষের মতো তারকারা কেউ সাংসদ, কেউ বা বিধায়ক হয়েছিলেন। বিনোদন জগতের এই ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করতেন, মেধার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগই টলিপাড়ায় কাজ পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে উঠছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যখন আমাদের ছবি আটকে দেওয়া হয়, তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনীক স্যার

আধুনিক বাংলা ছবির অন্যতম সেরা পরিচালক ছিলেন অনীক স্যার। আমাদের ছবির স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে তিনি এসেছিলেন, পুরোটা দেখেছিলেন। তারপর নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি সুন্দর রিভিউ লিখেছিলেন। সেই সময়েই ওঁর সঙ্গে সামনাসামনি কথা হয়েছিল প্রথমবার, তবে সেটিই যে শেষবারের মতো হবে তা ভাবতেও পারিনি।

মজার বিষয় হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানাতেও কিন্তু কোনো টলিউড তারকাকে মন্ত্রিসভায় সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি নিজে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর নিজের হাতে রেখেছিলেন। এবার নতুন বিজেপি (BJP) সরকারও সেই একই পথে হাঁটল, তবে তাঁদের উদ্দেশ্য এবং কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা।

সরকারের আসল উদ্দেশ্য কী?

নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে ক্ষোভ নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক রণকৌশল রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • রাজনীতি এবং বিনোদনকে আলাদা করা: নতুন সরকার খুব স্পষ্ট একটা বার্তা দিতে চাইছে—রাজনীতি চলবে নবান্নে আর শিল্পচর্চা হবে স্টুডিওপাড়ায়। দুটিকে গুলিয়ে ফেলে ক্ষমতার অলিন্দে তারকাদের বসিয়ে রাখলে শিল্পের ক্ষতি হয়। তারকা বিধায়করা যাতে মন্ত্রিত্বের ফাইলে সই করার প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের মূল জগৎ অর্থাৎ বিনোদন জগতের উন্নয়নে মন দিতে পারেন, সেই জন্যই তাঁদের মন্ত্রিসভা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

  • সিন্ডিকেট রাজের শিকড়: গত কয়েক বছরে টলিপাড়ায় লবিবাজি, তোলাবাজি এবং 'ব্যান কালচার' (নির্দিষ্ট কাউকে কাজ না দিয়ে বসিয়ে রাখা) নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। সরকার মনে করছে, কোনো তারকাকে মন্ত্রী বানালে তাঁর নিজস্ব একটা গোষ্ঠী বা লবি তৈরি হতে পারে। এর ফলে পুরনো সেই ক্ষতিকর সিস্টেমটাই আবার নতুন নামে ক্ষমতা পেয়ে যেত।

  • মেধা এবং দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া: ৪১ জনের নতুন মন্ত্রিসভায় প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরই জায়গা দেওয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র জগতকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখতে এবং এর ব্যবসায়িক উন্নতির জন্য দক্ষ আধিকারিকদের উপর ভরসা করা হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক নেতার উপর নয়।

গুরুদায়িত্বে ৪ তারকা

শুভেন্দু অধিকারী তারকাদের মন্ত্রী করেননি ঠিকই, কিন্তু টলিপাড়া সংস্কারের মূল চাবিকাঠি তাঁদের হাতেই তুলে দিয়েছেন। গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে নবান্নে হওয়া ঐতিহাসিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন, "টলিউডকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত এবং ভয়মুক্ত করতে হবে।"

এই লক্ষ্য পূরণে ৪ জন তারকা বিধায়ককে কোনো মন্ত্রক না দিয়ে সরাসরি স্টুডিওপাড়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্টতার ঘটনা না ঘটার জন্যই রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ চট্টোপাধ্যায়,

পাপিয়া অধিকারী চারজনকেই টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়ার সার্বিক নজরদারি ও সমন্বয় সাধন করা, সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে নিয়ম তৈরি করা, স্টুডিওপাড়ার ভিতরের পরিবেশ সুস্থ ও স্বচ্ছ রাখা, কাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সাধারণ টেকনিশিয়ানদের সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব দেওয়া আছে।

তাঁরা মন্ত্রী না হয়েও সাধারণ শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য কাজ করার অনেক বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পাচ্ছেন। একেই রাজনৈতিক মহলে শুভেন্দু অধিকারীর "মাস্টারস্ট্রোক" বা চতুর কৌশল বলা হচ্ছে।

নতুন সরকার বেশ কিছু বড়সড় বদল আনার কথা বলেছে। কথার দোহাই দিয়ে সিনেমা বন্ধ করা, স্ক্রিনিং কমিটির নামে কাজের সুযোগ আটকে রাখা কিংবা ফেডারেশনের নামে দাদাগিরি করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা, সিনেমাহলের সংখ্যা বাড়ানো (২০১৪-২০১৬ যেখানে ৭০০-র বেশি ছিল, ২০২৬-এ সিনেমাহলের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০-তে), সাধারণ টেকনিশিয়ানদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভায় টলিউডের জায়গা না পাওয়া কোনো অবহেলা নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রিকে সুস্থ করার একটা পরিকল্পিত পদক্ষেপ। ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রেখে তারকাদের কাজের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে যাতে টলিপাড়া সত্যি সত্যিই মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারে। এখন দেখার, এই নতুন পথচলায় বাংলার চলচ্চিত্র জগৎ তার পুরনো গৌরব কতটা ফিরে পায়।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আলেকজান্দ্রিয়া, নালন্দা, যাদবপুর, বই ধ্বংসের আগুনে বারবার পুড়েছে ভিন্নমত

history of book burning: শারদ-আবহে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী বইয়ের স্টল, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে জুডার রাজা যিহোয়াকিমের স্ক্রল পোড়ানো থেকে নালন্দার গ্রন্থাগার, নাৎসিদের ২৫,০০০ বই পোড়ানো, জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি, সারায়েভো হয়ে মাওয়ের চিন, সর্বত্র বই ধ্বংসকারিরা, প্রতিরোধী স্মৃতি ও কল্পনার উপর আঘাত হেনেছে বারবার।

বুলডোজ়ারের জবাব বই দিয়ে! বুকস্টলের সব বই কিনে বিলি করলেন চিকিৎসক

Doctor protests by distributing books: ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথোপকথনে নিজের এই উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অশোকবাবু। স্পষ্ট করেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের নামে ছড়ানো শিরশ্ছেদের ভিডিওটি কি সত্যি?

Bangladeshi execution Saudi Arabia viral video: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদের ভাইরাল ভিডিওটি কি আদৌ সত্যি?

এপস্টাইনের সঙ্গে ছবি প্রকাশ হরদীপ সিং পুরীর, যে কারণে অস্বস্তি বাড়ছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর

Hardeep Puri-Jeffrey Epstein Photo: এপস্টাইনের মুখোমুখি টেবিলে হরদীপ পুরী। মার্কিন নথিতে প্রকাশিত  ছবি ঘিরে কেন অস্বস্তি বাড়ছে? কোন কোন কারণে প্রশ্নের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী? 

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।