দেশে ফিরছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, কী পরিকল্পনা তাঁর?
Cockroach Janta Party: দেশে ফিরেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামতে চলেছেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। নিট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষা বিতর্ককে সামনে এনে তিনি ছাত্র-যুবদের পথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারতের তরুণ প্রজন্মের একাংশের ক্ষোভ, হতাশা আর বঞ্চনার প্রতীক হয়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আবারও জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, আগামী ৬ জুন ভারতে ফিরছেন। আর দেশে ফিরেই শুরু করবেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সি অভিজিৎ দিপকে সোমবার (১ জুন) একটি ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি দিল্লিতে এসে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ডাক দেবেন। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিতর্ক, প্রশ্নফাঁস এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাই এই পরিস্থিতির দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দিপকের বক্তব্য, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের জীবন যেন এক ধরনের রসিকতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য আয়োজিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট-কে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের জেরে পরীক্ষার একটি অংশ বাতিল হওয়ার পর থেকেই শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন বহু ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবক।
শুধু নিট নয়, কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বা সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরির জন্য স্টাফ সিলেকশন কমিশনের বিভিন্ন পরীক্ষাকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দিপকের দাবি, একের পর এক এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে গোটা ব্যবস্থার মধ্যেই গুরুতর সমস্যা রয়েছে। আর তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারেরই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই আন্দোলন তথাকথিত রাজনৈতিক শুদ্ধতার ধার ধারে না। তারা সরাসরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে, ব্যঙ্গ করে এবং প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলে। জেন-জি’র কাছে এটাই এই সময়ের 'অথেনটিক' রাজনীতি। বহু বছর ধরে একই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর চেনা ভাষণ শুনে তারা ক্লান্ত। তারা এমন কাউকে চাইছে, যে অন্তত তাদের ক্ষোভের ভাষায় কথা বলতে পারে।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, যদি এত বড় ধরনের ব্যর্থতার পরও শিক্ষামন্ত্রী পদে বহাল থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে দেশে আর কোনো জবাবদিহি অবশিষ্ট নেই। তাঁর আহ্বান, সংবিধানের পথ মেনেই ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষকে একজোট হয়ে প্রতিবাদে সামিল হতে হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ জুন সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে নামবেন দিপকে। তিনি সমর্থকদের বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। সেখান থেকে একসঙ্গে গিয়ে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি চাওয়া হবে। পরে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে দেশে ফেরার আগেই দিপকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে তাঁকে বিমানবন্দরেই আটক করা হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে বলেই তাঁর ধারণা। কিন্তু তাতেও আন্দোলন থামবে না। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশ সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। তাই ভয় না পেয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া উচিত।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আসলে কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়। এটি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রচারাভিযান। গত ১৬ মে এই উদ্যোগ শুরু হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে সংগঠনটি। ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের জেন জি আদতে একরৈখিক নয়। মেট্রো শহরের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং প্রত্যন্ত ছোট শহরের চাকরিপ্রার্থী যুবকের রাজনৈতিক চাহিদা ও লড়াই কখনও এক নয়।
এই সংগঠনের জন্মের পিছনেও রয়েছে একটি বিতর্ক। গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সূর্য কান্তর একটি মন্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনি বেকার যুবকদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। পরে তিনি জানান, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তিনি সাধারণ যুবসমাজকে নয়, জাল ডিগ্রিধারীদের সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সেই মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেই ক্ষোভ থেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র উত্থান।
বেকারত্ব, চাকরির অভাব ও পরীক্ষায় দুর্নীতির মতো নানা সমস্যা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করছে এই সংগঠন। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে সংগঠনটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে।
অন্যদিকে সংগঠনটিকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। সম্প্রতি তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ভারতে ব্লক করা হয়। পরে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিল্লি হাই কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত কেন্দ্রীয় সরকার এবং এক্স কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবও তলব করেছে। যদিও অবিলম্বে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দেয়নি আদালত।
দিপকের অভিযোগ, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টই নয়, সংগঠনের ওয়েবসাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও সরকারিভাবে এই অভিযোগের কোনো স্বীকৃতি মেলেনি।
এরই মধ্যে আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে মুখ খুলেছেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক-ও। তিনি নিজেকে মজা করে ‘সম্মানসূচক ককরোচ’ বলেও উল্লেখ করেছেন। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে এই আন্দোলন এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনাতেও জায়গা করে নিচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করা কঠিন। অনলাইন ক্ষোভকে বাস্তবের আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে সংগঠনগত শক্তি, নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রয়োজন। সেই পরীক্ষার মুখেই এখন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
এখন অভিজিৎ দিপকের দেশে ফেরা এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ডাকা আন্দোলনের দিকে নজর রয়েছে দেশের রাজনৈতিক মহলের।






