হরমুজ খুললেও কাটছে না তেলের সংকট, কেন চিন্তায় বিশ্ব?
Strait of Hormuz: যুদ্ধবিরতি হয়েছে, হরমুজ প্রণালীও খুলছে। কিন্তু তবু কেন কমছে না তেলের দাম? কেন এখনও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা? তেল শোধনাগার, পাইপলাইন আর জাহাজ চলাচলের ক্ষতি কি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বড় সংকটে ফেলতে পারে? কেন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপদ এখনও কাটেনি?
ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালীও ধীরে ধীরে খুলছে। ফলে অনেকেরই মনে হতে পারে, তেলের বাজারে যে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছিল, তা হয়তো কেটে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলছে।
বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই পথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। এর ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, বাজারে তেলের জোগান কমে যায় এবং দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এখন যুদ্ধবিরতি এবং জাহাজ চলাচল ফের শুরু হওয়ার খবর বাজারে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। তেলের দামও কিছুটা কমেছে। কিন্তু তাতেই সমস্যা মিটে যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শুধু হরমুজ প্রণালী বন্ধ ছিল না, যুদ্ধের সময় তেল শোধনাগার, পাইপলাইন, বন্দর এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরশাহি এবং কুয়েতের মতো বড় তেল উৎপাদক দেশগুলিতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফলে পথ খুললেও আগের মতো দ্রুত তেল সরবরাহ শুরু করা সম্ভব নয়। এই স্থাপনা মেরামত করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Iran conflict: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের তীব্র সংঘাতের মাঝে হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পাকিস্তান। কীভাবে দুই শত্রুপক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের সেতু হয়ে উঠল ইসলামাবাদ?
যুদ্ধের কারণে বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল কমে গিয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালী খুললেও আগের মতো প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জাহাজ চলাচল শুরু হবে না। জাহাজ মালিকদের বড় অংশ এখনও ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। কারণ প্রণালীতে এখনও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোথাও মাইন পাতা থাকতে পারে, কোথাও আবার সামরিক নজরদারি চলছে। ফলে জাহাজ চলাচল শুরু হলেও তা খুব সীমিত আকারে হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির পরও পরিস্থিতি যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, তার প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে। কখনও ইরান বলছে হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও মার্কিন অবরোধের অভিযোগ তুলে নতুন করে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা জানেন, যে কোনো মুহূর্তে আবার সংঘর্ষ শুরু হতে পারে। তাই তেলের দাম কিছুটা কমলেও তা এখনও যুদ্ধের আগের স্তরে নামেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran US ceasefire: ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নতুন করে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিবর্তিত অবস্থান ভারতের জন্য কি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে? দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য কি বদলাচ্ছে, নাকি এটি সাময়িক কূটনৈতিক সমীকরণ—এই প্রশ্নই এখন মূল আলোচনায় উঠে আসেছে।
শুধু কাঁচা তেল নয়, ডিজেল, জেট ফুয়েল এবং সার তৈরির মতো তেল-নির্ভর শিল্পও এই সংকটে বিপর্যস্ত হয়েছে। ডিজেল বিশেষ করে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাক, কৃষিযন্ত্র, খনি শিল্প এবং ভারী যন্ত্রপাতি চালাতে এর কোনো সহজ বিকল্প নেই। বিমান সংস্থাগুলিও জেট ফুয়েলের উচ্চ দামের চাপে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণ সংস্থাগুলি বলছে, জেট ফুয়েলের জোগান এবং দাম স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে।
এই সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে গরিব ও আমদানিনির্ভর দেশগুলিতে। ফিলিপিন্স, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলিতে জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কারণ তারা বেশি দাম দিয়ে বাজার থেকে তেল কিনতে পারে না। ধনী দেশগুলি তুলনামূলক বেশি দাম দিয়ে হলেও নিজেদের জন্য জোগান নিশ্চিত করতে পারছে। ফলে বিশ্ববাজারে অসমতা আরও বাড়ছে।
অনেকেই এই পরিস্থিতিতে নতুন করে তেল উত্তোলনের দাবি তুলছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, তা বাস্তবসম্মত নয়। নতুন তেলক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া, সেখানে উৎপাদন শুরু করা এবং বাজারে তেল আনা—সব মিলিয়ে বহু বছর সময় লাগে। তাই তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে নতুন তেল উত্তোলন খুব একটা কাজে আসবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদে তেলের উপর নির্ভরতা কমানোই একমাত্র পথ।
এই কারণেই এখন অনেক বিশেষজ্ঞ বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বলছেন। কারণ যত বেশি দেশ তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে পারবে, তত কম এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়লে পেট্রোলের চাহিদা কমবে। ভবিষ্যতে খনি, পরিবহণ এবং ভারী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি বাড়তে পারে।






