দশজনে চারজন স্কুলছুট উচ্চমাধ্যমিকের আগে, দেশজুড়েই শিক্ষাসংকট

India school dropout: নীতি আয়োগের রিপোর্ট বলছে, স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জনই উচ্চমাধ্যমিকের আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।

inscript
৩ মিনিট
দশজনে চারজন স্কুলছুট উচ্চমাধ্যমিকের আগে, দেশজুড়েই শিক্ষাসংকট

দেশজুড়ে হুহু করে বাড়ছে শিক্ষাছুট। দেখা যাচ্ছে, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই স্কুল ছাড়ছে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এই তথ্য—স্কুলে ভর্তি হওয়া প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৪ জন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।

নীতি আয়োগের প্রকাশিত ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া: টেম্পোরাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট’ শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানো নয়, তাদের পড়াশোনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলের সঙ্গে যুক্ত রাখাও সমান চ্যালেঞ্জের। প্রাথমিক স্তরে মোট ভর্তির হার বা গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও (GER) ৯০.৯ শতাংশ। কিন্তু মাধ্যমিকে তা নেমে আসে ৭৮.৭ শতাংশে। উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছতে পৌঁছতে এই হার আরও কমে দাঁড়ায় ৫৮.৪ শতাংশে।

এই সমস্যাকে নীতি আয়োগ ‘লিকি পাইপলাইন’ বা ফুটো পাইপের সঙ্গে তুলনা করেছে। পাইপের এক দিক দিয়ে যত জল ঢোকানো হয়, অন্য প্রান্তে ততটা পৌঁছয় না। শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ছবি। প্রথম শ্রেণিতে লক্ষ লক্ষ শিশু ভর্তি হলেও দ্বাদশ শ্রেণিতে পৌঁছতে পৌঁছতে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

কেন বাড়ছে শিক্ষাছুট?

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের স্কুল কাঠামো নিজেই এই সমস্যার অন্যতম কারণ। দেশে প্রায় ৭.৩ লক্ষ প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুল রয়েছে মাত্র ১.৬৪ লক্ষ। ফলে অনেক পড়ুয়াকে অষ্টম বা দশম শ্রেণির পরে অন্য স্কুলে যেতে হয়। নতুন স্কুল অনেক দূরে হলে বা যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সরকারি স্কুল সব কোথায় গেল?

Public education crisis India: কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে এমন ৭,৯৯৩ টি স্কুল রয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। এই পরিসংখ্যান থেকে এটাও স্পষ্ট, ডাবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার হোক বা কংগ্রেস বা পরিবর্তনের ধ্বজাধারী তৃণমূল সরকার— সরকারি স্কুলের পতনের ছবিটা সব জায়গাতেই এক।

গ্রামের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি। অনেক জায়গায় উচ্চমাধ্যমিক স্কুল কয়েক কিলোমিটার দূরে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলে প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সামাজিক বাধাও বড় ভূমিকা নেয়।

নীতি আয়োগের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটানা পড়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অন্তত একবার স্কুল বদল করতেই হয়। আর এই বদলের সময়েই বহু পড়ুয়া আর নতুন স্কুলে ভর্তি হয় না।

দারিদ্র্যই ছেলেমেয়েদের স্কুল ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক পরিবারে কিশোর-কিশোরীদের উপার্জনের কাজে নামতে হয়। কেউ কৃষিকাজে সাহায্য করে, কেউ দোকানে কাজ নেয়। ফলে পড়াশোনা দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ, গৃহস্থালির দায়িত্ব এবং সামাজিক কুসংস্কারও বড় কারণ। বহু পরিবার এখনও মনে করে, নির্দিষ্ট বয়সের পর মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নিরাপদ পরিবেশের অভাব, পৃথক শৌচাগারের অনুপস্থিতি এবং স্কুলে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও মেয়েদের স্কুলছুট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

শুধু স্কুলে উপস্থিত থাকা মানেই যে শিক্ষার মান ভালো, তা নয়। রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, বহু ছাত্রছাত্রী বয়স অনুযায়ী ক্লাসে থাকলেও পড়া, লেখা ও অঙ্কে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে তারা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। শেখার আনন্দ না থাকলে স্কুলে টিকে থাকার প্রবণতাও কমে যায়। নীতি আয়োগের মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই পিরামিডের মতো—নিচে অনেক ছাত্রছাত্রী, কিন্তু উপরে যেতে যেতে সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার ফলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার আইনি নিশ্চয়তা থাকলেও তার পর অনেক পরিবার অতিরিক্ত ব্যয় বহনে অনীহা দেখায়। ফলে নবম শ্রেণি থেকে স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

সরকারি স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের আস্থাও কিছুটা কমেছে। ২০০৫ সালে যেখানে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী সরকারি স্কুলে পড়ত, এখন সেই হার ৫০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। বেসরকারি স্কুলে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলির পক্ষে তা সবসময় সম্ভব নয়। ফলে অনেক শিশুই কার্যত শিক্ষার মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

নীতি আয়োগের সুপারিশ

প্রথমত, আরও বেশি কম্পোজিট স্কুল তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ধারাবাহিক শিক্ষা পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে সহজে যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারকে বৃত্তি, পরিবহণ সহায়তা এবং অন্যান্য সাহায্য দিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারেও জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম যুবপ্রধান দেশ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ ও স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাদের প্রত্যেকের স্কুলশিক্ষা সম্পূর্ণ করার সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নীতি আয়োগের এই রিপোর্ট সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। শিশুদের স্কুলে ভর্তি করানোয় ভারত অনেকটা এগোলেও, তাদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গিয়েছে। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে দেশের উন্নয়নের স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

প্যান্ডেলের ভিতরে অন্ধকার থেকেই বিপত্তি! চোরবাগান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরক অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীর

রিয়াঙ্কার কথায়, তাঁরা ছ’জন বন্ধু মিলে মণ্ডপে গিয়েছিলেন। ভিআইপি লাইনে প্রবেশ করেও তাঁদের প্রায় দু’ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তাঁর দাবি, মণ্ডপের ভিতরে ঢোকার আগে থেকেই ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছিল।

ফ্রান্সের গণবিক্ষোভ থেকে কী শিখবে বিশ্ব?

France student protest: বিদ্যালয়ের দুরবস্থা ও পারকুরসুপ ব্যবস্থা থেকে শুরু হয়ে কীভাবে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ল দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ?

চোরবাগানের দুর্ঘটনা: দায় কার, কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

Kolkata pandal Chorbagan stampede: কলকাতার চোরবাগানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘিরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?

প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে সপ্তমীর চোরবাগান

Chorbagan Durga Puja incident: মণ্ডপের ভিতরে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামায় বাইরের দর্শনার্থীরা ভিতরে ঢুকতে চাইছিলেন কিন্তু ভিতরের দর্শনার্থীরা বাইরে যেতে চাইছিলেন না। প্রবেশ ও প্রস্থান দ্বার ছিল সংকীর্ণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত অন্তত ২৫। মণ্ডপে নিরাপত্তা ও ভিড় ব্যবস্থাপনার ফাঁকফোকরগুলি কীভাবে কেড়ে নিল এতগুলি প্রাণ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে।

পুজোয় বইয়ের স্টলে বুলডোজার, যাদবপুরে রাতভর প্রতিরোধ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।

বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই চোরবাগানে ছিলেন সম্পূর্ণা

পুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে গিয়ে ভিড় সামলানোর অব্যবস্থা দেখে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল সম্পূর্ণার মনে। হাওড়ার বেলুড়ের বাসিন্দা, ৩০ বছর বয়সি সম্পূর্ণার কথায়, চোরবাগানে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ।

যা ঘটেছিল চোরবাগান দুর্গাপুজো মণ্ডপে

Chorbagan Durga Puja incident: এই ঘটনার পর থেকেই পুজো কমিটির ব্যবস্থাপনা এবং এর পিছনের পট পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, পুজোর ঠিক আগেই চোরবাগান পুজো কমিটির রদবদল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল।

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।