সরকারি স্কুল সব কোথায় গেল?
Public education crisis India: কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে এমন ৭,৯৯৩ টি স্কুল রয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। এই পরিসংখ্যান থেকে এটাও স্পষ্ট, ডাবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার হোক বা কংগ্রেস বা পরিবর্তনের ধ্বজাধারী তৃণমূল সরকার— সরকারি স্কুলের পতনের ছবিটা সব জায়গাতেই এক।
সারা দেশে শিক্ষা নিয়ে বছরভর কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির পক্ষ থেকে হাজার রকম ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির বন্যার মাঝে এমন কিছু পরিসংখ্যান সামনে এসেছে যা আরও একবার সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটা নগ্ন করে দিল। কোন তথ্য বা সমীক্ষা প্রকাশিত হওয়ার পর তা যদি সরকারের মনমত না হয় তবে এদেশের শাসকেরা চক্রান্তের গন্ধ পান। তবে এবারের সমীক্ষা লব্ধ তথ্য খোদ কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে পেশ করেছে। ইউনাইটেড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন (ইউডিআইএসই) তাদের সমীক্ষায় জানাচ্ছে, দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা উদ্বেগজনক ভাবে কমছে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের জবানি অনুসারে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে দেশে সরকারি স্কুলের মোট সংখ্যা ছিল ১০,৩২,৫৭০ যা ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে কমে দাঁড়িয়েছে ১০,১৩,৩২২,অর্থাৎ এই সময়ে দেশে প্রায় ১৯ হাজার স্কুল কমে গিয়েছে। রাজ্য ওয়ারি তালিকায় প্রথম তিনটি নাম হলো, যথাক্রমে মধ্যপ্রদেশ (৭,০০০),ওড়িশা (৪,৬০০), জম্মু-কাশ্মীর (৪,৩০০)। আর শেষ শিক্ষাবর্ষের (২০২৪-২৫) টাটকা হিসাবটা হলো প্রথম বিহার (১,৮৯০), দ্বিতীয় হিমাচল প্রদেশ (৪৯২) ও তৃতীয় কর্নাটক (৪৬২)।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SSC Recruitment Verdict: মূলত তিন ধরনের ‘অযোগ্য’ রয়েছেন— যাঁরা সাদা খাতা জমা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন, যাঁরা প্যানেল-বহির্ভূত ভাবে বা প্যানেলের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরে চাকরি পেয়েছেন এবং যাঁরা ‘র্যাঙ্ক জাম্প’ করে চাকরি পেয়েছেন।
স্কুল সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে শূন্য থেকে দশ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে এমন স্কুলের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২২-২৩ সালে এমন স্কুলের সংখ্যা ছিল ৫২,৩০৯ যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ৬৫,৫০৪। এক্ষেত্রে প্রথম তিনটে স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৬,৭০৩),উত্তরপ্রদেশ (৬,৫৬১),মহারাষ্ট্র (৬,৫৫২)। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো, এই ধরনের স্কুলগুলিতে শিক্ষক সংখ্যা কমার বদলে বেড়েছে। ১.২৬ লক্ষ থেকে বেড়ে হয়েছে ১.৪৪ লক্ষ। এই শূন্যের গল্পটাতে আলাদা করে নজর করা দরকার।
কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ৩,৮১২টি স্কুলে পড়ুয়া সংখ্যা শূন্য অথচ সেই স্কুলগুলিতে ১৭,৯৬৫ জন শিক্ষক নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। দেশজুড়ে পড়ুয়া শূন্য স্কুলে বেতন পাওয়া শিক্ষকের সংখ্যা ২০,৮১৭ জন। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে এমন ৭,৯৯৩ টি স্কুল রয়েছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। এই পরিসংখ্যান থেকে এটাও স্পষ্ট, ডাবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকার হোক বা কংগ্রেস বা পরিবর্তনের ধ্বজাধারী তৃণমূল সরকার— সরকারি স্কুলের পতনের ছবিটা সব জায়গাতেই এক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SSC SCAM: অযোগ্য হয়েও যাঁরা অবৈধভাবে শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকা অনেকেই রয়েছেন।
দেশজুড়ে সরকারি স্কুলগুলির হতশ্রী অবস্থার কারণে গত পাঁচ বছরে ৬৫.৭ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়েছে, আর তার মধ্যে ২৯.৮ লাখ কিশোরী। কংগ্রেস সাংসদ রেনুকা চৌধুরীর এক প্রশ্নের উত্তরে সংসদে এই তথ্য দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সাবিত্রী ঠাকুর। কী ধরনের অসম ব্যবস্থা দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় কায়েম হয়েছে তা বুঝতে এই তথ্যটিই যথেষ্ট। এই পরিসংখ্যানকে যদি রাজ্যওয়াড়ি ভাগ করা যায় তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গুজরাটের। শুধু ২০২৫ সালে এই রাজ্যে স্কুল ছেড়েছে ২.৪ লক্ষ শিক্ষার্থী; এর মধ্যে ১.১ লাখই ছাত্রী। গুজরাটে ২০২৪ সালে এই স্কুল ছেড়ে দেবার সংখ্যাটা ছিল ৫৪,৫৪১ অর্থাৎ মাত্র একবছরে স্কুল ছুটের পরিমাণ বৃদ্ধি ৩৪০%। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে অসম; এখানে স্কুল ছুট ১,৫০,৯০৬, এর মধ্যে ৫৭,৪০৯ জন ছাত্রী। উত্তরপ্রদেশ রয়েছে তৃতীয় স্থানে। সংখ্যাটা ৯৯,২১৮ জন,এর মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ৫৬,৪৬২ জন।
সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে সেখানে পড়াশোনা না হওয়াটাকে একমাত্র কারণ বলে অনেকে চিহ্নিত করেন। বাস্তব অবস্থা কিন্তু এক মিশ্র চিত্র সামনে আনে। এনসিআরটি-র অধীনস্থ স্বশাসিত সংস্থা পারফরম্যান্স অ্যাসেসমেন্ট, রিভিউ অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব নলেজ অ্যান্ড হলিস্টিক ডেভলপমেন্ট (পরখ) ২০২৫-এর সমীক্ষা আমাদের একটা ধারণা পেতে সাহায্য করে। দেশের ৭৮১ টি জেলায়,৭৪,২২৯ টি স্কুলের ২১,১৫,০২২ জন শিক্ষার্থী ও ২.৭ লাখ শিক্ষক ও স্কুলের কর্মীদের উপর এই সমীক্ষা করা হয়েছিল। তৃতীয় শ্রেণি (ভাষা,গণিত,পরিবেশ), ষষ্ঠ শ্রেণি (ভাষা, গণিত, পরিবেশ) এবং নবম শ্রেণিকে (গণিত, বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান) সমীক্ষার জন্য মনোনীত করা হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে দেখা যাচ্ছে, ৬৭% শিক্ষার্থী নতুন শব্দের অর্থ বুঝতে পারছে; ৬০% ছোট গল্পের মর্মোদ্ধার করত পারছে;৬১% খবর বা সাধারণ নির্দেশিকা পড়ে বুঝতে পারছে। গণিতের ক্ষেত্রে ৫৩% শিক্ষার্থী ১-৯৯ পর্যন্ত সংখ্যা চিনতে ও সাজাতে পারছে, ৫৪% গুণ জানে এবং ৫০% সাধারণ জ্যামিতি ও টাকা-পয়সার হিসাব বুঝতে পারে। ষষ্ঠ শ্রেণির ক্ষেত্রে ৫৪% অঙ্কের স্থানাঙ্ক জানে কিন্তু মাত্র ২৯% ভগ্নাংশ বুঝতে পারে। ৩৮% বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কিত গণিতের সমাধান করতে পারে। ৪৪% শিক্ষার্থী তার চারপাশের পরিবেশের উপাদানগুলির নাম ও কাজ জানে, ৫৬% মাত্র স্কুল, বাজার,পঞ্চায়েতের কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা রাখে। নবম শ্রেণির ক্ষেত্রে ৪৫% সংবিধানের অধিকার ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের কথা জানে,৩১% পূর্ণ সংখ্যা ও ভগ্নাংশের অঙ্ক করতে সক্ষম, ২৪% শতকরার হিসাব বোঝে, মাত্র ৩৪% জীব ও জড়ের পার্থক্য করতে পারে।
পরখের রিপোর্ট আরও কয়েকটি দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রথমটি হলো রাজ্যভিত্তিক অসমতা। যেমন পাঞ্জাব,কেরল ও হিমাচল প্রদেশের পারফরম্যান্স ভালো আবার ঝাড়খণ্ড, জম্মু -কাশ্মীর ও মেঘালয় তালিকার একেবারে নিচের দিকে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও তপশিলি জাতি,উপজাতি ও ওবিসিদের কাম্য মান সাধারণ থেকে অনেকটাই পেছনে। এক্ষেত্রে বিষয়টা শুধু অর্থের সংস্থান নয়,পরিকল্পনার অভাবও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, তপশিলি জাতির ক্ষেত্রে পোস্ট ম্যাট্রিক স্কলারশিপে ২০১৯-২০ সালে কেন্দ্রীয় অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিল ২,৭১০ কোটি টাকা যা ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে হয় ৫,৪৭৫ কোটি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আধার সংযুক্তির প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে স্কলারশিপ প্রাপকের সংখ্যা ১২.৭% কমে গিয়েছে। বিভিন্ন স্তরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে 'টিচিং অ্যাট দি রাইট লেভেল' চালু হয়েছিল,তার মূল্যায়ণও করা দরকার। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি স্কুলে ভর্তির সংখ্যা ছিল ১২১.৬ মিলিয়ন যেখানে বেসরকারি ক্ষেত্রে ৯৫.৯ মিলিয়ন। এখনও সময় আছে সরকারি স্কুলকে বাঁচানোর। স্কুল বন্ধ নয়,তাকে আধুনিক চাহিদার সঙ্গে মেলানোই সময়ের দাবি।






