এই নির্বাচনই স্থির করবে অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যত
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল অভিষেকের। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব কয়েক গুণ বেড়েছে।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কেবল বাংলার মসনদ দখলের লড়াই নয়, এটি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। বর্তমানের উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, বক্তৃতা এবং রণকৌশল বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি এখন আর কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি নন, বরং দলের প্রধান কাণ্ডারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল অভিষেকের। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব কয়েক গুণ বেড়েছে। তিনি এখন কেবল একজন ‘তরুণ নেতা’ নন, বরং দলের ‘চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট’ বা প্রধান পরিকল্পনাকারী। প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে বুথ স্তরের সংগঠন সাজানো—সবটাই হচ্ছে তাঁর ‘ডিজিটাল এবং ডেটা-চালিত’ পরিকল্পনা অনুযায়ী। এই নির্বাচন প্রমাণ করবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তিনি কতটা সফলভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
অভিষেকের ২০২৬-এর প্রচারের ধরনে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মুডে রয়েছেন। তিনি বারবার জেলা সফরে গিয়ে নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো ‘মিশন ২৫০’, অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ২২৬ আসনের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে ২৫০টি আসনে জয়লাভ করা। তিনি বারবার দাবি করছেন, তৃণমূল ২০২১ সালের চেয়েও ভালো ফল করবে। এটি মূলত কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার এবং বিরোধীদের মনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারের অন্যতম বড় অংশ হলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তিনি অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থায় সব দল সমান সুযোগ পাচ্ছে না (Level Playing Field নেই)। কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাঁর এই ক্রমাগত আক্রমণ ভোটারদের মধ্যে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা—তৃণমূল ‘একা’ লড়াই করছে ‘দিল্লির শক্তির’ বিরুদ্ধে।
রেজিনগরসহ একাধিক জনসভা থেকে অভিষেক একটি নতুন শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন—‘অশুভ আঁতাত’। তাঁর দাবি, বিজেপি, কংগ্রেস, আইএসএফ, এজেইউপি—এই দলগুলো আদর্শগতভাবে আলাদা হলেও তৃণমূলকে হারাতে গোপন জোট করেছে। তিনি এই জোটের নেতাদের ‘পচে যাওয়া অংশ’ (Rotten Elements) বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এদের প্রধান লক্ষ্য হলো রাজ্যে অস্থিরতা তৈরি করা।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারের কেন্দ্রে চলে এসেছে এজেইউপি নেতা হুমায়ুন কবীরের একটি ভাইরাল ভিডিও। অভিষেক দাবি করেছেন, এই ভিডিওতে বিজেপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে। তিনি এটিকে একটি ‘পলিটিক্যাল ডিল’ হিসেবে দেখছেন, যার লক্ষ্য মুসলিম ভোট ভাগ করে তৃণমূলকে দুর্বল করা। এই ইস্যুটি তুলে তিনি একদিকে যেমন বিরোধীদের নৈতিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন, অন্যদিকে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংককে সতর্ক করার চেষ্টাও করেছেন।
অভিষেক খুব কৌশলে বাঙালির ‘অস্মিতা’ বা আত্মসম্মানকে প্রচারের অংশ করেছেন। এনআরসি এবং সিএএ-র বিরোধিতা করে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারই সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব রক্ষার একমাত্র ভরসা। জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি তৃণমূলের জন্য একটি বড় হাতিয়ার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফরাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী মেহতাব শেখের নাম ‘যৌক্তিক অমিলের’ কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছিল। এরপর কলকাতার উচ্চ আদালত ও দেশের শীর্ষ আদালত ঘুরে আবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত ট্রাইব্যুনালে মাত্র এক দিনের শুনানিতেই তিনি তাঁর ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন। তাহলে ট্রাইব্যুনালের এই একটি রায় কি প্রমাণ করল?
কেন ২০২৬-এর নির্বাচন অভিষেকের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
গত কয়েক বছরে তৃণমূলের অন্দরে যে বিশাল রদবদল ঘটেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন অভিষেক। তাঁর আনা পেশাদার সংস্থা IPAC, তাঁর তৈরি ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ এবং দলের ভিতরের ‘পুরনো বনাম নতুন’ দ্বন্দ্ব—সবকিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা হবে এই নির্বাচনেই।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির উত্থান তৃণমূলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল তখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু আবেগের রাজনীতি দিয়ে বিজেপিকে আটকানো যাবে না। তিনি প্রশান্ত কিশোর ও তাঁর সংস্থা IPAC-কে বাংলায় নিয়ে আসেন।
এবং তার ফলে ২০২১-এর নির্বাচনে তৃণমূলের ২১৩ আসন জয় এবং আধুনিক কায়দায় বুথভিত্তিক প্রচার কৌশল অভিষেককে দলের অঘোষিত ‘নাম্বার টু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি প্রমাণ করেন, তথ্য ও বিজ্ঞানের সাহায্যে রাজনীতি করলে ফলাফল নিশ্চিত।
ডায়মন্ড হারবার মডেল
অভিষেক তাঁর নিজের কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারকে একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। দ্রুত সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, স্বাস্থ্য ক্যাম্প করা, এমনকী আধুনিক ফুটবল ক্লাব গড়ে যুবকদের মন জয় করা—এই মডেলটিকেই তিনি এখন পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইছেন। ২০২৪-এর লোকসভায় ৭.১ লক্ষ ভোটের ব্যবধানে জয় তাঁর এই কৌশলের উপর সিলমোহর বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ডায়মন্ড হারবার মডেলের মতো মডেল কি উত্তরবঙ্গ বা মেদিনীপুরের মতো কঠিন এলাকাগুলিতেও সফল হবে?
তৃণমূলের অন্দরে এখন দুই প্রজন্মের লড়াই। একদিকে ফিরহাদ হাকিম বা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘ওল্ড গার্ড’ বা মমতা-অনুগামী প্রবীণ নেতারা, অন্যদিকে অভিষেকের পছন্দের ‘নিউ ব্লাড’ বা তরুণ বাহিনী। অভিষেক চান ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি চালু করতে এবং বয়স্ক নেতাদের সরিয়ে তরুণদের জায়গা দিতে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও দলের পুরনো স্তম্ভদের উপর ভরসা রাখতে চান। এই জট যদি ২০২৬-এর আগে না খোলে, তবে দলের জন্য বিপদ বাড়তে পারে।
যদি ২০২৬-এ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল বড় জয় পায়, তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান হবে হিমালয়ের মতো অটল। মমতার পরবর্তী নেতা হিসেবে তাঁর দাবি প্রশ্নাতীত হবে। দল পুরোপুরি কর্পোরেট ও প্রফেশনাল মডেলে চলবে। দিল্লির রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
কিন্তু কোনো কারণে ফল খারাপ হলে বা নিজের দুর্গ ধরে রাখতে না পারলে, তাঁর ভবিষ্যৎ কঠিন হয়ে পড়বে। ওল্ড গার্ড বা প্রবীণ নেতারা তাঁর ‘পেশাদার রাজনীতি’র কড়া সমালোচনা শুরু করবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেবেন এবং অভিষেকের গুরুত্ব কমিয়ে দেবেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর চাপ বাড়বে এবং দলের ভিতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমতে শুরু করবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়। তিনি কেবল ভোট চাইছেন না, বরং নিজের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়িত্বের জন্য এক বিশাল যুদ্ধ লড়ছেন। যদি তিনি তাঁর ‘মিশন ২৫০’ সফল করতে পারেন, তবে বাংলার রাজনীতিতে মমতা-পরবর্তী যুগের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে তাঁর অভিষেক পূর্ণতা পাবে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এই নির্বাচন আসলে একটি বড় পরীক্ষা। তিনি একদিকে যেমন নিজের ইমেজকে উন্নয়নের সমার্থক করতে চাইছেন, অন্যদিকে বিরোধীদের ‘ভাইপো’ কটাক্ষের জবাব দিতে চাইছেন কাজের মাধ্যমে। যদি তিনি সফল হন, তবে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। আর যদি ধাক্কা খান, তবে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশাল বদল হবে। বাংলার মানুষ কি অভিষেকের এই ‘আধুনিক মডেল’ গ্রহণ করবেন, নাকি মমতার ‘পুরনো আবেগ’ই শেষ কথা বলবে? উত্তর দেবে ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফল।
দলে তাঁর ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ বা শৃঙ্খলার যে নীতিগুলো তিনি আনতে চেয়েছেন, এই নির্বাচনে জিতলে হয়তো তার পূর্ণ স্বীকৃতি মিলবে। বাংলায় বিজেপিকে পুনরায় পরাজিত করতে পারলে জাতীয় রাজনীতিতেও ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের মধ্যে তাঁর এবং তৃণমূলের ওজন বহুগুণ বেড়ে যাবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল জনপ্রিয়তার ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের একক কৃতিত্বে দলকে জেতানোর এটিই শ্রেষ্ঠ সুযোগ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও কি সর্বজনগ্রাহ্য? তিনি কি শহরের মতো গ্রামাঞ্চলেও একই ভাবে গ্রহণযোগ্য? যদি তা-ই হয় তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন চটি পায়ে মালদায় যেতে হয়?





