সঞ্জয় লীলা বানসালির সেটে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম নয়

Love and War set accident: সঞ্জয় লীলা বানসালির সেটে এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কিন্তু এবারই প্রথম নয়। তাঁর রাজকীয় আর নিখুঁত সেট তৈরির খেসারত আগেও দিতে হয়েছে সাধারণ শ্রমিকদের। AICWA-এর চিঠিতে পরিচালকের অতীতের এমন বেশ কিছু দুর্ঘটনার খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে।

inscript
৩ মিনিট
সঞ্জয় লীলা বানসালির সেটে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম নয়

সিনেমার পর্দায় আমরা এক-একটি দুর্দান্ত দৃশ্য দেখে হাততালি দিই। সেই হাততালির ভাগীদার হন ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। হাততালির পরিধি আরেকটু বাড়লে ভাগ বসাতে পারেন পরিচালক। কিন্তু, ক্যামেরার পিছনের মানুষরা? নৈব নৈব চ। যে দৃশ্য দেখে হাততালি পড়ে তার বিশাল সেট, চোখ ধাঁধানো আলো আর তারকার মেলা—এই সবকিছুর পিছনে দিন-রাত এক করে খাটেন যাঁরা, সেই সাধারণ টেকনিশিয়ান বা শ্রমিকরা নাম তো পান না। আর জীবনের দাম ঠিক কতটা?

বলিউডের নামী পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালির আগামী সিনেমা ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ (Love & War)-এর সেট এখন খবরের শিরোনামে। তবে কোনো জাঁকজমক বা নতুন গানের জন্য নয়, বরং এক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণে। ১৭ জুন মুম্বইয়ের ফিল্ম সিটির কাছে ‘রয়্যাল পাম্প স্টুডিও’তে ছবিটির শুটিং চলাকালীন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে (শর্ট সার্কিট থেকে) মারা যান ৪২ বছর বয়সি কার্পেন্টার বা ছুতার চন্দ্রধারী সিং যাদব। জানা গিয়েছে, ঘটনার সময় সেটে উপস্থিত আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন।

চন্দ্রধারী ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী এবং দুটি নাবালিকা মেয়ে এখন অথৈ জলে। বানসালি প্রোডাকশনস থেকে পরিবারটির জন্য ৪০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হলেও, ক্ষোভ কমেনি শ্রমিক সংগঠনগুলির। ‘অল ইন্ডিয়া সিনেমা ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (AICWA) সরাসরি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এই ঘটনার উচ্চ-পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরিচালকের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করার দাবি জানিয়েছে। শুধু তাই নয়, ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করার পাশাপাশি মৃত শ্রমিকের স্ত্রীর চাকরি এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার দায়িত্ব নেওয়ার দাবিও উঠেছে।

নিয়ম কি শুধুই খাতায়-কলমে? কী বলে সেফটি রুলস?

একটি ফিল্ম সেটে শত শত মানুষ একসঙ্গে কাজ করেন। সেখানে সুরক্ষার জন্য আইনি নিয়ম কিন্তু কম নেই। সরকারি শ্রম আইন এবং সিনেমা সংগঠনগুলির নিজস্ব বেশ কিছু নির্দেশিকা রয়েছে, যা মেনে চলা প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থার বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
MeToo-পরবর্তী সমাজের সংকট তুলে ধরেছে, অনুরাগ কাশ্যপের ‘বান্দর’?

Bandar movie review: MeToo-পরবর্তী ভারতে পুরুষত্ব, সম্মতি, বিচারব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে অনুরাগ কাশ্যপের ‘বান্দর’। ববি দেওলের অভিনয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র কি সমকালীন ভারতীয় সমাজের অস্বস্তিকর বাস্তবতার এক নতুন প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে পেরেছে?

  • লেবার কোড এবং কাজের সময়: নতুন শ্রম আইন (OSH Code 2020) অনুযায়ী, সিনেমার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি অডিও-ভিজ্যুয়াল কর্মী—সে তিনি অভিনেতা হোন বা দিনমজুর ছুতার—সবার জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রযোজকের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? এই ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’-এর সেটের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে যে, শ্রমিকদের দিনে প্রায় ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে বাধ্য করা হতো! দীর্ঘক্ষণ খাটুনির ফলে ক্লান্তি আসা এবং তার থেকে দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি যে বহুগুণ বেড়ে যায়, তা বলাই বাহুল্য।

  • সেট নির্মাণ ও সুরক্ষার শংসাপত্র: ফিল্ম সেটে যখন কোনো বড় বা জটিল অস্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়, তখন মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (MCGM) ও ফায়ার সেফটি অ্যাক্ট অনুযায়ী স্ট্রাকচারাল সেফটি সার্টিফিকেট এবং ফায়ার ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুটিং শুরু হওয়ার আগে ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ বা ঝুঁকি মূল্যায়ন করা এবং সেটে পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (যেমন হেলমেট, হারনেস, গ্লাভস) রাখা জরুরি।

কিন্তু ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’ ছবিতে ভিকি কৌশল, রণবীর কাপুর, আলিয়া ভট্টের মতো মস্ত বড় তারকারা থাকা সত্ত্বেও এত বিশাল বাজেটের প্রজেক্ট হওয়া সত্ত্বেও কেন এই সুরক্ষাবিধিগুলি কড়াভাবে মানা হলো না, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

বানসালির সেটে মৃত্যু এই প্রথম নয়

সঞ্জয় লীলা বানসালির সেটে এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কিন্তু এবারই প্রথম নয়। তাঁর রাজকীয় আর নিখুঁত সেট তৈরির খেসারত আগেও দিতে হয়েছে সাধারণ শ্রমিকদের। AICWA-এর চিঠিতে পরিচালকের অতীতের এমন বেশ কিছু দুর্ঘটনার খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে:

১. দেবদাস (২০০০-২০০১): বানসালির এই কালজয়ী সিনেমার শুটিং চলার সময় সেটে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ হারান দিনদয়াল যাদব নামের এক কর্মী, গুরুতর আহত হন আরও একজন। এরপর ২০০১ সালে ওই একই ছবির সেটে কাজ করার সময় সুভাষ মোরকর নামের অন্য এক কর্মীরও মৃত্যু হয়।

২. পদ্মাবত (২০১৬-২০১৭): ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এই ছবির সেটে কাজ করার সময় মুকেশ ডাকিয়া (৩৪) নামের এক পেইন্টার বা রংমিস্ত্রি মাত্র ৫ ফুট উঁচুতে একটি সমাধির সেট রং করছিলেন। সেখান থেকে আচমকা পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক চোট পান তিনি এবং পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

এই পুরনো ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করলে একটা স্পষ্ট ‘প্যাটার্ন’ বা নিয়মিত অবহেলার ছবি ফুটে ওঠে। সিনেমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিরিয়ড ড্রামা বা ঐতিহাসিক সিনেমা বানানোর জন্য বানসালি যে বিশাল ও জটিল সেট তৈরি করেন, সেখানে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার চক্করেই মৃত্যু হয় শ্রমিকদের।

এই ঘটনার পর সিনেমা দুনিয়ায় শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ, দীর্ঘ শিফট এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। AICWA স্পষ্ট জানিয়েছে, যতক্ষণ না ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’-এর সেটের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পরীক্ষা বা ‘সেফটি অডিট’ হচ্ছে এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার শংসাপত্র মিলছে, ততক্ষণ ছবির শুটিং পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে মহারাষ্ট্রের সমস্ত ফিল্ম সেটে বাধ্যতামূলক সেফটি অডিটের দাবিও তুলেছে তারা।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দুর্গাপুজোর গয়না তৈরিতে বাংলার মুসলিম কারিগর, স্বীকৃতি পায় কি তাঁদের শ্রম?

Muslim goldsmiths in Bengal: বাংলার স্বর্ণশিল্পে মুসলমান কারিগরদের অবদান এই শ্রমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কলকাতার বৌবাজারের মতো গয়নার বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বাংলার নানা এলাকার কর্মশালায় মুসলমান শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণালংকার নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অনেকের কাছে এই পেশা কেবল চাকরি নয়, পারিবারিক সূত্রে শেখা একটি বিশেষ দক্ষতা।

পুজোর বাজারে মল ও অনলাইনের দাপট, হারিয়ে যাচ্ছে কি পুরনো কলকাতার ব্যবসা?

Durga puja economy 2026: ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে ৫০,০০০-৬৫,০০০ কোটি টাকার। কিন্তু বড় পুজো কমিটি ও ই-কমার্সের রেকর্ড লাভের এই পুজোয়,ছোট পুজো কমিটিগুলির ৩০% বিজ্ঞাপন স্লট খালি ঠেকছে। হকারদের বিক্রিতে নেমেছে ধস। কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীরা ভুগছেন কাঁচামালের সংকটে।

দুর্গাপুজো ২০২৬: কতটা বদলে গেল বাঙালির শারদোৎসব?

Durga Puja 2026: দুর্গাপুজোর প্রতিমা, খাদ্যাভ্যাস, বইয়ের স্টল, কার্নিভাল ও বিসর্জন ঘিরে ২০২৬ সালে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দুর্গাপুজোর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের পরিসর কতটা বদলাচ্ছে?

শারদোৎসবের উৎস কি শুধু ধর্মে, নাকি কৃষি ও সমাজের ইতিহাসেও?

Durga Puja history: শারদোৎসব ও দুর্গাপুজোর ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে কৃষিসভ্যতা, মাতৃকা উপাসনা, তন্ত্র, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং মহিষাসুরের বিকল্প আখ্যান।

বিসর্জনের রাতে শহর নিজের উল্টো ছবি দেখে

Durga Puja Visarjan: ক্যাওড়ামো মানে ক্ষমতার ভাষাকে অপমান করা। ক্যাওড়ামো মানে প্রভুর ভাষায়, প্রভুর বিরুদ্ধে কথা বলা। ক্যাওড়ামো মানে এমন এক শব্দসমাহার, যা অভিধানে ঢোকে না, কিন্তু অলিতে গলিতে বেঁচে থাকে আজীবন।

বিসর্জন একটি বাঙ্ময় নীরব আলো

Durga Puja Visarjan: বিসর্জনের মধ্যে ফেরার ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে। কার ফেরা ফুরিয়ে এল? শুধুই কি এক বাঙালি মেয়ের নিজের বাড়ির কাছে ফেরা ফুরিয়ে আসে? শুধুই কি এক বাঙালি মায়ের নিজের বাচ্চাকাচ্চা সমেত বাপের বাড়িতে ফেরার দিন ফুরিয়ে আসা লেগে থাকে তার মধ্যে? নাকি আরও গভীর অনেক কিছুর, কিংবা খুব সাধারণ সমস্ত কিছুর ফেরা ফুরিয়ে আসে বিসর্জনের সঙ্গে?

মণ্ডপ থেকে থিম পুজো: যেভাবে বদলে গেল কলকাতার প্যান্ডেল শিল্প

Durga Puja pandal history: তপতী গুহ ঠাকুরতার প্রবন্ধ 'Abodes of the Goddess'-এর অংশ বিশেষ অনূদিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এই প্রবন্ধটি প্রাথমিকভাবে ইয়েল স্কুল অব আর্কিটেকচারের জার্নাল 'পারস্পেক্টা' (Perspecta)-য় প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পূর্ণ প্রবন্ধটি দেখতে পারেন: তপতী গুহঠাকুরতা, "অ্যাবোডস অব দ্য গডেস" (Abodes of the Goddess), পারস্পেক্টা ৫২, অক্টোবর ২০১৯: ১৯৫–২০৭।

কারও ফেরা হলো না মায়ের কোলে, কারও চোখের সামনেই চলে গেলেন মা, সপ্তমীর ভিড় কেড়ে নিল চেনা মুখগুলো

Kolkata Durga Puja stampede: যে শিশুটি বাবার হাত ধরে মণ্ডপ দেখতে চেয়েছিল, কিংবা যে তরুণ উৎসবের দিনেও শুধু মায়ের হাসিমুখ দেখতে ভিড়ে সামিল হয়েছিল—মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে তাদের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল।