পূর্ব মেদিনীপুরে খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ, ধর্মান্তরণের চাপ বজরং দলের বিরুদ্ধে
পার্বতীর অভিযোগ, সন্ধ্যায় যখন তাঁরা প্রার্থনা করতে বসেন, সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন। তাঁর চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয়, স্বামীকে গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর ননদ অর্থাৎ মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেনকেও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ।
ছবিতে আক্রান্ত সন্তু সোরেন ও পার্বতী সোরেন
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর একের পর এক হামলার অভিযোগ বেড়েই চলেছে। এ বার পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় দুই খ্রিস্টান পরিবারের সদস্যদের মারধর, জোর করে ধর্মান্তরণের চাপ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আক্রান্ত এক মহিলা পার্বতী হেমব্রম সোরেন। গুরুতর মারধরের জেরে অচৈতন্য হয়ে পড়েন তিনি। পুলিশকে যোগাযোগ করলেই প্রথমে তাঁরা কোনও সাড়া পাননি বলে অভিযোগ করে আক্রান্ত পরিবার। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া থানার অন্তর্গত অর্জুন্ডা গ্রামে দুই সন্তানকে নিয়ে বাস করেন সন্তু সোরেন ও পার্বতী সোরেন। বালিচক চার্চের অধীনে তাঁরা খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। সন্তু সোরেনের কাকা মোহন সোরেনের পরিবারও খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে তাঁর পরিবার। এই দুই পরিবারের উপরই বজরং দল হামলা চালায় এবং ধর্মান্তরণের চাপ দেয় বলে অভিযোগ।
ঠিক কী ঘটেছে?
ইনস্ক্রিপ্টকে পার্বতী জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর ধরে তাঁরা খ্রিস্টান ধর্ম পালন করে আসছেন। কিন্তু এতদিন কোনো সমস্যা হয়নি। গত প্রায় একমাস ধরে তাঁদের নানা হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি। এমনকী, পাঁচ গ্রামের প্রধানদের নিয়ে বিচারসভাও বসে বলে জানান তিনি। প্রথম তাঁদের খ্রিস্টান ধর্ম পালন নিয়ে আপত্তি জানায় তাঁদেরই পাড়া-প্রতিবেশী। বারবার মিটিংয়ে বসা হয়। পঞ্চগ্রামের খাপ পঞ্চায়েতে সিদ্ধান্ত হয়, পার্বতী ও বুদনি সোরেনের পরিবার নিজেদের মতো থাকবেন এবং তাঁদের কোনও কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী তা মানেনি। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ৩০০ জন নিয়ে তাঁরা হাজির হবে পর্বতীদের বাড়ি।
এরপর ২৬ অক্টোবর হামলার মুখে পড়ে তাঁরা। পার্বতীর অভিযোগ, সন্ধ্যায় যখন তাঁরা প্রার্থনা করতে বসেন, সেই সময় ৩০ জনেরও বেশি ব্যক্তি মদ্যপ অবস্থায় জোর করে বাড়িতে ঢুকে তাঁদের মারধর করেন। তাঁর চুলের মুঠি ধরে মারধর করা হয়, স্বামীকে গালিগালাজ করা হয় এবং তাঁর ননদ অর্থাৎ মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেনকেও আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। পার্বতীদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, আঁচ পেয়েই নিজেদের বাঁচাতে ঘরের মূল দরজায় তালা দিয়ে দেন মোহন সোরেন। কিন্তু তাঁদের বাড়ির তালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে হামলাকারীরা। ঘরে ঢুকে প্রার্থনার স্থান ভাঙচুর, বাইবেল পাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পাশাপাশি মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাতে থাকা ভিডিয়ো মুছে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন পার্বতী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯ অক্টোবর লক্ষ্মী মণ্ডল, তাঁর স্বামী, বনশ্রী মণ্ডল ও তাঁর স্বামী গোপাল মণ্ডল-সহ কয়েকজনকে জোর করে ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
পার্বতীর দাবি, গত ১১ অক্টোবরও একই ব্যক্তিরা তাঁদের বাড়িতে এসে খ্রিস্টধর্ম পালন করার কারণে হুমকি দিয়েছিলেন। এ বারও খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। খ্রিস্টধর্মকে ‘আমেরিকান ধর্ম’ বলে কটাক্ষ করে বাড়ির উঠোনে তুলসীমঞ্চ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। সেই নির্দেশ না মানলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, বিদ্যুৎ ও জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং রেশন ও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি আক্রান্ত পরিবারের। তাঁদের কেউ যাতে সাহায্য না করেন, সে জন্যও স্থানীয়দের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। অর্জুন্ডা গ্রামে গিয়ে ইনস্ক্রিপ্ট দেখতে পায়, সন্তু ও মোহন সোরেনের পরিবার যাতে পুকুরের জল ব্যবহার করতে না পারেন, তার জন্য বাঁশের বেড়া দিয়ে পুকুরে যাওয়ার রাস্তা আটকে দেওয়া হয়েছে। মোহন সোরেন পেশায় একজন ভাগচাষী। তাঁকেও কাজে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তাঁর স্ত্রী বুদনি সোরেন। পার্বতী সোরেন তাঁদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা ইনস্ক্রিপ্টকে বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, লোন নিয়ে টোটো কিনেছেন, অথচ কোনো কাজ পাচ্ছেন না তাঁর স্বামী। তাঁদের একপ্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশে প্রথমে জানানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। এরপর মোহন সোরেনের মেয়ে রেণু সোরেন কাঁদতে কাঁদতে থানায় ফোন করেন, তারপর পুলিশ আসে বলে জানান পার্বতী। পুলিশ এসে হামলাকারীদের চলে যেতে বলেন। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তখনই এফআইআর নেওয়া হয় না। এর পরদিন লোন সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে এক আধিকারিক আসেন সন্তু সোরেনের বাড়ি কিন্তু তাঁকেও হেনস্থা করা হয় বলে জানান পার্বতী। এরপর আবারও পুলিশে যোগাযোগ করেন তাঁরা। এদিনই, ২৭ অক্টোবর এফআইআর নেয় পুলিশ।
বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার সম্পাদক হেরোড মল্লিক জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের তরফে আর কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ। অভিযুক্তরা এখনও গ্রামে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে আক্রান্ত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুখ্যমন্ত্রী ও সংখ্যালঘু দফতরের মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা। স্মারকলিপিতে গত তিন মাসে অন্তত ২৬টি নির্যাতনের ঘটনা এবং ১১টি এফআইআর নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, আরও বেশ কিছু ঘটনা ভুক্তভোগীদের ভয় বা নানা কারণে পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হয়নি। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে প্রার্থনা সভায় হামলা, উপাসনাস্থলে ভাঙচুর, ধর্মীয় সামগ্রী নষ্ট করা এবং খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও উপাসকদের হেনস্থা।
১৩টি জেলায় ৬০টি হামলার ঘটনা
পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর হামলার অভিযোগ শুধু পাঁশকুড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে অন্তত ৬০টি ঘটনার নথি সংগ্রহ করেছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা India Hate Lab। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে ৫২টি ঘটনা ছিল বাড়ি, গির্জা, ব্যক্তিগত প্রার্থনাসভা বা খ্রিস্টানদের অন্যান্য জমায়েতে হানা দেওয়ার অভিযোগ। বাকি আটটি ঘটনার মধ্যে ছিল শারীরিক হামলা, দলবদ্ধ হিংসা ও ভাঙচুরের অভিযোগ। এই পরিসংখ্যান সংস্থাটির নিজস্ব নথিভুক্তির ভিত্তিতে তৈরি; এগুলিকে আদালত বা পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত ঘটনার সংখ্যা হিসেবে দেখা যাবে না।
এর আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনাতেও খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। লক্ষ্মী মন্ডল নামে এক মহিলার অভিযোগ, তাঁকে মারধর করে পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং প্রকাশ্যে তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনায় ২০ অক্টোবর এফআইআর দায়ের হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Howrah Christian family: হাওড়ার ভাটোরায় প্রায় আট বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম পালন করা এক পরিবারের উপর হামলা, মারধর ও গ্রাম ছাড়ার হুমকির অভিযোগ উঠেছে। কেন ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিয়ে এমন প্রশ্ন উঠছে? স্থানীয়দের একাংশের আচরণের অভিযোগ কতটা সত্য?
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কী বলছে?
এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা চন্দ্রনাথ দাসের মন্তব্য ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, বজরং দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের উপর হামলার যে অভিযোগ উঠেছে, তা মিথ্যা। তাঁর দাবি, সংগঠনের সদস্যরা কাউকে আক্রমণ করেন না বা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে ‘ধার্মিক শিক্ষার মাধ্যমে’ খ্রিস্টান ও মুসলিমদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনার অভিযান চালাচ্ছে সংগঠন।
চন্দ্রনাথ দাসের কথায়, “আমাদের লক্ষ্য, যতজন খ্রিষ্টান আছেন, তাদের হিন্দু বানিয়ে দেব। আর তারা হয়েও যান। কেউ খ্রিস্টান হবে না, এটাই আমাদের লক্ষ্য।” তাঁর দাবি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ধর্মান্তর রোধ এবং অন্য ধর্মে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা সংগঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার ভিন্ন ধর্মের মানুষকে হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে আনা হয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার বক্তব্য
বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার সম্পাদক হেরোড মল্লিক বলেন, আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর নিজের জেলায় এমন একটি নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বিভিন্ন এলাকায় হামলাকারীরা ক্রমশ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং অজ্ঞাত কোনও সূত্র থেকে মদত পাচ্ছে বলে অভিযোগ। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বারবার আবেদন জানানো হলেও তাতে সাড়া মিলছে না। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে, এমন দেশবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত উগ্রপন্থী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধেও কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের অসহায় বলে মনে করছেন।
পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর একের পর এক হামলার অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠছে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে। প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো ধর্ম পালন করার অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে হুমকি, মারধর কিংবা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করার অভিযোগ কতটা উদ্বেগজনক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার উপর কোনও বিরোধ মেটাতে খাপ পঞ্চায়েতের আদলে বিচারসভা বসিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নির্ধারণের চেষ্টা, সভ্য সমাজে এই প্রবণতা আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। আইন ও আদালতের ঊর্ধ্বে উঠে কারও কি নিজস্ব নিয়মে বিচার করার অধিকার রয়েছে? সংবিধান যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও প্রশাসনেরই। এখন দেখার, পাঁশকুড়ার এই ঘটনায় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়।







