হু হু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা! গাফিলতি কার, গুজরাতে ঠিক কীভাবে ঘটল এত বড় দুর্ঘটনা
Gujrat Bridge Accident: ভোটমুখী গুজরাতে এহেন ঘটনা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-কে একটি বড় ধাক্কা দেবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় গুজরাটে ঘটে গিয়েছে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। ৩০ অক্টোবর সন্ধ্যায় গুজরাতের মোরবি জেলার মাচ্ছু নদীতে ভেঙে পড়ে একটি কেবল ব্রিজ। ব্রিজ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৪০ জনের! এই সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেশ কিছু মানুষ নদীতে তলিয়ে গিয়েছে বলে আশঙ্কা। মেরামতির জন্য বেশ কয়েক মাস বন্ধ ছিল সেতুটি, পুনরায় খোলা হয়েছে মাত্র চারদিন আগেই। তার মধ্যেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ইতিমধ্যেই জোরকদমে উদ্ধার কাজে নেমেছে পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। এই দুর্ঘটনায় বিপরীত সংখ্যক নারী এবং শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশ এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দলের তরফে জানানো হচ্ছে জলে ডুবে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেহ উদ্ধার করা গেলে আসল সংখ্যাটা বোঝা যাবে।
গুজরাত সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তার মধ্যেই ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ভোটের আগে নিঃসন্দেহে এটি চাপে ফেলবে স্থানীয় বিজেপি সরকারকে। স্থানীয়দের দাবি, অত্যাধিক ওজন নিতে না পারার কারণে ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় ৫০০ মানুষ ছিল সেতুটিতে। ভেঙে পড়ার সময় ব্রিজের নিচে আটকে পড়েন প্রায় শতাধিক মানুষ, এমনটাই দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয় উদ্ধারকাজ। পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, ভারতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনী, দমকল বিভাগ উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারারাত ধরে উদ্ধারকার্যে হাত লাগিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সারা রাত ধরে মাচ্চু নদীতে উদ্ধারকার্য চলেছে। জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১৮০ জনকে উদ্ধার করা গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং উদ্ধারকারী-সহ অন্তত ২০০ জন উদ্ধারকার্যে হাত লাগিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই ওই ঘটনার সময়কার বেশ কয়েকটি ভিডিও সামনে এসেছে। ভিডিও-তে দেখা যায়, ব্রিজ ভেঙে পড়তেই কয়েকশো মানুষকে নিয়ে জলে ডুবে যায় ব্রিজের একাংশ। একটি ভিডিও-তে দেখা যাচ্ছে, প্রাণ বাঁচাতে মানুষ সেখানে সাঁতার কাটছে। ভেঙে পড়া ব্রিজের কেবল ধরে ভেসে থাকার শেষ চেষ্টা করছিলেন বেশ কয়েকজন। নদীর ওপর সাধারণ মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা-সহ শিশুদের অসহায় অবস্থা চোখে দেখা যায় না। জানা গিয়েছে, এই ব্রিজ ভেঙে পড়ার আগে এর ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রীতিমতো দুলছে ব্রিজটি। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ব্রিজের প্রথম কেবলগুলি ভেঙে পড়ে এবং এক সেকেন্ডের মধ্যেই ছিটকে সেতুটি নিচে নেমে আসে। মানুষ পরস্পরের ওপর নদীতে পড়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Lula De Silva wins in Brazil: ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বলসোনারোকে হারিয়ে লুলা হতে চলেছেন এই দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।
স্থানীয় বাসিন্দা রঞ্জনভাই প্যাটেল এক স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, “যতজনকে সম্ভব আমরা বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। যাঁরা সাঁতরে পাড়ে আসার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের আমরা টেনে তুলে নিয়েছি। যেহেতু বেশিরভাগ মানুষই মাঝ-নদীতে পড়েছিলেন আমরা তাঁদের বাঁচাতে পারিনি।” আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদমাধ্যমকে জানান, “অফিসের পর আমি বন্ধুদের সঙ্গে এই নদীর ধারে এসেছিলাম। সেই সময়ই ব্রিজ ভেঙে পড়ার বিকট শব্দ শুনতে পাই। সেখানে গিয়ে জলে ঝাঁপ দিই। কিছু মানুষকে উদ্ধার করতে পারি। আমরা বেশ কয়েকজন শিশু ও মহিলাকে উদ্ধার করতে পেরেছিলাম।” অন্যান্য আরও অনেকের মতোই পরিবার নিয়ে এই ঝুলন্ত ব্রিজে ঘুরতে এসেছিলেন আহমেদাবাদের বাসিন্দা বিজয় গোস্বামী। কিন্তু ব্রিজ ভেঙে পড়ার আগেই তাঁরা সেখান থেকে চলে যান। তিনি জানান, ব্রিজের অবস্থা তাঁর সুবিধার লাগছিল না, প্রচণ্ড নড়ছিল ব্রিজটি। তাঁর কথায়, “ব্রিজের উপর প্রচণ্ড ভিড় ছিল। আমি ও আমার পরিবার ব্রিজের ওপরই ছিলাম। সেই সময় কিছু অল্পবয়সি ছেলে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রিজটি নাড়াতে থাকে। কোনও ঠেস ছাড়া সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অসাধ্য ছিল। আমার মনে হচ্ছিল এটি বিপজ্জনক হতে পারে, তাই ব্রিজের কিছুটা গিয়েই সেখান থেকে আমি পরিবার নিয়ে ফিরে আসি। তবে সেখান থেকে আসার আগে সেখানকার কর্মীদের সতর্ক করেছিলাম যে কিছু মানুষ সেখানে ব্রিজটি নাড়াচ্ছে।” বিজয় গোস্বামীর অভিযোগের তির সরাসরি কর্মীদের দিকে। তাঁর দাবি, কর্মীরা তাঁর কথায় পাত্তাও দেয়নি। তাঁরা টিকিট বিক্রি করতেই ব্যস্ত ছিলেন।
ব্রিজ ভেঙে পড়ার দায় কার
বছরের শুরুতেই গুজরাত সরকার ঘোষণা করেছিল, অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে ব্রিজটি। ব্রিজটি মানুষের চলাচলের জন্যই বানানো হয়েছিল। তাই বেশি ঝুঁকি না নিয়ে সাত মাস আগেই ব্রিজটি বন্ধ করে দেওয়া হয় সরকারের তরফে। প্রায় কয়েক কোটি টাকা খরচ করে তা মেরামতির পর চারদিন আগে জনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়। এত টাকা খরচা করে মেরামতি সত্ত্বেও কেবল ব্রিজটি ভেঙে পড়ল কেন? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এখন। অভিযোগ উঠছে বড়সড় দুর্নীতির। অভিযোগ, এই সেতু জনসাধারণের জন্য চালু করার আগে প্রশাসনের কাছ থেকে সবুজ সংকেত নেওয়া হয়নি। শোনা যাচ্ছে, মেরামতকারী সংস্থা প্রশাসনের কাছ থেকে সবুজ সংকেত নেয়নি। সরকারের দাবি, তারা কোনওরকম ফিটনেস সার্টিফিকেট জারি করেনি। ৩০ অক্টোবর সন্ধ্যার এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষের এই গাফিলতিকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। জানা গিয়েছে, সেতুটি সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ‘ওরেভা’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থাকে। সংস্কারের জন্য দীর্ঘ ৭ মাস সেতুটি বন্ধ ছিল। গত ২৬ অক্টোবর তা খোলা হয়। মোরবি পুরসভার সাফ দাবি, ওই সংস্থা তাদের কাছ থেকে কোনও শংসাপত্র নেয়নি। পুরসভার তরফে বিস্ফোরক অভিযোগ জানিয়ে বলা হয়েছে ওই ব্রিজটি সম্বন্ধিত যাবতীয় তথ্য কিছুই তাদের জানানো হয়নি ওরেভা-র তরফে। কেন দেওয়া হয়নি? সরকারি অনুমোদন না পাওয়া সত্ত্বেও কেন ব্রিজটি খুলে দেওয়া হলো? ব্রিজ মেরামত করতে কত টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং কত টাকা খরচ করা হয়েছে তার হিসেব কী, সাধারণ মানুষ দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কেন কর্মীরা সেদিকে দৃকপাত করেননি- ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর এখনও সামনে আসেনি। তবে সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গুজরাত সরকারের মুখপাত্রর দাবি, “দোষীদের ছেড়ে কথা বলা হবে না।সকলকে কড়া শাস্তি দেওয়া হবে।”

বর্তমান অবস্থা
ব্রিজ ভেঙে পড়ার দায় সব পক্ষই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও যা ক্ষতি হয়ে গিয়েছে তা অপূরণীয়। মোরবি-র স্থানীয় হাসপাতাল থেকে এই মুহূর্তে অত্যন্ত মর্মান্তিক ছবি সামনে আসছে একের পর এক৷ একদিকে চলছে দেহ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া৷ অন্যদিকে চলছে ময়নাতদন্ত৷ অধিকাংশ দেহ-ই এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি৷ শোনা যাচ্ছে, কয়েকজন গুরুতর আহত ব্যক্তি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। হাসপাতালে ভিড় লেগে রয়েছে মানুষের৷ মাচ্ছু নদীর ওপরে মোরবির এই শতাব্দীপ্রাচীন ঝুলন্ত সেতুটি পর্যটকদের কাছে বড় আকর্ষণ ছিল৷ রবিবার ছুটির দিন হওয়ায় ভিড়ও ছিল বেশি৷ বাবা-মায়ের সঙ্গে সেতুতে ভিড় জমিয়েছিল অনেক শিশু-ও৷ আপাতত ২৫ জন শিশুর মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে৷ দুর্ভাগ্যবশত, অনেকের দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও। একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনায় হারিয়ে কার্যত অনাথ অনেক শিশু। ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে গুজরাত সরকার ৪ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে মৃতদের পরিবারের জন্য ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে জানা গেছে। এছাড়াও আহতদের ৫০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা করবে কেন্দ্রীয় সরকার।
রাজনৈতিক তরজা
এই কেবল ব্রিজ দুর্ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে গিয়েছে। ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে বিজেপিকে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, তৃণমূলের মতো বিরোধী দলেরা। এদিন গুজরাতের একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “আমার শরীর কেভাডিয়াতে রয়েছে, কিন্তু মন পড়ে রয়েছে মোরবিতে৷ এরকম যন্ত্রণা জীবনে খুব কমই পেয়েছি৷ একদিকে আমার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, অন্যদিকে আমাকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হচ্ছে৷” তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির পুরনো বক্তব্যকে মনে করিয়ে দিয়ে তাঁকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি কংগ্রেস নেতা দ্বিগ্বিজয় সিং।
একটি পুরনো ভিডিও শেয়ার করেন তিনি, যেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে কটাক্ষ করছেন। ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে দেখা যাচ্ছে ২০১৬-এ কলকাতায় পোস্তা ফ্লাইওভার ধসে পড়া ‘অ্যাক্ট অফ গড’ নয় ‘অ্যাক্ট অফ ফ্রড’। মোরবির এই ঝুলন্ত ব্রিজ ভেঙে পড়ার ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীকে সেই মন্তব্য স্মরণ করান দিগ্বিজয় সিং। তবে যে যাকেই দোষী সাব্যস্ত করুক না কেন, ভোটমুখী গুজরাতে এহেন ঘটনা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-কে একটি বড় ধাক্কা দেবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।







