কেন বেকার যুবদের ‘পরজীবী’, ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করলেন প্রধান বিচারপতি?
CJI Surya Kant: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, অনেক তরুণ আইনজীবী কাজ না পেয়ে সামাজিক মাধ্যম, আরটিআই আন্দোলন বা নানা ধরনের অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং সেখান থেকে 'সবাইকে আক্রমণ' করতে শুরু করছে। সেই প্রসঙ্গেই তিনি 'তেলাপোকা'র মতো শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর একটি মন্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় তিনি কিছু বেকার তরুণ আইনজীবী সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন,
কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
একইসঙ্গে তিনি বলেন, সমাজে এমন কিছু 'পরজীবী' রয়েছে যারা বিচারব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতির মুখে এমন ভাষা শোনা মাত্রই আইনজীবী মহল, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে সুপ্রিম কোর্টে একটি অবমাননার আবেদন শুনানির সময়। আবেদনটি করেছিলেন আইনজীবী সঞ্জয় দুবে। তাঁর অভিযোগ ছিল, সিনিয়র অ্যাডভোকেট নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিল, দিল্লি হাই কোর্ট তা ঠিকভাবে মানছে না। এই বিষয় নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন এবং আদালত অবমাননার অভিযোগ তোলেন।
মামলাটি শুনছিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী। শুনানির শুরু থেকেই প্রধান বিচারপতি আবেদনকারীর অবস্থান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এই ধরনের আবেদন আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। তিনি বলেন, আইনজীবীদের নিজেদের পেশার মর্যাদা বজায় রাখা উচিত। আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে বাইরের মানুষও আইনপেশাকে সম্মান করবে না।
এই সময়েই তিনি বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, সমাজে এমন কিছু 'পরজীবী' রয়েছে যারা বিচারব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ চালায়। এরপর তিনি বলেন, অনেক তরুণ আইনজীবী কাজ না পেয়ে সামাজিক মাধ্যম, আরটিআই আন্দোলন বা নানা ধরনের অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং সেখান থেকে 'সবাইকে আক্রমণ' করতে শুরু করছে। সেই প্রসঙ্গেই তিনি 'তেলাপোকা'র মতো শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।
এই মন্তব্য খুব দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আইনজীবীদের একটি অংশের মতে, প্রধান বিচারপতির বক্তব্য অত্যন্ত অবমাননাকর। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন দেশে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব বড় সমস্যা, তখন এই ধরনের তুলনা অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর বলে মনে হয়েছে।
সমালোচকদের বক্তব্য, বেকারত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার ফল। ফলে কর্মসংস্থান না পাওয়া তরুণদের 'তেলাপোকা' বলে তুলনা করা অত্যন্ত অপমানজনক। বিচারব্যবস্থার শীর্ষপদে থাকা একজন ব্যক্তির কাছ থেকে আরও সংযত ভাষা প্রত্যাশিত বলেও মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।
অন্যদিকে, কিছু আইনজীবী ও পর্যবেক্ষকের মতে, প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থে না দেখে তাঁর ক্ষোভের প্রেক্ষাপট বোঝা উচিত। তাঁদের মতে, বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং অযৌক্তিক মামলা দায়ের নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তোলেন। তিনি বলেন, আইন পেশায় ভুয়ো ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বাড়ছে বলে তাঁর গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর এই মন্তব্যে আইন পেশার মান এবং স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত সঞ্জয় দুবের আবেদন গ্রহণ করেনি। আদালত জানিয়ে দেয়, এই ধরনের আবেদনকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো কোনো কারণ তারা দেখছে না। একই সঙ্গে আবেদনকারীর সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। জনসমাজ বলছে, বিচারব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই বিচারপতিদের কথাবার্তায়ও সংযম ও সংবেদনশীলতা থাকা উচিত। বিশেষ করে বেকার তরুণদের নিয়ে মন্তব্য করার সময় শব্দচয়নে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
ভারতে বেকারত্ব বহুদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। উচ্চশিক্ষিত বহু তরুণ পছন্দসই কাজ পাচ্ছেন না। অনেকেই আইন, সাংবাদিকতা, গবেষণা বা সামাজিক আন্দোলনের মতো ক্ষেত্র বেছে নিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যম বা আরটিআই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের এভাবে মন্তব্য করার জন্যও তিনি অনেকের কাছে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।
আরটিআই কর্মী ও নাগরিক সমাজের অনেকেই বলেছেন, তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থে কাজ করা গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব ধরনের সমালোচনাকে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।






