বিক্ষোভের আগেই কড়াকড়ি: দিল্লিতে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, দেশজুড়ে পুলিশি তৎপরতা
Cockroach Janata Party: এই বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ট্রেন বাতিল এবং ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে খবর আসছে, বহু আন্দোলনকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, আটক করা হচ্ছে কিংবা বিক্ষোভে যোগ না দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
দিল্লি এখন ১০ অক্টোবরের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তবে এই প্রস্তুতি স্রেফ যন্তর মন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই। ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision বা SIR)-এর প্রতিবাদে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা, ট্রেন বাতিল এবং ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে খবর আসছে, বহু আন্দোলনকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, আটক করা হচ্ছে কিংবা বিক্ষোভে যোগ না দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ ও সিআরপিএফ (CRPF) ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন
সিজেপি-র ১০ অক্টোবরের প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড়ে মোতায়েন থাকা কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ)-এর অন্তত ৭০টি কোম্পানি, অর্থাৎ প্রায় ৭,০০০ জওয়ানকে দিল্লিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ ও ৬ অক্টোবর জারি করা দুটি সরকারি নির্দেশের ভিত্তিতে এই তথ্য জানা গিয়েছে। সিআরপিএফ-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার ৪০টি কোম্পানিকে দ্রুত দিল্লিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লি পুলিশকে সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CAPF)-এর মোট ২২১ কোম্পানি—অর্থাৎ প্রায় ২৩,০০০ জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১৫ হাজার দিল্লি পুলিশকর্মীও মোতায়েন রয়েছেন। নতুন করে অনুমোদিত বাহিনীর মধ্যে রয়েছে সিআরপিএফ-এর ৮৫ কোম্পানি, এসএসবি-র ১০ কোম্পানি, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF)-এর সাত কোম্পানি, আইটিবিপি-র সাত কোম্পানি এবং সিআইএসএফ-এর এক কোম্পানি।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ
১০ অক্টোবরের সিজেপি বিক্ষোভের আগে দিল্লিতে মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ট্রেন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, মেট্রো ও ট্রেন চলাচলের উপর কোনোভাবেই "সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা" বা টোটাল শাটডাউন জারি করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরিষেবা নিয়ন্ত্রিত করা যেতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে যাতে অযথা অসুবিধা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আদালত জানায়, গুরুগ্রাম, গ্রেটার নয়ডা, পূর্ব দিল্লি ও দক্ষিণ দিল্লি থেকে বহু ছাত্রছাত্রী, কর্মী এবং প্রবীণ নাগরিক প্রতিদিন জীবিকা ও অন্যান্য প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াত করেন। তাঁদের কথা বিবেচনা করেই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন,
“সব কিছু স্তব্ধ করে দেওয়া যায় না। সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা চলবে না।”
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আনুপাতিকতার নীতি মেনে চলতে হবে। তাঁর কথায়,
“মাছি মারতে কামান দাগা উচিত নয়।”
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেন,
“ট্রেনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করুন, কিন্তু একেবারে বন্ধ করবেন না।”
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মেট্রো ও অন্যান্য রেল পরিষেবা নিয়ন্ত্রিতভাবে চালু রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেন। আদালত নির্দেশ দেয়, পরিষেবা চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা সংবাদপত্র ও ওয়েবসাইটে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে, যাতে যাত্রীরা আগাম জানতে পারেন এবং দুর্ভোগ কমে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cockroach abdul Detained for Dissent: ৮ অক্টোবর, ২০২৬, কলকাতা পুলিশ বাঁকুড়ার সিজেপি কর্মী শেখ আব্দুল হাফিজ ও তাঁর দলকে আটক করে। অভিযোগ, পুলিশি হেফাজতে মারধর ও মহিলা সদস্যদের নিগ্রহের। ৯ ঘণ্টা থানায় আটকে রেখে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করা হয়। ১০ অক্টোবরের যন্তর মন্তর সমাবেশ ঘিরে, ১০ হাজার কর্মী আটকের অভিযোগ করেছে সিজেপি। অগাস্ট মাসে সিজেপির 'স্কুল ঠিক করো' অভিযানের পর, আব্দুলের বাবার মৃত্যু হয়েছিল।
৩৭টি ব্যারিকেড পয়েন্ট ও ১৫টি আটক কেন্দ্র
সিজেপি-র দাবি, দেশজুড়ে তাদের হাজার হাজার সমর্থককে আটক করা হয়েছে। যদিও রয়টার্স গত ৯ অক্টোবর জানিয়েছে, দেশজুড়ে ঠিক কতজনকে আটক করা হয়েছে সেই সংখ্যা বা দলের তরফ থেকে ছড়ানো ভিডিওগুলির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে আলাদা কিছু প্রতিবেদনে আটক ও পুলিশের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। মূল পার্থক্যটা এখানেই—দেশজুড়ে ব্যাপক দমনপীড়নের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা হয়নি। (রয়টার্স)
সামনে আসা এই ঘটনাটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট বিক্ষোভস্থলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাই বলছে না; বরং এটি সেই পরিস্থিতির ছবি তুলে ধরে, যেখানে কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভস্থলে পৌঁছনোর আগেই মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং ট্রেন বাতিল
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে দিল্লির গণপরিবহন ব্যবস্থা।
দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি) ঘোষণা করেছে, ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান গেট ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত (১০ অক্টোবর সহ) বন্ধ থাকবে। তবে নতুন দিল্লি স্টেশন বাদে বাকি প্রভাবিত স্টেশনগুলিতে ট্রেন বদল বা ইন্টারচেঞ্জের সুবিধা চালু রাখা হবে।
দিল্লি পুলিশের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সংবেদনশীল এলাকাগুলির দিকে বিশাল জনস্রোত যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে মেট্রো ট্রেনের যাতায়াত বা ফ্রিকোয়েন্সি কমানোরও অনুরোধ জানিয়েছিল তারা। তবে এই বিধিনিষেধের কারণে কেবল নির্দিষ্ট স্টেশনগুলিতে যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে, পুরো মেট্রো নেটওয়ার্ক কিন্তু সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। (দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া)
রেলপথের উপরও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
ভারতীয় রেল ঘোষণা করেছে, আগামী ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নতুন দিল্লি এবং হযরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে আসা ও ছেড়ে যাওয়া সমস্ত ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বাতিল থাকবে।
পাশাপাশি, পূর্ব রেলওয়ে ৯ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী এক্সপ্রেসও বাতিল করেছে: ১২৩০১ হাওড়া–নতুন দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস এবং ১২৩১৩ শিয়ালদহ–নতুন দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস।
দিল্লি স্টেশনগুলির আশপাশে প্রচণ্ড ভিড় ও যানজট হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-কে জানিয়েছেন, গত ৮ অক্টোবর প্রায় ৫০০০ যাত্রী তাঁদের ট্রেন ধরতে পারেননি। তবে এই সংখ্যাটি ১০ই অক্টোবরের ট্রেন বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মোট যাত্রীদের সংখ্যাকে তুলে ধরে না। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
এই সিদ্ধান্তগুলির প্রভাব কেবল সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের উপরই পড়ছে না; কাজ, পড়াশোনা বা পারিবারিক প্রয়োজনে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের দৈনন্দিন চলাফেরাও ব্যাহত হতে পারে।
৩৭টি ব্যারিকেড পয়েন্ট ও ১৫টি আটক কেন্দ্র
এই বিক্ষোভ মোকাবিলায় দিল্লি পুলিশ একটি ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে।
'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন দিল্লি জেলার বিভিন্ন স্থানে ৩৭টি ব্যারিকেড বা তল্লাশি পয়েন্ট এবং রাজধানীর ১৫টি পুলিশ জেলাতেই আলাদা আটক কেন্দ্র (detention centre) রাখা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rahul Gandhi SIR protest: গত তিন দিন ধরে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে দিল্লি। মঙ্গলবার সংসদ থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে পদযাত্রা দিয়ে শুরু হয় এই প্রতিরোধ। পুলিশ বাধা দিলে রাহুল গান্ধী ব্যারিকেডে উঠে জাতীয় পতাকা নাড়ান এবং সহকর্মীদের নিয়ে ঢুকে পড়েন সংলগ্ন আকাশবাণী ভবনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীরা যাতে কোনোভাবেই যন্তর মন্তরের দিকে এগিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা চূড়ান্ত করতে গত ৮ অক্টোবর পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক ডেকেছিলেন।
পাশাপাশি, বিভিন্ন হোটেল ও গেস্ট হাউসেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, আবাসন কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে কিংবা তিনি যদি বিক্ষোভের উদ্দেশ্যে এসে থাকেন বলে মনে হয়, তবে যেন সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানাকে অবহিত করা হয়।
এই বিবরণগুলি পুলিশের পরিকল্পিত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে, তবে এর দ্বারা এটি প্রমাণিত হয় না যে প্রতিটি পরিকল্পিত আটক বা বিধিনিষেধ বাস্তবে কার্যকর করা হয়েছে। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের পরিধিও বেশ ব্যাপক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক গত ৮ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে দিল্লি পুলিশকে সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় আধা-সেনাবাহিনীর (Central Armed Police Forces) মোট ২২১ কোম্পানি—অর্থাৎ প্রায় ২৩,০০০ কর্মী সরবরাহ করেছে। এটি কেবল অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা, রাজধানীর মোট পুলিশ কর্মীর সংখ্যা এটি নয়। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার কারণ দেখিয়ে প্রশাসন আগামী ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির সমস্ত মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়েছে। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার যুক্তিতে কর্তৃপক্ষ এই সমস্ত ব্যবস্থার পক্ষে সাফাই দিয়েছে। তবে সব মিলিয়ে এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী এবং সাধারণ নাগরিক—উভয়ের উপরই অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ না করে পুলিশ কীভাবে সহিংসতা রোধ করতে পারে?
মসজিদে ঘোষণা এবং পুলিশের জনসংযোগ
এই প্রস্তুতি কেবল যাতায়াত ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
গত ৮ অক্টোবর সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় ওল্ড দিল্লির একটি মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এক দিল্লি পুলিশ কর্মী সাধারণ মানুষের উদ্দেশে কথা বলছেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা পরিবারগুলিকে অনুরোধ করেন, তারা যেন তাদের সন্তানদের অপ্রয়োজনীয় বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে বলেন।
৯ অক্টোবর 'দ্য প্রিন্ট' (ThePrint) এই ঘটনার কথা প্রকাশ করে। অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও বিক্ষোভের আগে শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের জনসংযোগ বা যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশ তাদের এই পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, এটি একটি বেআইনি জমায়েতে অংশ নেওয়া থেকে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখারই একটি প্রচেষ্টা মাত্র। (দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
আইনি নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং কোনো বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করার মধ্যের পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কর্তৃপক্ষ যেকোনো নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ প্রচার করতেই পারে এবং তা লঙ্ঘন করলে কী ধরনের আইনি পরিণতি হতে পারে, তাও বোঝাতে পারে। তবে, জনবহুল বা ধর্মীয় স্থানে এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যে, এ জাতীয় সতর্কতাগুলি আদতে কীভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
উপলব্ধ প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট একটি মসজিদে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি নথিভুক্ত রয়েছে, তবে এর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় না যে দিল্লির প্রতিটি মসজিদেই এমন সতর্কতা প্রচারের জন্য কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মহারাষ্ট্র: সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের জন্য নোটিশ ও সতর্কতা
মহারাষ্ট্র থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ অক্টোবর চন্দ্রপুর পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita) ১৬৮ ধারা অনুযায়ী সিজেপি-র এক সমর্থককে একটি নোটিশ পাঠায়। ওই নোটিশে বলা হয়েছিল, নির্দিষ্ট ওই ব্যক্তির দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bengaluru Protest Against SIR: এসআইআর-এর বিরুদ্ধে বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে পথে নামলেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করলেন প্রকাশ রাজ, ধ্রুব রাঠী-সহ প্রতিবাদীরা। ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’-এ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ উঠল?
সিজেপি সদস্যদের আরও অভিযোগ, মুম্বই ও নাগপুরের বেশ কিছু সমর্থকের বাড়িতে পুলিশ গিয়েছিল এবং তাদের ফোনেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। এমনকী কিছু সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীকে এই মর্মে মুচলেকা বা আন্ডারটেকিং (undertaking) দিতে বাধ্য করা হয়েছিল যে, তারা বিক্ষোভে অংশ নেবেন না।
মহারাষ্ট্রের পুলিশ মহাপরিচালকের (DGP) কার্যালয় অবশ্য স্বীকার করেছে যে কিছু ক্ষেত্রে নোটিশ জারি করা হয়েছে, তবে রাজ্যে কাউকে আটক করার কথা তারা অস্বীকার করেছে। এই পার্থক্যগুলি বোঝা খুবই জরুরি: একটি প্রতিরোধমূলক নোটিশ জারি করা, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং কাউকে আটক করা—এই তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাই এদেরকে এক করে বা সমার্থক হিসেবে দেখা উচিত নয়। (রয়টার্স)
মধ্যপ্রদেশ: যাতায়াতের পথেই বিক্ষোভকারীদের আটকে দেওয়া
মধ্যপ্রদেশের ক্ষেত্রে জানা গিয়েছে যে, পুলিশের এই তৎপরতা রেলওয়ে স্টেশনগুলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর গত ৯ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির দিকে যাত্রারত কমপক্ষে ৩০ জন ব্যক্তিকে ভোপাল, ইতারসি এবং গোয়ালিয়র থেকে আটক করা হয়েছে—এমন তথ্য এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
এর মধ্যে ইতারসিতে, পুনে থেকে ছেড়ে আসা গোয়া এক্সপ্রেস ট্রেনে ভ্রমণকারী ২১ জন যাত্রীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের কাছে এমন তথ্য ছিল যে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাওয়া তরুণদের একটি বড়ো দল জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে। এরপর ওই দলটিকে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পুনেতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই সংখ্যাগুলি একসঙ্গে যোগ করা উচিত নয়: ইতারসিতে আটক ২১ জনের এই দলটিই বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা অন্তত ৩০ জনের বৃহত্তর রিপোর্টেড মোট সংখ্যার অন্তর্ভুক্ত। (দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, রাজধানীতে পৌঁছনোর আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কীভাবে কোনো বিক্ষোভকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি আটকের আইনি ভিত্তি এবং যাত্রাপথে আটকে পড়া মানুষদের সুরক্ষার অধিকার নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে।
পশ্চিমবঙ্গ: সেখ আব্দুল হাফিজের ঘটনা
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলির একটি এসেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে।
‘অল্ট নিউজ’ (Alt News)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপি-র পশ্চিমবঙ্গ শাখা অভিযোগ করেছে, গত ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটার দিকে নিউ টাউনের একটি হোটেল থেকে শেখ আব্দুল হাফিজসহ পাঁচজন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুসারে, ওই আন্দোলনকারীদের রাত সাড়ে নয়টার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
হাফিজ পরবর্তীতে একটি ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেন, পুলিশ কর্মীরা তাঁদের চড় মেরেছেন এবং জোর করে একটি লিখিত মুচলেকায় স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন; যেখানে লেখানো হয়েছিল যে তাঁদের সঙ্গে কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার করা হয়নি। প্রতিবেদনে এও জানানো হয়েছে যে, বিধাননগর উত্তর থানার ইনস্পেক্টর-ইন-চার্জ নিশ্চিত করেছেন যে এই আটক ও জেরা করার প্রক্রিয়ায় এসিপি (ACP) এবং ডিসিপি (DCP) পদমর্যাদার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও যুক্ত ছিলেন।
শারীরিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক মুচলেকা নেওয়ার এই অভিযোগগুলিকে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া স্বাধীনভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না; তবে আটকের যে সময়কালের কথা বলা হচ্ছে এবং আন্দোলনকারীদের যে বিবরণ পাওয়া গিয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা বা পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। (রয়টার্স)
এই ঘটনাটি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: কোনো বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতির সময় যখন আন্দোলনকারীদের আটক করা হয়, তখন আসলে কোন আইনি ভিত্তি ব্যবহার করা হয়?
গুজরাট এবং রাজস্থান: বাড়িতে বসে চাপের মুখে পড়ার অভিযোগ
গুজরাটে, ‘নিউজলন্ড্রি’ (Newslaundry)-র প্রতিবেদনে আমেদাবাদের বেশ কিছু শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীর বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভের আগে তাদের কাছে পুলিশের ফোন এসেছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে অথবা মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে লোকজনকে আটক ও গৃহবন্দি করে রাখার অভিযোগগুলির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলি সবই একপাক্ষিক বা অন্যের মুখে শোনা দাবি হিসেবেই রয়ে গিয়েছে; তাই যোগাযোগ করা প্রতিটি মানুষকে আনুষ্ঠানিকভাবে আটক করা হয়েছিল বা আইনগতভাবে গৃহবন্দি করা হয়েছিল—এমন নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে সেগুলিকে গণ্য করা উচিত নয়। (রয়টার্স)
রাজস্থানে, সিজেপি অভিযোগ করেছে যে গত ৮ অক্টোবর আলওয়ার থেকে দলের জাতীয় মুখপাত্র এবং সংগঠন সহ-তত্ত্বাবধায়ক দীপক বালিয়ানকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে। দলটি এও অভিযোগ করেছে যে তাকে মারধর করা হয়েছে।
তবে উপলব্ধ প্রতিবেদনগুলি থেকে এই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং কথিত আটকের আইনি অবস্থা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই এই অভিযোগগুলিকে নিশ্চিত বা প্রমাণিত সত্য হিসেবে না দেখে, সিজেপি-র নিজস্ব দাবি হিসেবেই গণ্য করা উচিত। (রয়টার্স)
সব মিলিয়ে এই ঘটনাগুলি ইঙ্গিত দেয়, দিল্লির সীমানা পেরিয়েও প্রতিরোধমূলক বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় না যে প্রতিটি রাজ্যই কোনো একটিমাত্র কেন্দ্রীয় নির্দেশের অধীনে কাজ করেছে।
এই দমনপীড়ন বা কড়াকড়ি আমাদের কী বলে?
দিল্লির প্রশাসনিক প্রস্তুতিগুলির পরিধি একেবারেই স্পষ্ট: মেট্রো চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, ট্রেন পরিষেবা বাতিল, মদের দোকান বন্ধ রাখা, ৩৭টি জায়গায় ব্যারিকেড বা তল্লাশি পয়েন্ট, ১৫টি পুলিশ জেলাতেই আটক কেন্দ্র এবং পুলিশকে সহায়তার জন্য হাজার হাজার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ।
পাশাপাশি মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট এবং রাজস্থান থেকে আসা প্রতিবেদনে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের নোটিশ পাঠানো, জিজ্ঞাসাবাদ করা, আটক করা কিংবা তাদের উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করার মতো আরও বহু ঘটনার কথা জানা গিয়েছে।
সরকার ও পুলিশ অবশ্য জনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে সিজেপি-র অভিযোগ, এই সমস্ত কঠোর পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে বিক্ষোভে পৌঁছতে বাধা দেওয়া। দেশজুড়ে লোকজনকে আটকের যে ব্যাপক দাবি দলটি করেছে তা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, যদিও পৃথক প্রতিবেদনগুলিতে সুনির্দিষ্ট কিছু আটকের ঘটনার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
তবে আসল প্রশ্নটি এটি নয় যে কর্তৃপক্ষ প্রতিরোধমূলক বা নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে কি না; তারা অবশ্যই তা পারে। মূল প্রশ্নটি হলো—এই ব্যবস্থাগুলি কি আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ? আর সেগুলি কি এমন কোনো পার্থক্য করতে পেরেছে—যাঁরা প্রকৃত অর্থে হুমকি সৃষ্টি করছেন এবং যাঁরা কেবল একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিতে চান?
একটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকা মানেই সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি। একটি ট্রেন বাতিল হওয়া মানে যাত্রীদের যাতায়াতে মারাত্মক ব্যাঘাত। একটি পুলিশি নোটিশ কাউকে ভ্রমণের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করতে পারে। আর একটি আটক বা গ্রেপ্তারের ঘটনা কোনো সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনো থেকে বিরত রাখতে পারে।
এর মধ্যে এককভাবে কোনো একটি ব্যবস্থাই শান্তিপূর্ণ মতবিরোধ বা প্রতিবাদ দমনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না। তবে, এই সমস্ত ব্যবস্থার সামগ্রিক প্রভাব বা পরিণতি যে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আগামী ১০ অক্টোবরের প্রাক্কালে, মূল প্রশ্নটি কেবল এটি নয় যে কর্তৃপক্ষ যন্তর মন্তরে জনস্রোত বা ভিড় কীভাবে সামাল দেবে। আসল প্রশ্নটি হলো—সেই জমায়েত বা ভিড় এক হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পুলিশি তৎপরতা বা কড়াকড়ি শেষ পর্যন্ত কত দূর পর্যন্ত গড়ায়।





