
কমিউনিস্ট পার্টি সঙ্গে বুর্জোয়া দলগুলোর নেতৃত্বের প্রশ্নের প্রধান ফারাক হল , ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার পথে কমিউনিস্ট পার্টি চলে না। ব্যক্তির ইচ্ছে অনিচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে কখনো কোনো নীতিনির্ধারণের প্রশ্নে প্রধান নির্ণায়ক ব্যাপার হতে পারে না। সব সময় সম্মিলিত সিদ্ধান্ত কমিউনিস্ট পার্টির নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় । এমনটা কিন্তু বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রে হয় না। বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে, দলের শীর্ষ যিনি থাকেন,তার ইচ্ছে অনিচ্ছে উপরেই নীতিনির্ধারণের প্রশ্নটি থেকে যায়। তবে রাজনীতি কোনো স্থবির, জঙ্গম বিষয় নয়। স্বাধীনতার সময় কালে রাজনীতির যে ধারাপ্রবাহ ছিল, বা ছয়ের দশকের গোড়ার দিকে কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে মতাদর্শগত সংগ্রামের সময় কালে যে ধারাবাহিকতা ছিল কিংবা কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধা বিভক্ত হওয়ার পরেও যে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা গুলি সামনে উঠে এসেছিল, আজকের এই একুশ শতকের মধ্যভাগে এসে, সমস্ত ভাবনা-চিন্তার মূল জায়গাটা জুড়ে তেমনটাই থাকবে, তা ভাববার কোন কারণ নেই।
একটা সময় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজনের পর, সি পি আই(এমে) র সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির পর্যায়ক্রমে ,সংসদীয় রাজনীতি এবং দলীয় রাজনীতির নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে জ্যোতি বাবু এবং প্রমোদবাবু। দলীয় পরিমণ্ডলে ভিতরে এবং সংসদীয় রাজনীতির অভ্যন্তরে প্রমোদবাবু আর জ্যোতিবাবুর যে নেতৃত্ব ,তা রাজনৈতিক দল হিসেবে সি পি আই(এমে)র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। কেবলমাত্র তাত্ত্বিক রাজনীতির উপর নির্ভর করে আমজনতার মধ্যে রুটি-রুজির সংগ্রামকে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না, এই বোধ থেকে সি পি আই(এমে)র তৎকালীন নেতৃত্ব যেভাবে ভূমি স্তরে তাদের রাজনৈতিক বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে তৎপর ছিলেন, তেমনি ই লোকসভা, বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে ,সংসদীয় পথে রাজনৈতিক চিন্তা চেতনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রশ্নেও ছিলেন আপোষহীন।
সেই পরিস্থিতির সুফল কিন্তু পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালে বামপন্থীদের ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসতে পেরেছিল। ছয়ের দশকে প্রফুল্ল চন্দ্র সেন কে হারিয়ে যখন অজয় মুখোপাধ্যায় নেতৃত্বে প্রথম অ কংগ্রেস মন্ত্রিসভা তৈরি হয়, সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়কাল থেকেই ধীরে ধীরে সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতি, কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিসরকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে ।সেটাই পরবর্তীকালে ,একটা দীর্ঘ সময় ধরে, পশ্চিমবঙ্গের কেবল রাজনীতি নয়, সামাজিক ,অর্থনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতি কে কিভাবে কণ্টকাকীর্ণ করে ফেলেছিল, আজকের প্রজন্ম সঠিকভাবে হয়তো অনুধাবন করতে পারে না।
সংকীর্ণতাবাদী রাজনীতির ধারা উপধারা গুলিকে গৌরবান্বিত করবার যে একটি চলতি পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের সামাজিক ক্ষেত্রগুলিতে জোরদার হয়ে উঠছে, তার প্রেক্ষিতে কোন জায়গায় বাম রাজনীতির প্রকৃত সংকট দেখা দিয়েছিল ,বিশেষ করে নেতৃত্বে প্রশ্ন যে বজ্র কঠিন একটা পর্যায়ে তখন ছিল, সেই পর্যায়ে থেকে পরবর্তীকালে বামপন্থীদের শাসন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তা কতখানি ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিল, এসব সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা প্রকৃতপক্ষে বামপন্থীদের মধ্যে থেকে দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে উঠে আসে না।
ছয়, সাতের দশকের যে রাজনৈতিক সংকট এবং সেই সংকট কিভাবে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষিত কে আকীর্ণ করেছিল, তা ঘিরে একটা গভীর মননশীল বোধশক্তি তৈরির ক্ষেত্রেও নতুন প্রজন্মের কাছে তথ্য ,কোন কিছুই সে ভাবে উপস্থাপিত করা হয় না। এর ফলেই দীর্ঘদিন বামপন্থীরা এরাজ্যে ক্ষমতায় থাকার পর, যখন তারা ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ভেতর দিয়ে ,তখন একাংশের বামপন্থীদের কাছে এক একমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যে কোন উপায়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসা।
বামপন্থীদের কাজ যে কেবলমাত্র শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে একটা দৈনন্দিনতার পর্যায়ে সংসদীয় গণতন্ত্রকে নিয়ে যাওয়া, তা নয় ,সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে,বামপন্থীদের যে একটা সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা আছে ,সে সম্পর্কে মানুষের মনের সুস্থ সঠিক বোধ নির্মাণের ক্ষেত্রটি ঠিকভাবে রচিত হয় না। ঘরে-বাইরে ক্ষমতা দখলের ছবিটা কি এখন কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে একমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়ে উঠে আসছে? সেই কারণে ই পথে নেমে আন্দোলন ,এই জায়গাটা বামপন্থীরা ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক যুগ পরে অনেকটাই ফিকে হয়ে উঠেছে।
কোভিড পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ভার্চুয়াল লড়াইয়ের বিষয়টাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে যে, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এক দিকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে যে নানা গণআন্দোলন গড়ে তুলে মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নটিকে সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন, যার ফলে সেদিনের শাসকের কুর্সি কেঁপে উঠেছিল, সেই বোধটা এখন ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সামনে থেকে চলে যেতে বসেছে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের প্রশ্নটি ধীরে যেমন সংবাদমাধ্যম, তেমন সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ ক্রমশ তীব্র হতে শুরু করেছে।
কমিউনিস্ট পার্টিতে ব্যক্তি নেতৃত্ব মুখ্য নয় ।কমিউনিস্ট পার্টিতে চিরদিনই সম্মিলিত নেতৃত্বে বিষয়টিকেই সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আজকে সংসদীয় রাজনীতির প্রশ্নে যে জায়গায় কমিউনিস্ট পার্টি দাঁড়িয়ে আছে, সেই জায়গায় থেকে নিজেদের উত্তোরিত করবার ক্ষেত্রে নেতৃত্তের মুখের প্রশ্নটাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠে আসছে।
অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজনের পর, প্রমোদ দাশগুপ্ত যে ভাবে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, শ্রেণী সহযোগিতা বাদী অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিকে এক গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে বের করে এনে,দলকে কেবলমাত্র শ্রেণীসংগ্রামের পথেই প্রতিষ্ঠা করা নয়, সাধারণ মানুষের রুটি রুজির প্রশ্নের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ভাবধারাকে একাত্ম করা, যেটা গোটা বিশ্বেই কমিউনিস্টদের কাজের সর্ববৃহৎ পরিসর ,সেই পরিসরের সঙ্গে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদীর একাত্ম করার যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব মুজাফফর আহমেদ, প্রমোদ দাশগুপ্ত, সুধাংশু দাশগুপ্ত ,সুমর মুখোপাধ্যায়, বিনয় কৃষ্ণ চৌধুরী ,সৈয়দ মনসুর হাবীব উল্লাহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ শুরু করেছিলেন,পরবর্তীকালে সেই ধারার সঙ্গে যুক্ত হন জ্যোতি বসু।এই প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব দানের প্রশ্নে প্রমোদ দাশগুপ্ত যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই দুক্ষতারই ফলশ্রুতি কিন্তু দীর্ঘদিন একটানা বামপন্থীদের এ রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা।
বামপন্থী রাজনীতির বহু উপাদান থাকা সত্ত্বেও প্রমোদ দাশগুপ্তর মত যোগ্য নেতৃত্ব ছিল না বলেই ভারতের আর কোথাও সেভাবে কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের সেভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি ।তুলে ধরতে সক্ষম হয়নি। নেতৃত্তের প্রশ্নে একাধারে বজ্রকঠিন ভূমিকা, অন্যদিকে একটা বিরাট পিতৃহৃদয় নিয়ে কাজ করা, এই যে দৃষ্টান্তটি প্রমোদ দাশগুপ্ত প্রতিস্থাপিত করতে পেরেছিলেন, পরবর্তীকালে সি পি আই(এমে) র নেতৃত্বের প্রশ্নে ,তার বিকল্প গড়ে উঠতে পেরেছে কিনা ,তা ঘিরে বহু বিতর্ক রয়েছে। তবে প্রমোদ দাশগুপ্তর জীবন অবসানের পর থেকে যাঁরাই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এসেছেন ,তাদের কাছে সবথেকে বড় সুবিধা ছিল এই যে, দল তখন ক্ষমতায় আছে। ফলে দলের সম্পাদকের দায়িত্বে কে আসছেন না আসছেন- তা নিয়ে কিন্তু সার্বিকভাবে দল পরিচালনার ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।
তাই একটা সময়ে সি পি আই(এমে)র অত্যন্ত সফল, দক্ষ অফিস সম্পাদক শৈলেন দাসগুপ্তের মতো ব্যক্তিত্ব কে দলের রাজ্য সম্পাদক করেও ভোটের রাজনীতির ক্ষেত্রে সি পি আই(এম )তাদের সাফল্যের ধারা অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছিল ।এটা তারা করতে পেরেছিল জ্যোতিবাবুর মত সংসদীয় রাজনীতিতে সফল ব্যক্তিত্বের অসামান্য ক্যারিশমার জোরে। আজ কিন্তু সি পি আই(এম )যখন ক্ষমতায় নেই ,তখন দল পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো নেতার পরিবর্তে এমন কোন ব্যক্তিত্বকে তাঁরা দলের শীর্ষে নিয়ে আসেন, যার দলের পরিকাঠামোর বাইরে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, তাহলে রাজনীতির ময়দানে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের কাজে সি পি আই(এম) কখনোই সফল হতে পারবে না।
দলের নেতৃত্বে আজকে এমন ব্যক্তিত্বকেই সি পি আই(এম)কে তুলে ধরতে হবে যাঁর দলীয় পরিকাঠামোর বাইরে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভেতরেও একটা সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা আছে ।বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে টক্কর দেয়ার মতো রাজনৈতিক কারিশমা আছে ।এমন কোন ব্যক্তিত্বকে যদি তুলে ধরা হয় ,সেক্ষেত্রে কিন্তু শত্রু শিবিরের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার যে জায়গাটা তৈরি করা চেষ্টা সি পি আই(এম) করে যাচ্ছে, সেই চেষ্টায় তারা অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবে। সাংগঠনিকভাবে শুধু দল পরিচালনা করে যাওয়া ব্যক্তিত্বকে দলের শীর্ষ নিয়ে এসে, দলের পরিকাঠামোর বাইরে দলের গ্রহণযোগ্যতা ,মতাদর্শের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, তার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে যুদ্ধ করবর, লড়াই করবার যে সার্বিক পরিস্থিতি, তা কিন্তু একাধারে সংগঠনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য এবং সংগঠনের বাইরে ও জনপ্রিয় আর গ্রহণযোগ্য নেতা ছাড়া সম্ভবপর নয়।
একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি, দীর্ঘ সময় ধরে কমিউনিস্ট পার্টির ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে দেশের তথা বাংলার সংখ্যালঘু সমাজের ভেতরে কমিউনিস্ট পার্টির যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল, প্রশাসনে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে নানান চাপানউতোরের ফলে সেই গ্রহণযোগ্যতা জায়গাটি কিন্তু আজকে আর অটুট, অক্ষয় নেই।বামফ্রন্ট সরকারের নিরপেক্ষ প্রশাসনিক অবস্থানের জন্য পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিন বড় আকারের কোন দাঙ্গা হয়নি। সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের নিরাপত্তা অনেকটাই বেশি গোটা দেশের মধ্যে এই রাজ্যে সেই সময় সুনিশ্চিত ছিল ।এটাকে সাফল্যের চাবিকাঠি করে দীর্ঘদিন মুসলমান সম্প্রদায়ের সমর্থন বামফ্রন্টের প্রতি, কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অটুট ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক প্রশ্নে মুসলমান সমাজের দুরবস্থার জায়গাটা মুসলমান সমাজে উপলব্ধি করতে শুরু করে। স্বল্পকালীন মন্ত্রিত্বের সময়কালে মহঃ সেলিম, মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আধুনিক শিক্ষা, মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় পরিমণ্ডলকে অস্বীকার না করে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের দিক থেকে মুসলমান সমাজকে বের করে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা এবং অবস্থান নিতে শুরু করেছিলেন ,সেই ধারাবাহিকতাটা যদি পরবর্তীকালে বামফ্রন্ট সরকার অক্ষুন্ন রাখত, তাহলে হয়তো সাচার কমিটির কাছ থেকে ওই রকম বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় বামপন্থীদের খেতে হতো না।
সংখ্যালঘুদের হারিয়ে যাওয়া সমর্থন পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে বামপন্থীদের আন্তরিক পদক্ষেপ কিন্তু এখন তাদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে ,পশ্চিমবঙ্গে সি পি আই(এমে)র নেতৃত্ব থেকে সাধারণ সমর্থক,একটা বড় অংশ পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল হিন্দু হওয়ার দরুন কমিউনিষ্ট হয়েও সেই অংশের নেতা,কর্মী, সমর্থকেরা মনের কোণে গহিন কোনায় মুসলমান সমাজ সম্পর্কে একটা নেতিবাচক অবস্থান কিন্তু চিরদিন পোষণ করে গিয়েছেন ।
সেই কারণেই সমস্ত রকমের রাজনৈতিক যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নে, মুসলমান সম্প্রদায়ের ভেতরের মানুষদের যে পরিমাণে অংশ নেওয়ার কথা, সেই পরিমাণে তাদের আমরা দেখতে পাই না ।বহু ক্ষেত্রে তাঁদের দলের গণ্যমান্য নেতাদের প্রকাশ্যে আমরা মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কে অত্যন্ত অসম্মানজনক, অমর্যাদাকর কথাবার্তা বলতে আমরা বারবার শুনতে পাই। আর যখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দীর্ঘ এক দশক পর ধীরে ধীরে বামপন্থীরা তাদের ভোট রাজনীতির নিরিখে খানিকটা ভালো জায়গার দিকে এগোতে শুরু করেছে,তখন কিন্তু বামপন্থীদের অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার কি ধরনের পদক্ষেপ নিলে তারা সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের আস্থা-র যে জায়গাটা তাদের ওপর থেকে চলে গিয়েছিল, সেটা ফিরে আসতে শুরু করবে, তা নিয়ে ভাবা।
বিগত বিধানসভা নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বামপন্থীরা ইন্ডিয়ান সেকুলারিস্ম ফ্রন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়া করে। ভোট রাজনীতি তে তাঁরা এক সঙ্গে লড়াই করে। গত বিধানসভা ভোটে বামপন্থীরা একটি আসন জিততে না পারলেও, আইএসএস কিন্তু একটি আসন যেতে সক্ষম হয় ।সেই ভোটে কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীরা একযোগেই নির্বাচনী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিল। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো যে, ভোট রাজনীতিতে যেহেতু আই এস এফ সাফল্য এনে দিতে পারেনি, সেই কারণেই ভোটের পর থেকে আই এস এফ এর সঙ্গে এই রাজনৈতিক বোঝাপড়া ঘিরে কমিউনিস্ট পার্টির একটা বড় অংশের ভেতরে অত্যন্ত কদর্য সম্প্রদায়িক সমালোচনা হতে শুরু করে। গোটা ব্যাপারটি জন্য এমন একজন নেতৃত্ব কে দায়ী করা হয়, যিনি জন্মসূত্রে মুসলমান। যারা এইসব সমালোচনা গুলি সামনে আনেন, তারাই কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের ভোট রাজনীতিগত জোটের সমর্থক। বিগত ২০১৬ সালে র বিধানসভা নির্বাচনের সময় এঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে জোরদার সাওয়াল করেছিলেন। সেই ভাবেই তারা সেই নির্বাচনটিকে পরিচালিত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা ঘিরে কিন্তু কোনো দায় তারা নিতে অস্বীকার করেছেন।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কংগ্রেস দলের সঙ্গে বামপন্থীদের কোনোরকম নির্বাচনী বোঝাপড়া গড়ে ওঠেনি। এই নির্বাচনী বোঝাপড়া গড়ে না ওঠার পেছনে কংগ্রেস দলের ভূমিকাকে ঘিরে বামপন্থীদের মধ্যে বোঝাপড়ার সমর্থকগোষ্ঠী কিন্তু একটি শব্দ কখনো কোনো রকম ভাবে উচ্চারণ করেনি। এই অংশটি কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারের ক্ষেত্রে আব্বাস সিদ্দিকী, নওশাদ সিদ্দিকী প্রমুখ নেতৃবৃন্দকে ঘিরে যে মানুষের ঢল, তাতে নিজের নিজের নির্বাচন কেন্দ্রগুলোতে এইসব নেতৃত্বকে দিয়ে প্রচার করার ব্যাপারে সব থেকে বেশি উৎসুক ছিলেন।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই যে, কংগ্রেসের সঙ্গে একসাথে লড়াই করবার যে নেতিবাচক ফল, তা ঘিরে কিন্তু এই সমস্ত ব্যক্তিত্বরা একটিবারও একটা শব্দ উচ্চারণ করছেন না। কিন্তু তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হয়ে উঠছে আইএসএফ ।তাদের আক্রমণের লক্ষ্যস্থল হয়ে উঠছে বামপন্থীদের ভেতরেরই একজন নেতা, যাকে তারা আইএসএফ -এর সঙ্গে বোঝাপড়ার মূল কান্ডারী হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় । অথচ এইসব নেতৃত্ব খুব ভালো ভাবেই জানেন যে ,কমিউনিস্ট পার্টিতে কখনো বুর্জোয়া দলগুলোর মত একক সিদ্ধান্তে বড় কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না।
তাই কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী সংগ্রামে একসাথে লড়বার প্রস্তুতিও যেমন কমিউনিস্ট পার্টির কোন একক সিদ্ধান্ত নয় তেমনি, আই এস এফের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়া করার বিষয়টিও কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিতে কোন একক সিদ্ধান্ত কখনোই ছিল না। অথচ কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া তত্ত্বকে যারা সামনে তুলে এনে, যেকোনো উপায়ে ঠিক এই মুহূর্তে ক্ষমতা দখল করতে চায়, তারাই কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার ব্যর্থতা ঘিরে কোনরকম দায় যাতে তাদের উপরে না বর্তায়, ঠিক সেই কারণে আইএসএফ-এর প্রসঙ্গটিকে এইভাবে তুলে ধরেছে। একজন ব্যক্তিবিশেষকে দায়ী করছে ।
গোটা প্রক্রিয়াটির ভেতর দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির একটা অংশের ভেতরেও যে কী ভয়ঙ্কর রকম ভাবে সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনা আর এসএসীয় প্রভাব এবং মুসলমান বিদ্বেষ কাজ করে, সেটাকে সামনে তুলে আনছে। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট পার্টি, তাদের দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রশ্নে কেবলমাত্র ভোট রাজনীতির জায়গাটিকে নজর না দিয়ে, গোটা সামাজিক ব্যবস্থায় যে ভয়ঙ্কর রকমের ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটেছে, তাকে প্রতিহত করার প্রশ্নে, এমন কোনো মানুষকে কি তাদের দলের নেতৃত্বে তুলে আনবেন যিনি কেবলমাত্র সি পি আই(এম) কে ভোটের রাজনীতির প্রশ্নে সাফল্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবেন না? আমাদের গোটা সামাজিক ব্যবস্থায় আরএসএস, বিজেপি প্রভাবে যে ভয়ঙ্কর রকম ভাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটেছে সেখান থেকে সরে এসে আমাদের নতুন পথের সন্ধান দেবে?
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত






