
পুরসভা ভোটের ফলাফল অবশেষে প্রকাশিত হল। যেমনটা প্রত্যাশা ছিল, তেমনই হয়েছে। ফলাফলে তার খুব একটা অদলবদল ঘটেনি। গত বিধানসভা ভোটের মতোই এবারের পুরসভা ভোটে ও বিজেপি যতই আস্ফালন করুক না কেন, চাঁদির চমক দেখাক না কেন, সাংগঠনিক দিক থেকে তাদের প্রাথমিক ভিত্তি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে নেই --এই ভাবনাটাই পুরনির্বাচনের ফলাফলের ভেতর দিয়ে আবার ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হল। সেই সঙ্গে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বামপন্থীরা যে ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হচ্ছে, সেই জায়গাটি উঠে এল।
তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএস গত দশ বছরে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেছে, তার ফলশ্রুতি হিসেবে, গোটা পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক পরিবেশে আমরা যে ধরনের মেরুকরণ খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, তার নিরিখে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির সংসদীয় রাজনীতিতে সাফল্য কিন্তু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন, কোন উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির মতোই পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি আরএসএস করে চলেছে? ভারতের যেসব রাজ্যগুলি তে তারা এই মেরুকরণের রাজনীতি চালায়, সেই সব রাজ্য গুলোতেই তাদের মূল লক্ষ্য, হচ্ছে ক্ষমতা দখল। সামাজিকভাবে যেমন তারা ক্ষমতা দখল করতে চায়, ঠিক তেমনিভাবে সংসদীয় রাজনীতিতে ক্ষমতা দখলই হিন্দু সম্প্রদায়িকর শিবিরের মূল লক্ষ্য।
সে ক্ষেত্রে আমাদের ভাবতে হবে, বিশেষ কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের খেলা কি আরএসএস পশ্চিমবঙ্গের বুকে খেলে যাচ্ছে? নাকি তাদের মূল উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার লক্ষ্যে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের হয়ে কাজ করে চলেছে? পুরনির্বাচন প্রক্রিয়া ঘিরে বামপন্থী শিবিরের অভিযোগের অন্ত ছিল না। ভোট প্রক্রিয়া কিভাবে হয়েছে না হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ, তা তিনি যে রাজনৈতিক দলের প্রতি দুর্বল হন না কেন, সরাসরি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভেতর দিয়ে সেই নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছেন। তা সত্ত্বেও বামপন্থীদের তাহেরপুর পৌরসভার ধরে রাখা এবং গোটা পশ্চিমবঙ্গে জুড়ে প্রায় ৬০ টিরও বেশি আসনে বিভিন্ন পৌরসভায় জয়ী হওয়া, নিঃসন্দেহে এই রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির ব্যাটন কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নে একটা বড় ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুর-নির্বাচন ঘোষিত হওয়ার সময়-কাল থেকে নির্বাচনী প্রচার ঘিরে গোটা রাজ্যের একটা বড়ো অংশে বামপন্থীরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। আবার কোন কোন জায়গায়, যেমন, ভাটপাড়া পৌরসভা বামপন্থীদের প্রায় দেখাই মেলেনি ।কিন্তু যে অংশে প্রচার পর্বে বামপন্থীরা অত্যন্ত সক্রিয় ছিল, সেই অংশে নির্বাচনের দিন সেই সক্রিয়তা কি বামপন্থীদের ভিতরে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল?
প্রশ্নটা তৃণমূল কংগ্রেস, সি পি আই(এম ), বিজেপি নয় ।বিষয়টা হলো শাসকের চরিত্র ।স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা দেখেছি, যে কোনো নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে শাসক। কংগ্রেস যখন রাজ্যে ক্ষমতাসীন ছিল, সেই বৈশিষ্ট্য কংগ্রেসের মধ্যে ছিল। বামপন্থীরা যখন ক্ষমতাসীন ছিল, সেই বৈশিষ্ট্য নিয়েই বামপন্থীরা নির্বাচনী সংগ্রামে যেতো। আবার আজ তৃণমূল যখন ক্ষমতায় রয়েছে, সেই বৈশিষ্ট্যের খুব একটা অদল-বদল তারা করেছে ,এই দাবি কখনো করতে পারা যায় না।
বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকাকালীন নির্বাচনের দিন সব সময় ভোটারদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ ঘটেছে, এ দাবি যেমন করতে পারা যায় না, তেমনই , আজও তৃণমূল জামানায় ,সাধারণ ভোটারদের ভাবনা খুব স্বাধীনভাবে সবক্ষেত্রে প্রকাশিত হচ্ছে ,এই দাবি করতে পারা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এককালে বামপন্থীদের শাসনের আমলে, বিরোধীরা যতই নির্বাচনী প্রচার করুক না কেন ,বুথের ভেতরে শাসকের দৌরাত্ম্যের মোকাবিলা করতে বিরোধীরা পারে না। আজও কিন্তু সেই একই অবস্থা র অদল বদল খুব একটা ঘটেছে ,তেমনটা দাবি করতে পারা যায় না। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনে ,পৌরসভা -পঞ্চায়েতের নির্বাচন, যেখানে রাজ্য নিয়ন্ত্রিত পুলিশেরই একমাত্র ভূমিকা থাকে, কোনোরকম কেন্দ্রীয়বাহিনী থাকে না, সেখানে শাসকের একটা বড় ভূমিকা কখনো অস্বীকার করতে পারা যায় না।
তাই এখানে প্রশ্ন তুলতেই হয়, ভোটের দিন ,ভোট কেন্দ্রের ভিতর, বিরোধী দল হিসেবে ১৯৭৭ পূর্ববর্তী সময়ে বামপন্থীদের যে ভূমিকা দেখতে পাওয়া যেত সেই ভূমিকা কি এখন দেখতে পাওয়া যায়? সেদিন বিরোধী হিসেবে বামপন্থীদের যে সক্রিয়তা আর আজ বিরোধী হিসেবে বামেদের যে নিস্ক্রিয় ভূমিকা-- এটা মনে রেখেই আমাদের পুরো বিষয়টা ভাবতে হবে।
বিরোধীরা যদি সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শক্ত বুনিয়াদের উপর স্থাপন করতে না পারেন ,তাহলে তার দায় কখনো শাসকের উপরে বর্তায় না ।শাসকের চরিত্র চিরদিনই এক। অতীতেও যে দলই শাসকের ভূমিকায় থাকুন না কেন, মানুষের রায় কে নিজের দিকে ছলে বলে কৌশলে একত্রিত করবার কাজ তারা অনেক ক্ষেত্রেই করেছেন। আজ শাসক হিসেবে অন্য রাজনৈতিক দলকে দেখছি বলেই ,শাসকের সেই অতীত চরিত্রটি বদলে যাবে, এমনটা ভাববার কোন কারণ নেই। অতীতে যেমন অনেক ক্ষেত্রেই শাসক যে কোন উপায়ে ,মানুষের রায়কে নিজেদের দিকে পরিচালিত করবার চেষ্টা করেছে, আজও তেমনটাই শাসক করে। আগে যখন কেন্দ্রীয় বাহিনী র রেওয়াজ ছিল না ,তার ও আগে ভোটার কার্ড ছিল না, তখনো অনেক ক্ষেত্রেই শাসকদলের এই ভোটার নিয়ন্ত্রণের প্রবণতাটা সেই সময়ের তুলনায় একটু বেশিই সক্রিয় ছিল।
আজ যখন ভোটার কার্ড, কেন্দ্রীয় বাহিনী ইত্যাদি ব্যাপারগুলি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, তখন শাসকের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার জন্য কৌশলের অদল-বদল ঘটেছে। শাসকের এই কৌশলের অদল বদল কে সামনে রেখে বিরোধীদের যে সাংগঠনিক দুর্বলতা, তাকে ঢেকে দেওয়া যায় না ।বিরোধীরা নিজেদের সংগঠিত করতে পারছে না , বিশেষ করে, নির্বাচনী সংগ্রামের ক্ষেত্রে, ভোটকেন্দ্রে যেভাবে এজেন্ট দিয়ে, ভোটার স্লিপ তার আগে সরবরাহ করে, সাধারণ ভোটার, যারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক শিবিরের অন্তর্গত নন, তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহস সঞ্চয় করিয়ে , ভোট কেন্দ্র নিয়ে আসার জন্য মোটিভেটেড করা- এই সমস্ত কাজ গুলি কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই বিরোধীরা করেন না ।
এই প্রবণতা যে কেবল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়। সর্বভারতীয় স্তরের যে পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা ভোট প্রক্রিয়া চলছে, সেখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাধারণ নাগরিকদের ভোট দানের হার অত্যন্ত কম ।বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের যারা ভোটার ,তারা ভোটের দিন ভোট কেন্দ্রমুখী না হয়ে, সেটা একটা বড় ছুটির দিন হিসেবে দেখে, আউটিংয়ে চলে যাচ্ছে। এমন দৃশ্য কিন্তু সংবাদমাধ্যমে আমরা অল্প কিছু দিনের ভেতরেই বারবার দেখছি। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সোচ্চার মানুষ কে দেখা যাচ্ছে ভোট কেন্দ্রমুখী না হতে। হলেও তারা প্রকাশ্যেই বলছেন নোটায় ভোট দিয়ে এসেছি।
এই প্রেক্ষিতগুলি কিন্তু সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ ভাবে মনে রাখা দরকার। বামপন্থীদের সভা-সমিতির হচ্ছে। মিছিল হচ্ছে ।ফেসবুক-টুইটারে তাদের দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ।অথচ ভোটবাক্সে আদৌ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না ।এই যে প্রবণতা আমরা বেশ কিছুদিন ধরে দেখছিলাম ,সেই প্রবনতার ক্ষেত্রে একটা ব্যতিক্রম পgরসভা ভোটের ফলাফল থেকে উঠে আসছে অনেকেই হয়তো উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন সংসদীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বিজেপির আধিপত্য খর্ব হচ্ছে। বামপন্থীদের প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনা ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছে ।এই দিক থেকে এই প্রবণতা যদি তাই ই হয় ,তবে সত্যিই গণতন্ত্রের পক্ষে সেটা একটা অত্যন্ত স্বাস্থ্যের লক্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত হবে।
যদিও এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে, গোটা পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের যে মেরুকরণের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আর্থ- সামাজিক স্তরের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, সেই প্রবণতাকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে, পৌরসভা ভোটে প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে আসার ক্ষেত্রে, বামপন্থীদের সম্পর্কে যে আভাস স্পষ্ট হচ্ছে, তা স্থায়ী হলে, এই সামাজিক মেরুকরণের প্রক্রিয়া কতখানি প্রতিহত করা সম্ভপর হবে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিকে প্রতিহত করার জন্য কেবল মাত্র রাজনৈতিক উদ্যোগ নিলেই চলবে না। তার জন্য দরকার, সামাজিক উদ্যোগ। সংস্কৃতিক উদ্যোগ। সেই উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে বামপন্থীরা আগামী দিনে আদৌ গুরুত্বসহকারে ভাবনা চিন্তা করবেন?
দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থীরা হিন্দু সম্প্রদায়িকদের সামাজিক প্রযুক্তির পাল্টা সামাজিক প্রযুক্তির পরিকাঠামো তৈরির কথা বলছেন। তাত্ত্বিক ভাবে এই কথা বললেও, সেই তত্ত্বের প্রয়োগে তাদের বিশেষ শক্তিশালী ভূমিকা আমরা দেখতে পাই না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ,একটা বড় অংশের মাঠে ময়দানে কাজ করা বামপন্থী মানুষ আছেন ,যারা সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ আলোচিত হলে ই, মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা সত্ত্বেও ,ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের জায়গা থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে রাখতে পারেন না।
একশো বছরেরও বেশি সময় আগে , ১৯০৫ সালে ,বঙ্গভঙ্গের সময় কালে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ঘিরে সেই সময়ে রাজনৈতিক ,সমাজকর্মীদের যে উদ্যোগ, তার ভিতরের ঠুনকো জায়গাটি রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন। স্বদেশি প্রচারে, হিন্দু-মুসলমানের একসাথে কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে, অথচ, হিন্দুর যদি জল পিপাসা পেল ,তাহলে সহযোদ্ধা মুসলমানকে সে অনুরোধ করছে, দাওয়াতে নেমে যাওয়ার জন্য। কারন, সে জল পান করবে।
এই যে স্পষ্ট ভাষায়, 'স্পর্শ বাঁচায়ে পুণ্যের পথে হাঁটা '- এই জায়গা থেকে মানুষকে বের করে আনতে গেলে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি যে সামাজিক কর্মকাণ্ড দরকার ছিল, বিগত শতাব্দীর চার, পাঁচের দশকে বামপন্থীদের মধ্যে যা অত্যন্ত সক্রিয় ছিল ,সেই কর্মকাণ্ড এখন প্রায় নেইই বলা চলে ।
মনে রাখতে হবে যে, প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বামপন্থীদের উঠে আসার ইঙ্গিত পুরভোটের ফল থেকে আমরা পাচ্ছি ,সেই ইঙ্গিতকে ভণ্ডুল করে দেওয়ার জন্য সাম্প্রদায়িক শিবির আগামী দিনে আরও নিবিড় সামাজিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটাবে। এখন দেখার সম্প্রদায়িক শক্তি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, মেরুকরণের নিত্যনতুন যে কৌশলের পথে হাঁটবে, সেই কৌশলকে বানচাল করার জন্য বামপন্থীরা আন্তরিকভাবে কতখানি উদ্যোগ গ্রহণ করে। কেবলমাত্র ফেসবুকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে পোস্টারিং করে, মিছিল করে, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেই সাম্প্রদায়িকতা পরাস্ত হবে না। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষিত হবে না । হিন্দু-মুসলিম উভয় সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করবার তাগিদে ,দুই সম্প্রদায়ের পরস্পর পরস্পরের জানা-বোঝা, চেনার যে বাতাবরণ তৈরি করা দরকার, সেই পথে যদি বামপন্থীরা সমস্ত ধরনের সঙ্কীর্ণতার উর্ধে উঠে, মুক্তমন নিয়ে হাঁটতে পারে, তবেই সম্ভব সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকদের বিকল্প হিসেবে, রাজনীতির ময়দানে ,ভোট রাজনীতির বাইরের দুনিয়াতেও যথার্থ রাজনীতিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।







