বইয়ের স্টলে হামলা, তারপরেও রেকর্ড বিক্রি? কত টাকার বই বিক্রি করল বামেরা?
CPI(M) book sales during Durga Puja: পুজোর মরশুমে সিপিএমের বইয়ের স্টলে হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পরেও এ বছর কলকাতা-সহ রাজ্যের ১২টি জেলায় ৬৬৫টি স্টল থেকে ৯৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বেশি। যাদবপুরের স্টলে বিক্রিও বেড়েছে কয়েক গুণ। এই বিপুল বিক্রির নেপথ্যে কী কারণ?
পুজোর মরশুমে যখন শহর থেকে জেলা—সর্বত্র উৎসবের আমেজ, তখন সিপিএমের বইয়ের স্টল ঘিরে তৈরি হয় অন্য এক ছবি। কোথাও বইয়ের স্টলে হামলার অভিযোগ, কোথাও ভাঙচুর, কোথাও আবার বই বিক্রি বন্ধ করার চেষ্টা। এই ঘটনাগুলি ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও চলেছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও বই বিক্রি থেমে থাকেনি। উল্টে পুজোর শেষে সামনে এসেছে প্রায় ১ কোটি টাকার বই বিক্রির হিসাব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যে বইয়ের স্টল ঘিরে এত বিতর্ক, সেই স্টলেই কীভাবে এত বই বিক্রি হল? সিপিএমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর পুজোর সময় কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ৬৬৫টি স্টল থেকে মোট ৯৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছরের তুলনায়ও বেড়েছে বিক্রির পরিমাণ। প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে কীভাবে এত বই বিক্রি হল?
পুজোর সময় বামেদের বইয়ের স্টল বসানো বহু বছরের পুরনো রীতি। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরার পাশাপাশি বইয়ের স্টলে ঢুঁ মারেন অনেকেই। সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি এবং বিভিন্ন লেখকের বই পাওয়া যায়। কিন্তু এ বার সেই পরিচিত ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংঘাতের ঘটনা। সিপিএমের অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় তাদের বইয়ের বিপণিতে হামলা চালানো হয়েছে। কোথাও স্টল ভাঙচুর করা হয়েছে, কোথাও বই ছুড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বই বিক্রির মতো একটি বিষয় কীভাবে রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে পড়ল, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
গত বছর পুজোর সময় সিপিএমের বই বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮৮ লক্ষ টাকারও বেশি। এ বছর সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। দলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কলকাতা-সহ ১২টি জেলায় মোট ৬৬৫টি স্টল থেকে এই বই বিক্রি হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়া ও হাওড়ার মতো জেলাগুলিতে পুজোর সময় বইয়ের স্টল বসানোর দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে। এ বছরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। রাজনৈতিক বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশিত বইও এই স্টলগুলিতে পাওয়া যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Durga Puja book stall controversy: উৎসবের আবহে বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা কলকাতায়। যাদবপুরে পুরসভার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মানববন্ধন বাম কর্মীদের, ভোররাতে ভাঙা হলো এপিডিআর-এর স্টল।
১৭ অক্টোবর, সপ্তমীর সন্ধ্যায় যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিএমের অস্থায়ী বইয়ের স্টল ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ, স্টলটি সরাতে পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার কর্মীরা সেখানে পৌঁছন। সঙ্গে আনা হয় বুলডোজারও। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সিপিএমের দাবি, স্টল বসানোর জন্য কলকাতা পুলিশ ও পুরসভার অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও স্টল সরানোর চেষ্টা কেন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাম নেতারা। বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা। ঘটনাস্থলে পৌঁছন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী ও রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত-সহ দলের নেতারা। দ্রুত সেই ঘটনার ছবি ও ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। এর আগে ওই দিনই ঢাকুরিয়ার রাজা সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে একটি বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ফলে যাদবপুরের ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়ে।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, তাঁরা বইয়ের বিরুদ্ধে নন। তবে যাঁরা দুর্গাপুজো বা সনাতনী রীতিনীতি মানেন না, তাঁদের পুজোর মণ্ডপের কাছে স্টল করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বামেদের নিজেদের দলের কার্যালয় থেকে বই বিক্রি করার পরামর্শও দেন। তাঁর দাবি, পুলিশ ও পুরসভা কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই কাজ করেছে। অন্যদিকে, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বইয়ের স্টলে ভাঙচুরের ঘটনায় লজ্জা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য, একাধিক জায়গায় এমন ঘটনা ঘটায় বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। বামেদের সঙ্গে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও, তার জন্য বই প্রদর্শন বা বিক্রিতে বাধা দেওয়া সমর্থনযোগ্য নয় বলেও জানান তিনি। সিপিএম সূত্রে জানা গিয়েছে, সেখানে মোট ১৬ লক্ষ ২ হাজার ৪৯৮ টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছর এই স্টল থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ, এ বার বিক্রির অঙ্ক প্রায় চার গুণ হয়েছে। বইয়ের স্টল ভাঙার চেষ্টা এবং তা ঘিরে সংঘাতের ঘটনার পরেও সেখানে পাঠকদের ভিড় দেখা যায়।
কলকাতার অন্য কয়েকটি স্টলেও ভালো বিক্রি হয়েছে। বাগবাজারের বইয়ের স্টল থেকে এ বছর প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে সিপিএম সূত্রে দাবি করা হয়েছে। গত বছর সেখানে বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লক্ষ টাকা। বিজয়গড়ের স্টল থেকে এ বার ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। সাধারণত সেখানে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়। অন্যদিকে, নেতাজি নগর নারকেলবাগানের স্টল থেকে প্রায় ২ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এই হিসাবগুলি দেখাচ্ছে, শুধু যাদবপুর নয়, কলকাতার অন্য কয়েকটি এলাকাতেও এ বছর বই বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Doctor protests by distributing books: ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথোপকথনে নিজের এই উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অশোকবাবু। স্পষ্ট করেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগেই এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।
উত্তরবঙ্গেও বই বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে বলে দাবি করেছে বাম শিবির। উত্তর দিনাজপুরের সাতটি স্টল থেকে ৭৭ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। শিলিগুড়ির মূল স্টল থেকে এ বছর ৬৮ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে, যেখানে গত বছর বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার টাকা। শিলিগুড়ি মহকুমার আরও ১৯টি স্টল থেকেও বিক্রি বেড়েছে বলে স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব জানিয়েছে। তবে ওই স্টলগুলির সব হিসাব তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অন্যদিকে, নদিয়ার শান্তিপুরের ফুলিয়ায় এ বছর ১৮ হাজার ৯৭২ টাকার বই বিক্রি হয়েছে। গত বছর সেখানে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৪৪৭ টাকা। অর্থাৎ, এই স্টলে বিক্রির অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সিপিএমের বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় বাধা ও হামলার অভিযোগ উঠলেও বই বিক্রি বন্ধ হয়নি। এত পরিমাণ বই বিক্রি হওয়ার পিছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে থাকতে পারে। প্রথমত, পুজোর সময় বইয়ের স্টলগুলিতে নিয়মিত পাঠকেরা আসেন। অনেকেই প্রতি বছর পুজোর বইয়ের স্টল থেকে নিজেদের পছন্দের বই কেনেন। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বই পড়ার আগ্রহও রয়েছে অনেকের মধ্যে। তৃতীয়ত, কোনো বইয়ের স্টল ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলে সেটি আরও বেশি মানুষের নজরে আসতে পারে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সেই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে স্টলটি নিয়ে মানুষের কৌতূহলও বাড়তে পারে।
এ বারের পুজোয় সিপিএমের বইয়ের স্টল তাই শুধু বই বিক্রির জায়গা হিসেবে আলোচনায় আসেনি। হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং তার মধ্যেও বই বিক্রি চালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনার অংশ হয়েছে। উৎসবের আবহে এই সংঘাত যেমন নজর কেড়েছে, তেমনই নজর কেড়েছে বই কেনার আগ্রহ।
হামলা, ভাঙচুরের অভিযোগ আর রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও পুজোর সময় সিপিএমের বই বিক্রি চলেছে। কোথাও স্টল ভাঙার অভিযোগ উঠেছে, আবার কোথাও নতুন করে স্টল সাজিয়ে বই বিক্রি শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে, নানা বাধার মধ্যেও বই বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।







