চৌরঙ্গীতে জমল ‘দেশলাই’ মিউজিক নাইট, কিউ-এর নতুন ব্যান্ডে মাতলেন রূপম-সৃজিতরাও
Q Priyanka Sarkar Deshlai: ‘অড স্পেস’ এবং ‘গালি গ্যাং’-এর এই যৌথ উদ্যোগ স্বাধীন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত র্যাপার ডিভাইন ও নায়েজির হাত ধরে উঠে আসা মুম্বইয়ের এই মিউজিক লেবেলটি এই প্রথম কোনো বাংলা গান ও ছবির অল-ইন্ডিয়া ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় চৌরঙ্গীর ‘লিটল বিট সোবার’-এ বসেছিল এক অন্যধারার চনমনে মিউজিক আড্ডা। উপলক্ষ—পরিচালক কিউ-এর নতুন ছবি ‘দেশলাই’-এর সাউন্ডট্র্যাক লঞ্চ। তবে এটি স্রেফ কোনো ছবির সাধারণ অ্যালবাম মুক্তি ছিল না, বরং অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠল বাংলা গান ও পপুলার কালচারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেছেন জনপ্রিয় আরজে সায়ন, যিনি এই ছবিতে ‘টাইসন’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। সহজ-সরল বাচনভঙ্গিতে চমৎকারভাবে পুরো সন্ধ্যাটিকে পরিচালনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই আয়োজনে ছিল এক সুন্দর পরিকল্পনা। সন্ধ্যা সাতটা বাজতেই বাজানো হয় অড স্পেস-এর তৈরি বিশেষ ‘বাংলা পপ প্লেলিস্ট’। যেখানে দেশলাই-এর নিজস্ব ট্র্যাকগুলির গানের পাশাপাশি স্থান পেয়েছিল ‘বাংলা ঠেক’, বহিরাগত, স্ট্রিট ফুড ও বর্তমান ধারার অন্যান্য স্বাধীন শিল্পীদের গান।
মিউজিক লঞ্চে উপস্থিত ইন্ডাস্ট্রির কলাকুশলীরা
‘অড স্পেস’ এবং ‘গালি গ্যাং’-এর এই যৌথ উদ্যোগ স্বাধীন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত র্যাপার ডিভাইন ও নায়েজির হাত ধরে উঠে আসা মুম্বইয়ের এই মিউজিক লেবেলটি এই প্রথম কোনো বাংলা গান ও ছবির অল-ইন্ডিয়া ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্ব নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য কেবল এই একটি ছবিতেই সীমিত নয়; অড স্পেস ও গালি গ্যাং-এর লক্ষ্য হলো এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে আগামী দিনে বাংলা স্বাধীন গানকে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই পুরো উদ্যোগের মূল ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে একটি নতুন শব্দবন্ধের মধ্যে—‘বাংলা পপ’। কে-পপ বা জে-পপ যেভাবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে, ঠিক সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে এই নতুন জনরা। অড স্পেস-এর এই ধারণায় বাংলা হিপ-হপ, র্যাপ, ইলেকট্রো বা আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক—সবকিছুকেই কোনো আলাদা খোপে না ফেলে এক ছাতার তলায় এনে বলা হচ্ছে ‘বাংলা পপ’। বাংলার চেনা পপুলার কালচারকে আজকালের বৈশ্বিক নান্দনিকতা দিয়ে নতুন করে তুলে ধরাই এর মূল উদ্দেশ্য। কেবল মিউজিক নয়, এই ধারার প্রথম ফসল হলো কিউ-এর ছবি ‘দেশলাই’—যা ভারতের প্রথম ‘বাংলা পপ ফিল্ম’। ছবিটিতে আর্ট ফিল্মের সূক্ষ্ম ভাবধারার পাশাপাশি রয়েছে একটা চকচকে পপ এলিমেন্ট। যেমন গ্রামের অ্যাসবেস্টস বা টিনের ঘর দেখানো হলেও তা ক্যামেরায় অত্যন্ত আধুনিক ও উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মিউজিক লঞ্চের মূল আকর্ষণ ছিল—কিউ-এর নতুন ব্যান্ড ‘ডেথ বাই আঞ্জুমান’-এর টানা ৪০ মিনিটের লাইভ পারফরম্যান্স। ‘দ্য বার্নিং ডেক’-এর সুরকার সন্দীপ মাধবান ও কিউ-এর এই ব্যান্ডের তৈরি নতুন ‘ইলেকট্রো-পোস্ট-পপ’ সুরে মেতে ওঠেন উপস্থিত দর্শকেরা। তারপর হিপ-হপ ক্রু ‘বাংলা ঠেক’-এর পারফরম্যান্সের মাধ্যমে শেষ হয় মিউজিক নাইট। এই আয়োজনে এই ছবির কলাকুশলী পরিচালক কিউ, মুম্বইয়ের মিউজিক লেবেল ‘গালি গ্যাং’-এর প্রতিনিধি শান্তনু এবং অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির আরও বহু শিল্পীই উপস্থিত ছিলেন। বাংলা রক গায়ক রূপম ইসলাম, পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধিজীবী রোদ্দুর রায়সহ ইন্ডাস্ট্রির আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিউ
এই মিউজিক লঞ্চের মাধ্যমেই অফিসিয়াল যাত্রা শুরু করল ছবির টাইটেল ট্র্যাক ‘আমি দেশলাই’। ইউটিউব ও অন্যান্য অডিও প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে গানটি। ১০০ বছরের পুরনো একটি সুফি সুরের সঙ্গে বাংলা র্যাপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই গান। সুফি অংশে কণ্ঠ দিয়েছেন ‘মুর্শিদাবাদি প্রজেক্ট’-এর সৌম্য এবং র্যাপ অংশে স্বয়ং কিউ।
তবে ‘আমি দেশলাই’ গানটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিশেষ মিউজিক ভিডিও, যেখানে আগুনের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে। ডার্ক, আন্ডারগ্রাউন্ড ও স্টাইলিশ লুকে প্রিয়াঙ্কাকে একেবারে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন দর্শক। প্রথমবার মিউজিক ভিডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রিয়াঙ্কা জানান, কিউ-এর কাজ সবসময়ই আলাদা, আর গানটি প্রথমবার শোনার পরেই তাঁর ভীষণ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। শান্ত পরিবেশের গান থেকে শুরু করে ডান্স ফ্লোরে নাচার মতো গান—সব ধরনের সুরই মজুত রয়েছে এই অ্যালবামে।
মিউজিক লঞ্চের অনুষ্ঠানে রোদ্দুর রায় ও সুরজিৎ সেন
শুধু ‘আমি দেশলাই’-ই নয়, এই অ্যালবামের ‘পিনিক’ বা ‘বাংলা হইতে কোরিয়া’-র মতো গানগুলিতে ধরা দিয়েছে ভরপুর কে-পপ এনার্জি। দীর্ঘ আট বছর পর আবার পূর্ণদৈর্ঘ্যের সিনেমায় ফিরছেন কিউ। ‘দেশলাই’ মূলত জুয়েল (অভিনয়ে সিজু শাহরিয়ার) নামের এক বাংলাদেশি তরুণ টিকটকারের গল্প, যে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসে জানতে পারে এখানে টিকটক বন্ধ। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন প্রজন্মের জীবন ও অনলাইন পরিচিতির অনিশ্চয়তার গল্পই ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে—তবে বেশ রঙিন ও মজার ছলে।
প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা আসার আগেই চৌরঙ্গীর এই মিউজিক নাইট স্পষ্ট করে দিল, কোনো বাঁধাধরা নিয়মে আটকে না থেকে বাংলা মিউজিকে এক নতুন ধারা নিয়ে আসতে পুরোপুরি প্রস্তুত ‘দেশলাই’।








