‘পাকিস্তানি ফলোয়ার’ তত্ত্ব ভুয়ো? ককরোচ জনতা পার্টি বিতর্কে ফ্যাক্ট-চেক

Cockroach Janata Party: ককরোচ জনতা পার্টির অধিকাংশ ফলোয়ার কি সত্যিই পাকিস্তানের? বিজেপি নেতা তাজিন্দর পাল সিং বাগ্গার ভাইরাল দাবির পর কেন শুরু হলো বিতর্ক? ফ্যাক্ট-চেকে সামনে এল কী তথ্য? জনপ্রিয় একটি মিম-পেজকে ঘিরে কেন এত রাজনৈতিক তরজা এবং ‘পাকিস্তানি’ তকমার অভিযোগ উঠছে?

inscript
৩ মিনিট
‘পাকিস্তানি ফলোয়ার’ তত্ত্ব ভুয়ো? ককরোচ জনতা পার্টি বিতর্কে ফ্যাক্ট-চেক

সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। ব্যঙ্গ, মিম আর রাজনৈতিক কটাক্ষ মিলিয়ে তৈরি হওয়া এই ইনস্টাগ্রাম পেজটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এমনকি ফলোয়ারের সংখ্যার নিরিখে বিজেপির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজকেও টপকে গিয়েছে বলে দাবি ওঠে। আর তারপর থেকেই শুরু হয় বিতর্ক।

ডানপন্থী শিবিরের একাংশ দাবি করতে শুরু করে, এই পেজের অধিকাংশ ফলোয়ারই নাকি পাকিস্তানের। বিজেপি যুব মোর্চার নেতা তাজিন্দর পাল সিং বাগ্গা সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি গ্রাফিক পোস্ট করে দাবি করেন, সিজেপির ৪৯ শতাংশ ফলোয়ার পাকিস্তান থেকে। তাঁর পোস্টে আরও বলা হয়, আমেরিকা থেকে ১৪ শতাংশ, বাংলাদেশ থেকে ১৪ শতাংশ এবং ভারত থেকে মাত্র ৯ শতাংশ ফলোয়ার রয়েছে। এই দাবির ভিত্তিতেই তিনি কটাক্ষ করে লেখেন, এটি আসলে 'পাকিস্তান জনতা পার্টি'।

শুধু বাগ্গাই নন, আরও কয়েকজন ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার একই দাবি ছড়িয়ে দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত মুখ রিশি বাগরিও একই ধরনের পোস্ট করে লেখেন,

“ককরোচ জনতা পার্টির আসল সত্য এটাই।”

তাঁর দাবি ছিল, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আমেরিকার নাগরিকরাই মূলত এই পেজকে জনপ্রিয় করে তুলছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পোস্ট ভাইরাল হয়ে যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘স্ট্যালিনবাদী সেন্সরশিপ’! ককরোচ জনতা পার্টিকে কটাক্ষ আরএসএস-ঘনিষ্ঠ পত্রিকার

Cockroach Janta Party: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে এবার সরব আরএসএস-ঘনিষ্ঠ পত্রিকা ‘অর্গানাইজার’। সিজেপির কর্পোরেট মিডিয়া-বিরোধী অবস্থানকে তারা ‘স্ট্যালিনবাদী সেন্সরশিপ’ বলে কটাক্ষ করেছে। বেকারত্ব, তরুণদের ক্ষোভ ও ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বিতর্ক এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনায়।

এই বিতর্কে যোগ দেন কয়েকজন সাংবাদিকও। এবিপি নিউজের সাংবাদিক চিত্রা ত্রিপাঠী ফেসবুকে লেখেন,

“ককরোচ জনতা পার্টির অর্ধেক ফলোয়ার পাকিস্তানি।”

যদিও তিনি নিজের পোস্টে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা সোর্স দেননি। একইসঙ্গে জি-গোষ্ঠীর সংবাদমাধ্যম উইয়নও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়,

“ককরোচ জনতা পার্টির ফলোয়ারদের মধ্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”

এই সমস্ত দাবির পর বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্ট-চেক করে অল্ট নিউজ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাইরাল হওয়া গ্রাফিকটির কোনো সত্যতা নেই। অল্ট নিউজ সরাসরি যোগাযোগ করে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের সঙ্গে। তিনি ইনস্টাগ্রামের অ্যানালিটিক্সের একটি স্ক্রিন রেকর্ডিং শেয়ার করেন, যেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, পেজটির ৯৪.৭ শতাংশ দর্শকই ভারতের। আমেরিকা থেকে রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ, ব্রিটেন থেকে ০.৭ শতাংশ এবং কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে ০.৬ শতাংশ করে দর্শক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দিনবদলের ক্ষমতা আছে ককরোচ জনতা পার্টির?

ভারতের জেন জি আদতে একরৈখিক নয়। মেট্রো শহরের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং প্রত্যন্ত ছোট শহরের চাকরিপ্রার্থী যুবকের রাজনৈতিক চাহিদা ও লড়াই কখনও এক নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নামই নেই। অর্থাৎ, যে দাবি করা হচ্ছিল যে পেজটির প্রায় অর্ধেক ফলোয়ার পাকিস্তানের, তা সম্পূর্ণ ভুয়ো।

অভিজিৎ দিপক নিজেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিযোগের জবাব দেন। তিনি লেখেন,

“আমার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হয়েছেন, তখন আসল তথ্যটিই সামনে আনছি। ভারতের ৯৪ শতাংশ যুবককে কেন পাকিস্তানি বলা হচ্ছে?”

তাঁর পোস্টও দ্রুত ভাইরাল হয়।

পুরো ঘটনাটি আরও আলোচনায় আসে কারণ ককরোচ জনতা পার্টির এক্স হ্যান্ডল ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পেজটির ফলোয়ার সংখ্যা দুই লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। এরপরই সেই অ্যাকাউন্ট ভারতে ‘withheld’ দেখাতে শুরু করে। অভিজিৎ দাবি করেন, জনপ্রিয়তা বাড়তেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পেজকে ঘিরে এত তীব্র প্রতিক্রিয়া কেন? অনেকের মতে, সিজেপি আসলে সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক। যেখানে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল না হয়েও মিম, ব্যঙ্গ আর ডিজিটাল ভাষাকে ব্যবহার করে শাসকদলের সমালোচনা করা হচ্ছে। আর সেই কারণেই এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তরুণদের মধ্যে।

অন্যদিকে, সমালোচকদের বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পেজ জনপ্রিয় হলেই তাকে 'বিদেশি ষড়যন্ত্র' বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এখন বাড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে 'পাকিস্তানি' তকমা ব্যবহার করা যেন একটি সহজ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায়ও সেটাই দেখা গেল বলে মনে করছেন অনেকে।

অল্ট নিউজ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে, যে গ্রাফিক ব্যবহার করে দাবি করা হচ্ছিল সিজেপির অধিকাংশ ফলোয়ার পাকিস্তানের, তার কোনো প্রমাণ নেই। বরং ইনস্টাগ্রামের আসল তথ্য বলছে, পেজটির প্রধান দর্শক ভারতীয়রাই। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলি বিভ্রান্তিকর।

বোঝাই যাচ্ছে, রাজনৈতিক মেরুকরণের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য যাচাই না করেই কত দ্রুত ভুয়ো দাবি ছড়িয়ে পড়ে। কোনো তথ্য ভাইরাল হলেই সেটি সত্যি হয়ে যায় না। বিশেষ করে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলিতে ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। ককরোচ জনতা পার্টিকে ঘিরে বিতর্ক আপাতত থামার লক্ষণ নেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?