‘স্ট্যালিনবাদী সেন্সরশিপ’! ককরোচ জনতা পার্টিকে কটাক্ষ আরএসএস-ঘনিষ্ঠ পত্রিকার
Cockroach Janta Party: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে এবার সরব আরএসএস-ঘনিষ্ঠ পত্রিকা ‘অর্গানাইজার’। সিজেপির কর্পোরেট মিডিয়া-বিরোধী অবস্থানকে তারা ‘স্ট্যালিনবাদী সেন্সরশিপ’ বলে কটাক্ষ করেছে। বেকারত্ব, তরুণদের ক্ষোভ ও ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে কেন্দ্র করে তৈরি এই বিতর্ক এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনায়।
আরএসএসের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-ঘনিষ্ঠ পত্রিকা ‘অর্গানাইজার’ সম্প্রতি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-কে ঘিরে একটি কড়া সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। সেখানে এই ভাইরাল ডিজিটাল আন্দোলনকে 'রাজনৈতিকভাবে পরিকল্পিত' একটি প্রচার অভিযান বলে দাবি করা হয়েছে।
গত কয়েক দিনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মূলত তরুণ প্রজন্মের বেকারত্ব, জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, চাকরির অভাব এবং রাজনৈতিক হতাশাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের উত্থান। ব্যঙ্গ, মিম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা ব্যবহার করে সিজেপি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। একটি শুনানিতে তিনি কিছু বেকার যুবক এবং কর্মহীন মানুষকে 'আরশোলা' ও 'পরজীবী'র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই মন্তব্যের জেরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ছড়ায়। পরে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, তিনি দেশের সমস্ত যুবসমাজকে অপমান করতে চাননি। কিন্তু ততক্ষণে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ একটি ভাইরাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতের জেন জি আদতে একরৈখিক নয়। মেট্রো শহরের উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী এবং প্রত্যন্ত ছোট শহরের চাকরিপ্রার্থী যুবকের রাজনৈতিক চাহিদা ও লড়াই কখনও এক নয়।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ দিপকে। বিদেশে বসবাসকারী এই রাজনৈতিক কৌশলবিদ দাবি করেছেন, তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভই এই আন্দোলনের মূল শক্তি। কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসরণকারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বহু তরুণ এই প্ল্যাটফর্মকে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা হিসেবে দেখছেন।
এই পরিস্থিতিতেই ‘অর্গানাইজার’ তাদের সম্পাদকীয়তে সিজেপিকে আক্রমণ করে। “ককরোচ সিনড্রোম: দ্য নিউ ফেস অফ অ্যান্টি-ইন্ডিয়া টেক সিনিসিজম” শিরোনামের ওই লেখায় বলা হয়েছে, এই আন্দোলন আসলে 'ফ্রিবি-নির্ভর, বামঘেঁষা রাজনৈতিক পরিবেশের' অংশ। সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়েছে, সিজেপি তরুণদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে দেশের উন্নয়ন এবং আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করতে চাইছে।
সিজেপির বিভিন্ন দাবিকেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছে ‘অর্গানাইজার’। যেমন, মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের দাবি, দলবদলকারী রাজনীতিকদের নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বা বড় কর্পোরেট মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিলের দাবি—এসবকে তারা 'অবাস্তব' এবং 'সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী' বলে বর্ণনা করেছে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই ধরনের প্রস্তাব বাস্তব নীতির বদলে সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই আন্দোলন তথাকথিত রাজনৈতিক শুদ্ধতার ধার ধারে না। তারা সরাসরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে, ব্যঙ্গ করে এবং প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলে। জেন-জি’র কাছে এটাই এই সময়ের 'অথেনটিক' রাজনীতি। বহু বছর ধরে একই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর চেনা ভাষণ শুনে তারা ক্লান্ত। তারা এমন কাউকে চাইছে, যে অন্তত তাদের ক্ষোভের ভাষায় কথা বলতে পারে।
বিশেষ করে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আদানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম নিয়ে সিজেপির সমালোচনাকে ‘অর্গানাইজার’ 'স্ট্যালিনবাদী সেন্সরশিপ' বলেও উল্লেখ করেছে। তাদের যুক্তি, বড় শিল্পগোষ্ঠী ছাড়া ভারতের প্রযুক্তিগত ও শিল্প উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দাবি করা এবং অন্যদিকে বড় কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে আক্রমণ করা—এই দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী বলেই তারা মনে করছে।
আরএসএসের মুখপত্র আরও দাবি করেছে, দেশের যুবসমাজকে 'শ্রম' থেকে সরিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাদের বক্তব্য, ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি এবং এই সময়ে তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ফিনান্সিয়াল টাইমস এবং দ্য গার্ডিয়ান-এর মতো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের তরুণ প্রজন্মের হতাশা ও ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন দিক তুলে ধরেছে এই আন্দোলন।
এর মধ্যেই সিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়া, দিল্লি হাইকোর্টে মামলা এবং রাজনৈতিক তরজা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির একাংশ এই পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত বলেও অভিযোগ করেছে।





