নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্যের অভিযোগে পদক্ষেপ করেনি কেন্দ্র, আরটিআইতে সামনে এল চিঠি চালাচালির তথ্য
ECI RTI revelation: নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই কমিশনারের অসন্তোষ ও মন্ত্রিসচিবকে চিঠি দেওয়ার ঘটনাটি আরটিআই নথিতে কীভাবে প্রকাশ্যে এল, এবং সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের স্বার্থে সচিবালয় কেন সরাসরি পদক্ষেপে বিরত থাকল?
ভারতের নির্বাচন কমিশনের অন্দরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে এক পদস্থ আধিকারিকের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তথ্য জানার অধিকার আইন বা আরটিআইয়ের মাধ্যমে পাওয়া নথি থেকে জানা গিয়েছে, এই বিরোধের কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসচিব টি ভি সোমনাথনকে চিঠি লিখেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশনের পদস্থ আধিকারিক মানীশ গর্গ দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁদের নির্দেশ অমান্য করেছেন। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর সরাসরি কোনো পদক্ষেপ করেনি মন্ত্রিসচিবের দফতর। তাদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে এভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ কে বাত্রার দায়ের করা আরটিআই আবেদনের উত্তরে এই তথ্য সামনে এসেছে। নথিগুলি থেকে বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসচিবের দফতর কীভাবে দুই কমিশনারের অভিযোগ বিবেচনা করেছিল। তবে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে কি না, কিংবা নির্বাচন কমিশনের অন্দরে পরে কোনো তদন্ত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। ফলে এই ঘটনা নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং তার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল বিরোধ?
২০২৬ সালের ২৮ জুলাই নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে একটি নির্দেশ জারি হয়। সেই নির্দেশে সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মানীশ গর্গকে প্রশাসন বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ভানু প্রকাশ ইয়েতুরু ছুটিতে ছিলেন। তাঁর ছুটি চলার কথা ছিল ৯ অগাস্ট পর্যন্ত।
পরের দিন, অর্থাৎ ২৯ জুলাই, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসচিবকে চিঠি লিখে গর্গের কাজকর্ম নিয়ে অভিযোগ জানান।
মন্ত্রিসচিবের দফতরের নথিতে থাকা অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, গর্গ অন্য আধিকারিকদের দায়িত্ব বণ্টনে একতরফা পরিবর্তন করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন দুই কমিশনার।
সান্ধুর আপত্তি ছিল, আগে আলোচনা না করেই এ ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্যদিকে, যোশীর অভিযোগ ছিল, প্রশাসন বিভাগের কাছে চাওয়া একটি ফাইল তাঁকে দেওয়া হয়নি। দুই কমিশনারের বক্তব্য ছিল, মৌখিক ও লিখিত নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন বা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল না।
এই অভিযোগের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও কার্যকালের মেয়াদ) আইন-এর ১৮(১) ও ১৮(২) ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে একা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না যে গর্গ আইন ভেঙেছিলেন। তার জন্য অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং প্রাসঙ্গিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আরটিআইয়ের উত্তরে কী জানা গেল?
লোকেশ কে বাত্রা ২৪ সেপ্টেম্বর আরটিআই আবেদন করে জানতে চান, দুই নির্বাচন কমিশনারের চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রিসচিবের দফতর কী পদক্ষেপ করেছিল। ১৯ অক্টোবরের উত্তরে দফতর চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে এবং সেগুলি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনার নথিও প্রকাশ করে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Saurav Das & Ashutosh Ranka Case: কেন তিহাড়ে পাঠানো হয়েছিল সিজেপি নেতা সৌরভ ও আশুতোষকে? আর কোন যুক্তিতে তাঁদের আর হেফাজতে না রেখে মুক্তি দিল আদালত?
নথি অনুযায়ী, ৩ অগাস্ট একটি নোটে অভিযোগ সম্পর্কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের মতামত চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরের দিন, ৪ অগাস্ট, মন্ত্রিসচিবের দফতর বিবেচনা করে যে তারা সরাসরি এই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ করতে পারে কি না।
দফতরের নথিতে বলা হয়, দুই কমিশনার চিঠি লিখেছিলেন তাঁদের ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে। সেটি নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক অবস্থান জানিয়ে পাঠানো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি ছিল না। সেই কারণে কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়া সরাসরি পদক্ষেপ করলে তা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে হস্তক্ষেপ বলে বিবেচিত হতে পারে।
৫ অগাস্ট মন্ত্রিসচিব দুই কমিশনারের চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়ে তাঁদের উত্তর দেন। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় কর্মিবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতর বা ডিওপিটি, ওই দফতরের এস্টাবলিশমেন্ট অফিসার এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দফতরে। ভবিষ্যতে গর্গকে নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনার জন্য নথিভুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ, অভিযোগগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রকাশিত নথি থেকে জানা যায় না, পরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়েছিল কি না, অথবা ডিওপিটি কোনো পদক্ষেপ করেছিল কি না।
এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিক, দুই নির্বাচন কমিশনার কেন অভিযোগ জানাতে মন্ত্রিসচিবের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং তাঁদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হওয়ার কথা ছিল।
নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার জন্য সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে তার স্বাধীনতা বজায় রাখা জরুরি। সেই কারণেই মন্ত্রিসচিবের দফতর সরাসরি পদক্ষেপ করার ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখিয়েছে।
কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে তার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। বরং প্রতিষ্ঠানের ভিতরে দায়িত্ব বণ্টন, ফাইলের চলাচল এবং আধিকারিকদের মধ্যে মতবিরোধের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা জরুরি। অভিযোগ উঠলে তা কীভাবে পরীক্ষা করা হবে এবং তার নিষ্পত্তি কীভাবে নথিভুক্ত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ক্ষেত্রে মন্ত্রিসচিবের দফতর অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তারা জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে অভিযোগগুলি আসেনি বলে সরাসরি পদক্ষেপ করা উপযুক্ত হবে না। ফলে অভিযোগগুলি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বা গর্গকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ নিয়ে বিতর্ক
দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে এই বিরোধের সূত্র নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কাজকর্মের সঙ্গেও যুক্ত। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা পরিচালনা, তথ্যভান্ডারে আধিকারিকদের প্রবেশাধিকার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে এর আগে একাধিক সংবাদমাধ্যমে মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
সেপ্টেম্বর মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নির্বাচন কমিশনের ভিতরে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে সান্ধু এবং যোশীর আপত্তির কথা জানায়। নির্বাচন কমিশন অবশ্য দাবি করেছিল, এই মতবিরোধের কারণে কমিশনের কাজকর্ম ব্যাহত হয়নি।
২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশন জানায়, দুই কমিশনারের নির্দেশ অনুযায়ী বিতর্কিত দায়িত্ব বণ্টনের নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। কমিশনের বক্তব্য ছিল, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের তদারকির দায়িত্বও আসলে প্রত্যাহার করা হয়নি। তাদের মতে, মন্ত্রিসচিবকে পাঠানো চিঠির বিষয়টি ছিল ডেপুটেশনে আসা এক আধিকারিকের কাজকর্ম নিয়ে, তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়।
এছাড়া কমিশন জানায়, তাদের ডিজিটাল ব্যবস্থা ইসিআইনেট পর্যালোচনার জন্য একজন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটিতে আইআইটি বা আইআইআইটির একজন স্বাধীন বিশেষজ্ঞ থাকবেন। ভবিষ্যতে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত নতুন উদ্যোগ ও পোর্টাল কমিশনের অনুমোদনের জন্য পেশ করার আগে আধিকারিকদের একটি কমিটি সেগুলি নিয়ে আলোচনা করবে বলেও জানানো হয়।
তবে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে এই বিরোধের সঙ্গে ভোটার তালিকার সফটওয়্যার সংক্রান্ত বৃহত্তর বিতর্ককে এক করে দেখা ঠিক হবে না। আরটিআইয়ের নথি থেকে ভোটারদের তথ্য বদলানো হয়েছে বা বেআইনিভাবে কারও নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি।
যে প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অধরা
আরটিআইয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত নথি থেকে স্পষ্ট হয়েছে, দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসচিবের দফতরে পৌঁছেছিল এবং তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। চিঠিগুলির অনুলিপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দফতর ও ডিওপিটিকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিতর্কিত নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। কিন্তু কমিশনারদের অভিযোগের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি না, তা জানার জন্য আরও নথি প্রয়োজন।
এখানেই মূল প্রশ্নটি থেকে যায়। একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে সরকারের হস্তক্ষেপ এড়ানো যেমন জরুরি, তেমনই সেই প্রতিষ্ঠানের ভিতরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ নিষ্পত্তিও প্রয়োজন। স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে না দেখে, উপযুক্ত নিয়ম ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুটিকেই নিশ্চিত করা দরকার।
উল্লেখ্য, প্রকাশিত নথি আপাতত চিঠি চালাচালির বিবরণ দিয়েছে। অভিযোগগুলির যথাযথ নিষ্পত্তি হয়েছিল কি না, তার উত্তর পেতে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা ও পরবর্তী সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত আরও তথ্যের প্রয়োজন।








