ইজরায়েলগামী বিমান হামলা: ‘হিরো’ পাইলট, প্লাম্বার ও দাঁতের ডাক্তার কীভাবে বাঁচালেন ১৭৪ প্রাণ?
Israel flight emergency: ককপিটে পাইলটের উপর ছুরি হামলার পর কীভাবে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল ইজরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের বিমান? আহত অবস্থাতেও কী ভূমিকা নিলেন ভারতীয় পাইলট? কীভাবে এক প্লাম্বার, দন্ত চিকিৎসক এবং কয়েকজন যাত্রী মিলে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে সাহায্য করলেন? শেষ পর্যন্ত কীভাবে বাঁচল বিমানে থাকা ১৭৪ জনের প্রাণ?
দুবাই থেকে ইজরায়েলের তেল আভিভের উদ্দেশে উড়েছিল ফ্লাইদুবাইয়ের একটি যাত্রীবাহী বিমান। মাঝ আকাশে আচমকাই বদলে গেল পরিস্থিতি। ককপিটের ভিতর এক পাইলটের উপর অন্য পাইলটের ছুরি হামলার পর বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই যাত্রীদের মনে তৈরি হয় চরম আতঙ্ক। শেষ পর্যন্ত আহত ভারতীয় পাইলট, কয়েকজন যাত্রী এবং বিমানে থাকা অন্য প্রশিক্ষিত কর্মীদের তৎপরতায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে।
ঘটনাটি ঘটে ৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে। বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটিতে ১৭৪ জন যাত্রী ও কর্মী ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই ইজরায়েলি নাগরিক। বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের দিকে যাচ্ছিল। প্রায় ৩৩ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকার সময় ককপিটে ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে তাঁর সহ-পাইলট ছুরি দিয়ে আক্রমণ করেন বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। এরপর বিমানটি অস্বাভাবিক দ্রুততায় নিচে নামতে শুরু করে। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় এক মিনিটের মধ্যে ৩৩ হাজার ফুট থেকে ১৭ হাজার ফুটে নেমে যায়।
এই সময় গুরুতর আহত অবস্থাতেও মাচ্ছার ককপিটের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। ফলে যাত্রী এবং অন্য কয়েকজন কর্মী ভিতরে ঢোকার সুযোগ পান। তাঁরা হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন পরে জানান, ককপিটে ঢুকে তিনি হামলাকারীকে ধরে সরিয়ে দেন। বিমানটি তখনও বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে নামছিল। ককপিটে থাকা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ধরে বিমানটিকে ফের উপরে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। পরে অন্য ক্রু সদস্যরা নিয়ন্ত্রণ নেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel Palestine War 2023 : আমি যখন এই লেখাটা লিখছি, তখনও গাজা থেকে আমাদের শহরগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে
এই ঘটনায় হায়ুন ছাড়াও আরও কয়েকজন যাত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তজভিকা মানেস, তালি মানেস, চিকিৎসক শোটা মুসায়েভ এবং আসাফ রাজুয়ান। কেউ হামলাকারীকে আটকে রাখতে সাহায্য করেন, কেউ আহত পাইলটের চিকিৎসা করেন। যাত্রীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, সেই সময় তাঁরা বুঝতেই পারছিলেন না বিমানটি শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আসবে কি না। কেউ কেউ প্রার্থনা করতে শুরু করেছিলেন।
এরপর বিমানটিকে ইজরায়েলের বদলে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুকে নামানো হয়। সেখানে আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারতের দূতাবাস জানিয়েছে, তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি চিকিৎসাধীন। মাচ্ছারের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ককপিটের দরজা খুলে যাত্রীদের ঢোকার সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনাকে ইজরায়েল ও ভারতের নেতারা প্রশংসা করেছেন।
ঘটনার পর হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে বিমানটি ধ্বংস করার সম্ভাব্য চেষ্টা হিসেবে তদন্ত করছে। তবে এখনও হামলার উদ্দেশ্য নিশ্চিত হয়নি। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, অভিযুক্ত সহ-পাইলট একাই কাজ করে থাকতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তাই ঘটনাটিকে সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে তদন্ত শেষ হওয়া প্রয়োজন।
অভিযুক্ত সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিমানটি নিরাপদে অবতরণের পর তাঁকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। একই সঙ্গে ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির তদন্ত করছে। ফ্লাইদুবাইও ইজরায়েলের সঙ্গে তাদের উড়ান সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে।
এই ঘটনায় তাই শুধু মাঝ আকাশে পাইলটের উপর হামলার প্রশ্নই উঠছে না, বিমান নিরাপত্তা এবং ককপিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে হামলার কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে আরও তথ্যের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।








