
আজকের প্রজন্মের বাঙালি মণীশ ঘটককে প্রায় চেনেনই না। চিনলেও কেবলমাত্র মহাশ্বেতা দেবীর পিতা-এই পরিচয়টাই যেন প্রধান হয়ে উঠেছে। কল্লোল যুগের রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখে যাঁরা সাহিত্যসৃষ্টি করেছিলেন, মণীশ ঘটক ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।
'পটলডাঙ্গার পাঁচালী' প্রকাশিত হওয়ার পর সেই গল্পগ্রন্থের মধ্যে অশ্লীলতা খুঁজে পেয়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সজনীকান্ত দাস। যদিও সজনীকান্তকে পাত্তা দেননি রবীন্দ্রনাথ।
অন্ত্যজ জীবনকে উপলব্ধি করার একটা জহুরির চোখ নিয়ে নিজের সৃষ্টিকে পরিচালিত করেছিলেন মণীশ ঘটক। ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রনা দেশভাগের অনেক আগের থেকেই এই ঘটক পরিবারকে উপলব্ধি করতে হয়। যমুনা নদী তাঁদের বারবার ছিন্নমূল করেছে। তাঁদের আদি বসত ভারেঙ্গা থেকে উচ্ছেদ করেছে। নতুন ভাড়েঙ্গাতে তাঁরা বসতি স্থাপন করেছেন, জমিদারির বিস্তার ঘটিয়েছেন। পাবনা জেলার নগরকেন্দ্রিক যে আভিজাত্য, সেই নীল রক্তের মধ্যে নিজের জীবনকে শুরু করেও অন্ত্যজ জনজীবনের যন্ত্রণাকে এত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারার যে শক্তি কোথা থেকে তিনি পেয়েছিলেন তা অনুসন্ধানে একটা বড় গ্রন্থ তৈরি হয়ে যেতে পারে। অথচ আজকের প্রজন্ম কিন্তু তাঁর ক্ষুরধার স্যাটায়ার মিশ্রিত লেখা, সেই সবের স্বাদ থেকে প্রায় অপরিচিতই থেকে গেলেন।
আমরা যারা প্রবীণ নাগরিকত্বের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়াতে শুরু করেছি, আমাদের প্রজন্মের কাছেও মণীশ ঘটক একজন অচেনা সাহিত্যিকই থেকে যেতেন যদি না দে'জ পাবলিশার্স তার সমস্ত লেখাগুলো সংকলিত করে প্রকাশ করতেন। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে যে কাজ বাংলা অকাদেমির করা উচিত ছিল, সেই কাজ যদি বাংলা অকাদেমি সত্যি তার জন্মলগ্ন থেকে করত অন্নদাশঙ্কর রায়ের পরামর্শ মতো, তাহলে হয়তো বাঙালির মননলোকের যে শূন্যতা আজকে তৈরি হয়েছে, এমনটা হতো না।
মণীশ ঘটক ছিলেন অন্নদাশঙ্করের অন্তরঙ্গ বন্ধু ।ইনকাম ট্যাক্সে অসত্য অপবাদ দিয়ে সেই মানুষটাকে চাকরিচ্যুত করার জন্য উচ্চপদস্থ অফিসারদের যে কর্মকাণ্ড ,তা অত্যন্ত ব্যথিত করেছিল অন্নদাশঙ্করকে। যদিও মণীশবাবুকে সেই কালদংশন থেকে রক্ষা করার মতো কোনো ক্ষমতা তখন অন্নদাশঙ্করের ছিল না। চাকরি হারানো মণীশ ঘটকের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য দু'চারজন ব্যক্তির কাছে অন্নদাশংকর অনুরোধ করলেও প্রাক্তন আইসিএস অফিসারের অনুরোধ শোনার মতো ধীশক্তি তখন কর্তাব্যক্তিদের ছিল না ।আর অন্নদাশংকর নিজেও কোনোদিন কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন না ।ফলে বন্ধু মণীশ ঘটকের প্রতি ঘটে যাওয়া অবিচারের বিচার, কর্তা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি আর পাননি। তবে অন্নদাশংকর বলতেন ; বাঁধাধরা চাকরির বাইরে বেরিয়ে এসে, মণীশবাবু যখন স্বাধীনভাবে ট্যাক্স কনসাল্টেন্ট হিসেবে নিজেকে মেলে ধরলেন তখনকার উপার্জন তাঁর চাকরিজীবনের বাঁধাধরা উপার্জনের থেকে বেশি হত ।
শাঁটুল গুপ্তের কলকাতাকে চেনার পদচারণার আঙ্গিকের সূচনাপর্ব মণীশ ঘটক করেছিলেন তাঁর পটলডাঙ্গার পাঁচালীর ভিতরে। রাধারমণ মিত্র তাঁর ক্ষেত্রসমীক্ষার ভিত্তিতে কলকাতাকে চিনিয়েছিলেন। সেই কলকাতার ভেতরে আরেকটা কলকাতাকে যেন আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন মনীশ ঘটক। পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি, কলকাতা শহর কেন্দ্রিক অন্ত্যজ মানুষদের নিয়ে বহু সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিকর্মকে পরিচালিত করেছেন। অতিসম্প্রতি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই ধরনের কিছু লেখার একটি সংকলন ও পড়লাম। 'টোটো কোম্পানি' নাম হয়েছে সেই সব লেখাগুলোর। এগুলি পড়লে বারবারই মনে হয়, লেখক কোথাও কখনো গোচরে বা অগোচরে মণীশ ঘটকের রচনা থেকে একটা স্নিগ্ধছায়া পেয়েছেন কলকাতার অন্তর ঘিরে আলোচনায়।
কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই মণীশ ঘটক আর তাঁর সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে হতে পারে না অন্ত্যজ জীবনকেন্দ্রিক কথকতা। আজকে তথাকথিত কলকাতাপ্রেমীরা হয়তো জানেনই না, মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের নাম একটা সময় ছিলো 'গ্যাড়াতলা পার্ক' । পটলডাঙ্গার পাঁচালীর ভেতরে মণীশ ঘটক গ্যাঁড়াতলা পার্ক, তার সন্নিহিত অঞ্চল কলুটোলা, কেশব সেনের বাড়ি থেকে মাথঘষা গলি, যেখানে এককালে ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের অবাধ বিচরণ, সেইসব অঞ্চলের শেকড়বিহীন মানুষগুলোর কথা অনবদ্য ভঙ্গিমায় লিখে গিয়েছেন।
সেই লেখার মধ্যে আনন্দ আছে। বিষাদ আছে।উত্তেজনা আছে। ভয় আছে। শাসকের চোখরাঙানির সেকালকে ধরতে পারার একটা অদ্ভুত অনুসন্ধিৎসা আছে। সর্বোপরি রয়েছে শেকড়বিহীন মানুষদের প্রতি এক অনবদ্য ভালোবাসা। নদী আর রাডক্লিফ শেকড় উপরের দিয়েছিল মণীশ ঘটকের। তাই শেকড়বিহীন মানব সমাজের সুলুকসন্ধানে মণীশ ঘটক চিরদিন থেকে গিয়েছিলেন ক্লান্তিবিহীন।








