মণীশ ঘটককে আজকের বাঙালি চিনতেই পারল না

Gautam Roy
৩ মিনিট
মণীশ ঘটককে আজকের বাঙালি চিনতেই পারল না

আজকের প্রজন্মের বাঙালি মণীশ ঘটককে প্রায় চেনেনই না। চিনলেও কেবলমাত্র মহাশ্বেতা দেবীর পিতা-এই পরিচয়টাই যেন প্রধান হয়ে উঠেছে। কল্লোল যুগের রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রেখে যাঁরা সাহিত্যসৃষ্টি করেছিলেন, মণীশ ঘটক ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।

'পটলডাঙ্গার পাঁচালী' প্রকাশিত হওয়ার পর সেই গল্পগ্রন্থের মধ্যে অশ্লীলতা খুঁজে পেয়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সজনীকান্ত দাস। যদিও সজনীকান্তকে পাত্তা দেননি রবীন্দ্রনাথ।

অন্ত্যজ জীবনকে উপলব্ধি করার একটা জহুরির চোখ নিয়ে নিজের সৃষ্টিকে পরিচালিত করেছিলেন মণীশ ঘটক। ছিন্নমূল হওয়ার যন্ত্রনা দেশভাগের অনেক আগের থেকেই এই ঘটক পরিবারকে উপলব্ধি করতে হয়। যমুনা নদী তাঁদের বারবার ছিন্নমূল করেছে। তাঁদের আদি বসত ভারেঙ্গা থেকে উচ্ছেদ করেছে। নতুন ভাড়েঙ্গাতে তাঁরা বসতি স্থাপন করেছেন, জমিদারির বিস্তার ঘটিয়েছেন। পাবনা জেলার নগরকেন্দ্রিক যে আভিজাত্য, সেই নীল রক্তের মধ্যে নিজের জীবনকে শুরু করেও অন্ত্যজ জনজীবনের যন্ত্রণাকে এত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারার যে শক্তি কোথা থেকে তিনি পেয়েছিলেন তা অনুসন্ধানে একটা বড় গ্রন্থ তৈরি হয়ে যেতে পারে। অথচ আজকের প্রজন্ম কিন্তু তাঁর ক্ষুরধার স্যাটায়ার মিশ্রিত লেখা, সেই সবের স্বাদ থেকে প্রায় অপরিচিতই থেকে গেলেন।

আমরা যারা প্রবীণ নাগরিকত্বের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়াতে শুরু করেছি, আমাদের প্রজন্মের কাছেও মণীশ ঘটক একজন অচেনা সাহিত্যিকই থেকে যেতেন যদি না দে'জ পাবলিশার্স তার সমস্ত লেখাগুলো সংকলিত করে প্রকাশ করতেন। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে যে কাজ বাংলা অকাদেমির করা উচিত ছিল, সেই কাজ যদি বাংলা অকাদেমি সত্যি তার জন্মলগ্ন থেকে করত অন্নদাশঙ্কর রায়ের পরামর্শ মতো, তাহলে হয়তো বাঙালির মননলোকের যে শূন্যতা আজকে তৈরি হয়েছে, এমনটা হতো না।

মণীশ ঘটক ছিলেন অন্নদাশঙ্করের অন্তরঙ্গ বন্ধু ।ইনকাম ট্যাক্সে অসত্য অপবাদ দিয়ে সেই মানুষটাকে চাকরিচ্যুত করার জন্য উচ্চপদস্থ অফিসারদের যে কর্মকাণ্ড ,তা অত্যন্ত ব্যথিত করেছিল অন্নদাশঙ্করকে। যদিও মণীশবাবুকে সেই কালদংশন থেকে রক্ষা করার মতো কোনো ক্ষমতা তখন অন্নদাশঙ্করের ছিল না। চাকরি হারানো মণীশ ঘটকের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য দু'চারজন ব্যক্তির কাছে অন্নদাশংকর অনুরোধ করলেও প্রাক্তন আইসিএস অফিসারের অনুরোধ শোনার মতো ধীশক্তি তখন কর্তাব্যক্তিদের ছিল না ।আর অন্নদাশংকর নিজেও কোনোদিন কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন না ।ফলে বন্ধু মণীশ ঘটকের প্রতি ঘটে যাওয়া অবিচারের বিচার, কর্তা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি আর পাননি। তবে অন্নদাশংকর বলতেন ; বাঁধাধরা চাকরির বাইরে বেরিয়ে এসে, মণীশবাবু যখন স্বাধীনভাবে ট্যাক্স কনসাল্টেন্ট হিসেবে নিজেকে মেলে ধরলেন তখনকার উপার্জন তাঁর চাকরিজীবনের বাঁধাধরা উপার্জনের থেকে বেশি হত ।

শাঁটুল গুপ্তের কলকাতাকে চেনার পদচারণার আঙ্গিকের সূচনাপর্ব মণীশ ঘটক করেছিলেন তাঁর পটলডাঙ্গার পাঁচালীর ভিতরে। রাধারমণ মিত্র তাঁর ক্ষেত্রসমীক্ষার ভিত্তিতে কলকাতাকে চিনিয়েছিলেন। সেই কলকাতার ভেতরে আরেকটা কলকাতাকে যেন আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন মনীশ ঘটক। পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি, কলকাতা শহর কেন্দ্রিক অন্ত্যজ মানুষদের নিয়ে বহু সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টিকর্মকে পরিচালিত করেছেন। অতিসম্প্রতি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই ধরনের কিছু লেখার একটি সংকলন ও পড়লাম। 'টোটো কোম্পানি' নাম হয়েছে সেই সব লেখাগুলোর। এগুলি পড়লে বারবারই মনে হয়, লেখক কোথাও কখনো গোচরে বা অগোচরে মণীশ ঘটকের রচনা থেকে একটা স্নিগ্ধছায়া পেয়েছেন কলকাতার অন্তর ঘিরে আলোচনায়।

কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই মণীশ ঘটক আর তাঁর সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে হতে পারে না অন্ত্যজ জীবনকেন্দ্রিক কথকতা। আজকে তথাকথিত কলকাতাপ্রেমীরা হয়তো জানেনই না, মধ্য কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের নাম একটা সময় ছিলো 'গ্যাড়াতলা পার্ক' । পটলডাঙ্গার পাঁচালীর ভেতরে মণীশ ঘটক গ্যাঁড়াতলা পার্ক, তার সন্নিহিত অঞ্চল কলুটোলা, কেশব সেনের বাড়ি থেকে মাথঘষা গলি, যেখানে এককালে ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের অবাধ বিচরণ, সেইসব অঞ্চলের শেকড়বিহীন মানুষগুলোর কথা অনবদ্য ভঙ্গিমায় লিখে গিয়েছেন।

সেই লেখার মধ্যে আনন্দ আছে। বিষাদ আছে।উত্তেজনা আছে। ভয় আছে। শাসকের চোখরাঙানির সেকালকে ধরতে পারার একটা অদ্ভুত অনুসন্ধিৎসা আছে। সর্বোপরি রয়েছে শেকড়বিহীন মানুষদের প্রতি এক অনবদ্য ভালোবাসা। নদী আর রাডক্লিফ শেকড় উপরের দিয়েছিল মণীশ ঘটকের। তাই শেকড়বিহীন মানব সমাজের সুলুকসন্ধানে মণীশ ঘটক চিরদিন থেকে গিয়েছিলেন ক্লান্তিবিহীন।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।