কোভিড খেয়েছে পেটের ভাত, তবু আশার নাম হালখাতা

rudranjan
৩ মিনিট
কোভিড খেয়েছে পেটের ভাত, তবু আশার নাম হালখাতা

তখন ছিল কাগজ-কলমের যুগ। আজকের মতো ডিজিটাইজড দুনিয়ার বাসিন্দা ছিল না মানুষ। চড়ক পার্বণের কিছু আগে থেকেই তোরজোড় শুরু হত। রঙ-বেরঙের খামে ভরা হালখাতার নানান আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে যেত মধ্যবিত্ত বাঙালির বাড়িতে। তারপর বচ্ছরকার দিনে কুলুঙ্গির লক্ষ্মী-গণেশ কে তেল সিঁদুরে সাজিয়ে খোলা হত নতুন খেরোর খাতা। যুগ যুগ ধরে এমন নিয়মই চলে আসছে বাংলায়। কালক্রমে হালখাতার চরিত্র পালটালো। আজকাল ১ লা বৈশাখ উপলক্ষে ‘শ্রী দুর্গা সহায়’ লেখা আমন্ত্রণপত্র আর প্রায় আসে না বললেই চলে। নিমন্ত্রণ জানানোর কাজটা ইদানিং ওয়াটস অ্যাপেই মাধ্যমেই সারেন বহু দোকানী। এমন পরিবর্তন সত্ত্বেও গাজন উৎসবের ঠিক পরেই নানান সাজে সেজে ওঠে কলকাতার দোকানগুলো। অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন ক্যালেন্ডার আর মিষ্টির বাক্স। কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে হালখাতার জৌলুস কমেছে, কিন্তু তার ঐতিহ্য আজও অমলিন। বাংলার ব্যবসায়ীদের হাত ধরে একবিংশ শতাব্দীতেও এই প্রাচীন রীতি বেঁচে আছে।

শুভ্রাংশু পোদ্দারের কথাই ধরা যাক। আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে ঢাকুরিয়া রেল গেটের কাছে তাঁর বাবা একটা গেঞ্জি কারখানা তৈরি করেন। কারখানার নাম দেন ‘এস এস উদ্যোগ’। নব্বইয়ের দশকে আসানসোল এবং ঝড়িয়া অঞ্চলে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন তিনি। তারপর কারখানার দায়িত্ব এসে পড়ে শুভ্রাংশুর হাতে। বাজারের হাল-হকিকত বুঝে নিতে বেশিদিন সময় লাগেনি তাঁর। আসানসোল এবং ঝড়িয়া অঞ্চলের কয়লা শ্রমিকরাই ছিলেন তাঁদের গেঞ্জির নিয়মিত খরিদ্দার। সারাদিন কয়লা খনিতে কাজ করাবার ফলে সপ্তাহের শেষে তাঁদের গেঞ্জিগুলো আর পরবার মতো অবস্থায় থাকত না, ফলত প্রতি সপ্তাহেই এক জোড়া নতুন গেঞ্জি কিনতেন তাঁরা। তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ার ফলে ‘এস এস উদ্যোগে’র গেঞ্জিই ছিল তাঁদের প্রথম পছন্দ। এর ফলে দীর্ঘ সময় জুড়ে আসানসোল বা ঝড়িয়ার শ্রমিক অঞ্চলে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় ব্যবসা করেছেন শুভ্রাংশু, কিন্তু বিপত্তি ঘটলো কোভিডের ফলে। দু-দুটো লকডাউনের পর কয়লা খনির বহু শ্রমিকই কর্মহীন হয়ে পড়লেন। শ্রমিকদের হাতে টাকা না থাকায় প্রতি সপ্তাহে নতুন গেঞ্জি কেনা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল। এ ছাড়াও গেঞ্জি তৈরির সুতো আর থান কাপড়ের দাম এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেল, ফলত শুভ্রাংশুদের ব্যবসায় টান পড়ল।

ব্যবসার অবস্থা যেমনই থাকুক না কেন, প্রতি বছর নিয়ম করে হালখাতা পালন করেন শুভ্রাংশুরা। এদিন সকাল থেকেই তাঁদের বাড়িতে তোরজোড় শুরু হয়। প্রথমে গৃহদেবতার পায়ে তেল, হলুদ এবং সিঁদুর দিয়ে পুজো দেওয়া হয়। তারপর তা ছোঁয়ানো হয় কারখানার মেশিনে। প্রতি বছর ১ লা বৈশাখের দিন কুলুঙ্গির লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি বিসর্জন দেন শুভ্রাংশুরা। পুরনোর পরিবর্তে কুলুঙ্গিতে আসে নতুন মূর্তি। হালখাতার দিন প্রথমে তাদের কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে পুজো দেওয়ানো হয়, তারপর ফুল-মালা সহযোগে সিংহাসনে স্থাপন করা হয়। সব শেষে আসে খেরোর খাতা বা ‘লেজার বুকে’র প্রথম পৃষ্ঠায় কলমের আঁচর কাটবার পালা। কোভিড পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কারণেই উদযাপনের ধুম-ধাম খানিক কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন শুভ্রাংশুরা। তিনি বলছিলেন, ‘আগে ১ লা বৈশাখের দিন কারখানার শ্রমিকদের পাত পেড়ে খাওয়ানো হত, মেনুতে মাছ, মাংস সবই থাকত। এখন আর সেসব কিছুই করে উঠতে পারি না। গত দু বছর ধরে শ্রমিকদের হাতে অল্প কিছু টাকা আর মিষ্টির বাক্স ধরিয়ে দেওয়া হয়।’

বেহালার সুমন সরকারের গল্পও একইরকম। অল্পবয়সে বাবা-মাকে হারানোর পর বেহালার বকুলতলায় কাঠের ব্যবসা শুরু করেন সুমন। দোকানের নাম রাখেন ‘স্টার প্লাইউড’। ২০১২-১৩ সাল থেকে নানান অর্থনৈতিক ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়ে আজও কোনোরকমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর দোকান যে খুব ভালো চলে তা নয়, তার উপর লকডাউনের ফলেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রতি হালখাতাতেই নিজেদের ধরা-বাধা কয়েকজন খরিদ্দারকে দোকানে নিমন্ত্রণ করেন সুমন। তাঁদের হাতে তুলে দেন নতুন বছরের বাংলা ক্যালেন্ডার আর খাবারের প্যাকেট। ‘স্টার প্লাইউডে’র অধিকাংশ খরিদ্দারই ‘বাকি’তে জিনিস কেনেন। ফলত হালখাতার দিন প্রত্যেকেই নিজেদের সামর্থ্য মতো কিছু কিছু করে টাকা-পয়সা দেওয়ার চেষ্টা করেন। লক্ষ্মী-গণেশকে ফুল মালা দিয়ে পুজো করবার পর সেই টাকার হিসেব তারপর তুলে দেওয়া হয় নতুন খেরোর খাতায়। সুমন বললেন, ‘২০২০ তো লকডাউনের উপর দিয়েই গেল। সে বছর আর হালখাতা করতে পারিনি। পরের বছর কষ্ট করে করেছিলাম, কিন্তু বাজার থেকে সেভাবে টাকা ওঠেনি। আশা করছি এ বছর লাভের অঙ্কটা কিছুটা হলেও বেশি হবে।’

শুভ্রাংশু এবং সুমন একইসঙ্গে নতুন প্রজন্মের ব্যবসাদার এবং ক্ষুদ্র পুঁজির মালিক। অতিমারির ফলে দুজনের ব্যবসাই ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু কষ্ট করে হলেও প্রতি বছর হালখাতা পালন করেন তাঁরা।

শুভ্রাংশু বলছিলেন, ‘ব্যবসাটা কতদিন ধরে রাখতে পারব জানি না। যা অবস্থা, কয়েকদিন পর কারখানা হয়ত উঠেই যাবে। তবে, যদি ব্যবসা থাকে, হালখাতাও থাকবে। যেমনভাবেই হোক না কেন, প্রতি বছর হালখাতা পালন করব।’ হালখাতার ইতিহাস বহু প্রাচীন। কালে কালে তার ধরন বদলেছে। শুভ্রাংশু এবং সুমনের কথাবার্তায় অনুমান করে নেওয়া যায় কেবল পূর্ববর্তী প্রজন্ম নয়, একবিংশ শতাব্দীর নতুন প্রজন্মও তাঁদের ঐতিহ্য সম্বন্ধে অবগত এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখবার ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা নিচ্ছে। তাদের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।