ইমাম ভাতা থেকে পুরোহিত ভাতা: কেন, কী ভাবে শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এই অনুদান প্রকল্পগুলি?
West Bengal imam bhata: ইমামদের জন্য ভাতা দিয়ে শুরু হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এই অনুদান প্রকল্প। পরে যুক্ত হন মোয়াজ্জেম, তারপর পুরোহিতরাও। কেন নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত? জেনে নিন, ২০১২ থেকে ২০২৬ এই প্রকল্পগুলির ইতিহাস।
পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ভাতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রকল্পকে ঘিরে যেমন রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি হয়েছে, তেমনই উঠেছে 'তোষণের রাজনীতি'র অভিযোগ। নতুন সরকার এসে ইমাম, মোয়াজ্জেম ও পুরোহিতদের জন্য চালু থাকা সব ধর্মভিত্তিক ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেই পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। এই প্রকল্পগুলির সূচনা কীভাবে? কেন ২০১২ সালে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? পরে কীভাবে এর সঙ্গে যুক্ত হলেন মোয়াজ্জেম ও পুরোহিতরা?
২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন নিজেকে এমন এক নেত্রী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছিলেন, যিনি উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজের প্রান্তিক ও উপেক্ষিত মানুষদের পাশে দাঁড়াবেন। পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে ছিল। কেন্দ্রের বিচারপতি রাজিন্দর সচর কমিটির প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আয়ের নিরিখে মুসলিম সমাজ দেশের অন্যতম বঞ্চিত সম্প্রদায়। এই প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে শুরু করে নতুন সরকার।
২০১২ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ইমামদের এক সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, রাজ্যের নিবন্ধিত ইমামদের মাসিক ২,৫০০ টাকা করে সম্মানভাতা দেওয়া হবে। তাঁর যুক্তি ছিল, গ্রাম ও শহরের বহু মসজিদের ইমাম খুব সামান্য আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেন। অনেকেই মাসে কয়েকশো বা এক-দেড় হাজার টাকার বেশি পান না। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক কাজও করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তাঁদের জীবনে স্বস্তি আসবে।
এই ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এটি মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে ধরে রাখার কৌশল। বিশেষত বিজেপি এবং কংগ্রেস প্রশ্ন তোলে, কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাদের সরকারি অর্থে ভাতা দেওয়া কি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? তবে তৃণমূল সরকারের বক্তব্য ছিল, এটি ধর্মীয় তোষণ নয়; আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
একই বছরের মে মাসে সরকার মোয়াজ্জেমদের জন্যও মাসিক ১,০০০ টাকা সম্মানভাতার ঘোষণা করে। মোয়াজ্জেম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আজান দেন এবং মসজিদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারের যুক্তি ছিল, ইমামদের মতো তাঁরাও কম আয়ের মধ্যে কাজ করেন এবং তাঁদেরও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal economic crisis: কেন শিল্প, কৃষি ও কর্মসংস্থানের এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ আজও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে এগোতে পারল না? কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ও তৃণমূল—কার নীতি বাংলার অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে?
কিন্তু এই প্রকল্পের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয়, রাজ্যের কোষাগার থেকে সরাসরি ইমাম ও মোয়াজ্জেমদের ভাতা দেওয়া সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত মনে করে, ধর্মের ভিত্তিতে সরাসরি সরকারি অর্থ বিতরণ সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এরপর রাজ্য সরকার কৌশল বদলে পশ্চিমবঙ্গ ওয়াকফ বোর্ডের মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণ শুরু করে। অর্থাৎ সরকারি অনুদান ওয়াকফ বোর্ডের হাতে তুলে দেওয়া হতো, এবং বোর্ড তা নিবন্ধিত ইমাম ও মোয়াজ্জেমদের মধ্যে বণ্টন করত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্পের আওতা এবং অর্থের পরিমাণ বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালের অগাস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, ইমামদের মাসিক ভাতা ৩,০০০ টাকা এবং মোয়াজ্জেমদের ১,৫০০ টাকা করা হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সচেতনতা, টিকাকরণ, পোলিও কর্মসূচি বা সামাজিক বার্তা প্রচারে ইমামরা সরকারের সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁদের আর্থিক সম্মান দেওয়া উচিত।
তবে শুধুমাত্র মুসলিম ধর্মীয় কর্মীদের জন্য ভাতা দেওয়া নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছিল, তা প্রশমিত করতে সরকার ধীরে ধীরে হিন্দু পুরোহিতদের জন্যও আর্থিক সহায়তা চালু করে। প্রথম দিকে আর্থিকভাবে দুর্বল প্রায় ৮,০০০ পুরোহিতকে মাসিক ১,০০০ টাকা দেওয়া শুরু হয়। পরে এই সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ দু'টিই বাড়ানো হয়। ২০২৩ সালে পুরোহিতদের মাসিক ভাতা ১,৫০০ টাকা করা হয়।
২০২৬ সালের মার্চে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আবার ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়। পুরোহিত ও মোয়াজ্জেমদের মাসিক ভাতা ২,০০০ টাকা করা হয় এবং নতুন আবেদনগুলিও অনুমোদনের কথা জানানো হয়। এর ফলে প্রকল্পটি যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন বাংলার মানুষের প্রিয় ‘দিদি’র দল আজ মানুষের মন থেকে দূরে সরে গেল? কেন মা-মাটি-মানুষের শ্লোগান আর আগের মতো কাজ করল না? এর পিছনে রয়েছে মূলত ১১টি কারণ।
এই পুরো বিষয়টিতে একটি বিষয় লক্ষণীয়। ২০১২ সালে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল মূলত ইমামদের আর্থিক দুরবস্থা এবং সংখ্যালঘু উন্নয়নের যুক্তি সামনে রেখে। পরে মোয়াজ্জেমদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং 'একপাক্ষিক তোষণ'-এর অভিযোগ ঠেকাতে পুরোহিতদেরও একই ধরনের সহায়তার আওতায় আনা হয়।
সমর্থকদের মতে, এটি ছিল সমাজের এমন একটি অংশকে সাহায্য করার উদ্যোগ, যাঁরা নীরবে ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত নন। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
এই ভাতা চালু হওয়ার পর থেকে এই প্রকল্পে মোট কত টাকা খরচ হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব এক জায়গায় প্রকাশিত নেই। কারণ প্রকল্পটির আওতাভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ সময়ের সঙ্গে একাধিকবার বদলেছে। তবু উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি আনুমানিক হিসাব করা যায়।
প্রথম দিকে প্রায় ৩০ হাজার ইমামকে মাসিক ২,৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। সে হিসাবে বছরে খরচ দাঁড়াত প্রায় ৯০ কোটি টাকা। পরে মোয়াজ্জেমদের জন্য মাসিক ১,০০০ টাকা চালু হয়। কয়েক বছরের মধ্যে ইমাম ও মোয়াজ্জেম মিলিয়ে উপভোক্তার সংখ্যা ৪৫ হাজারের বেশি হয় বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়। ২০২৩ সালে ইমামদের ভাতা বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা এবং মোয়াজ্জেমদের ১,৫০০ টাকা করা হয়। সেই সময় প্রায় ৪৫ হাজার ইমাম ও মোয়াজ্জেম এই প্রকল্পের আওতায় ছিলেন। শুধু এই দুই শ্রেণির জন্যই বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছয়। এর পাশাপাশি হিন্দু পুরোহিতদের জন্যও পৃথক সম্মানভাতা চালু হয়। প্রথমে কয়েক হাজার পুরোহিতকে ১,০০০ টাকা করে দেওয়া হলেও পরে তা ১,৫০০ টাকা করা হয়।
এই সব তথ্য একত্র করলে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ১৪ বছরে ইমাম, মোয়াজ্জেম এবং পুরোহিতদের ভাতা বাবদ মোট সরকারি ব্যয় আনুমানিক ১,৫০০ কোটি থেকে ২,০০০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মতো সরাসরি মাসিক ইমাম ভাতা চালুর উদাহরণ খুবই বিরল। কিছু রাজ্যে ওয়াকফ বোর্ডের নিজস্ব তহবিল থেকে সীমিত আর্থিক সহায়তা বা সম্মানী দেওয়া হয়, কিন্তু রাজ্য সরকারের বাজেট থেকে এত বড় পরিসরে নিয়মিত ভাতা দেওয়ার নজির কার্যত পশ্চিমবঙ্গেই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল।
নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করেছে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে না। তাদের বক্তব্য, কল্যাণমূলক প্রকল্প সকল নাগরিকের জন্য সমান হওয়া উচিত, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। ফলে জুন মাস থেকে ইমাম, মোয়াজ্জেম এবং পুরোহিত—তিন পক্ষেরই এই ভাতা বন্ধ হচ্ছে।
তবে কি ইমাম, মোয়াজ্জেম ও পুরোহিতদের ভাতা বাবদ বরাদ্দ হওয়া কোটি কোটি টাকা এবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তা, পানীয় জল ও কর্মসংস্থানের মতো উন্নয়নমূলক খাতে ব্যবহার হবে? ধর্মভিত্তিক অনুদান বন্ধ করে সরকার কি সত্যিই সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের ব্যবস্থা করতে চাইছে, এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।









