দিদির ম্যাজিক কাজ করল না! তৃণমূলের ভেঙে পড়ার ১১ কারণ

কেন বাংলার মানুষের প্রিয় ‘দিদি’র দল আজ মানুষের মন থেকে দূরে সরে গেল? কেন মা-মাটি-মানুষের শ্লোগান আর আগের মতো কাজ করল না? এর পিছনে রয়েছে মূলত ১১টি কারণ।

Deepsubhra Mahato
৯ মিনিট
দিদির ম্যাজিক কাজ করল না! তৃণমূলের ভেঙে পড়ার ১১ কারণ

বাংলার রাজনীতিতে এক সময়ের অপরাজেয় শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালের নির্বাচনে যে বিশাল হারের মুখ দেখেছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতি এবং কর্পোরেট নির্ভর রাজনীতি—সব মিলিয়ে তৃণমূলের পরাজয়ের পথটি দীর্ঘ সময় ধরেই তৈরি হচ্ছিল। অবশেষে ১৫ বছর পর তাই শেষ হলো 'দিদির রাজত্ব'। কিন্তু কেন বাংলার মানুষের প্রিয় ‘দিদি’র দল আজ মানুষের মন থেকে দূরে সরে গেল? কেন মা-মাটি-মানুষের শ্লোগান আর আগের মতো কাজ করল না?

এর পিছনে রয়েছে মূলত ১১টি কারণ। তৃণমূলের এই পতনের সেই মূল কারণগুলোই নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

১. আদর্শিক অস্পষ্টতা

তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম এবং ক্ষমতায় আসার মূল ভিত্তি কোনো নির্দিষ্ট 'রাজনৈতিক দর্শন' নয়, বরং একটি তীব্র 'প্রতিষ্ঠান-বিরোধী' মেজাজ ছিল। বামফ্রন্ট সরকারের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে একত্রিত করাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাথমিক সাফল্য। তৃণমূলের উত্থান ঘটেছিল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্পায়ন নীতির বিপরীতে "বুদ্ধ আসছে জমি কাড়তে"—এই বয়ানটি সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে নিরন্ন ও প্রান্তিক মানুষের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেল, বামপন্থীদের যেমন একটি সুনির্দিষ্ট 'মার্ক্সবাদী' লেনিনীয় দর্শন রয়েছে বা বিজেপির যেমন 'হিন্দুত্ববাদী' আদর্শিক কাঠামো আছে, তৃণমূলের তেমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দর্শন নেই।

যে দলটি এক সময় প্রতিষ্ঠান-বিরোধী লড়াই করে ক্ষমতায় এসেছিল, পরে তারা নিজেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে দলের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনরোষ বা 'অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি' মোকাবিলা করার মতো কোনো আদর্শিক ঢাল তৃণমূলের কাছে নেই। বামপন্থীরা হারলেও তাদের ক্যাডারদের একটি বড় অংশ আদর্শের খাতিরে দলের পাশে থাকে;

সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ না থাকায় দলটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। কখনও তারা অতি-বামপন্থাকে তোষণ করেছে, কখনও আবার বিজেপির হিন্দুত্ববাদকে টেক্কা দিতে 'নরম হিন্দুত্ব'-এর আশ্রয় নিয়েছে। এই ঘনঘন অবস্থান পরিবর্তন ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট 'রাজনৈতিক আদর্শ' না থাকায় দলের নেতা-কর্মীরা জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার অলিন্দে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা প্রকারান্তরে রাজনৈতিক বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে।

২. দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া লাগামহীন দুর্নীতি। পঞ্চায়েতের নিচুতলা থেকে শুরু করে নবান্নের শীর্ষ মহল—দুর্নীতির জাল সর্বত্র বিস্তৃত। বাংলার হাজার হাজার গরিব মানুষের সঞ্চিত অর্থ লুঠ করার অভিযোগ উঠেছিল সারদা ও রোজ ভ্যালির মতো চিটফান্ড সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে। এই কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের বহু ‘হেভিওয়েট’ নেতার নাম জড়িয়েছে।

সারদা গ্রুপের কর্ণধার সুদীপ্ত সেনের সঙ্গে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের দহরম-মহরম ছিল ওপেন সিক্রেট। এই ঘটনায় মদন মিত্রের মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীকে দীর্ঘ সময় জেলে থাকতে হয়েছে। এছাড়া মুকুল রায় (তৎকালীন শীর্ষ নেতা), সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাংসদদের নামও তদন্তের তালিকায় উঠে আসে। নারদা স্টিং অপারেশনে ক্যামেরার সামনে বান্ডিল বান্ডিল টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল দলের তৎকালীন মন্ত্রী ও সাংসদদের। ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট মন্ত্রীদের এই ভিডিওতে দেখা যায়। এছাড়া সাংসদ সৌগত রায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৎকালীন নেতা শুভেন্দু অধিকারী ও মুকুল রায়ের নামও এই তালিকায় ছিল।

শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ রাজ্য রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠর বাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার দৃশ্য বাংলার মানুষ ভোলেনি।

সারদা, নারদা থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি পর্যন্ত প্রতিটি কেলেঙ্কারি সাধারণ মানুষের মনে দলের প্রতি তীব্র অনাস্থা তৈরি করেছে।

৩. অত্যধিক কর্পোরেট নির্ভরতা (আইপ্যাক)

তৃণমূল কংগ্রেস এক সময় পরিচিত ছিল মাঠপর্যায়ের লড়াকু রাজনীতির জন্য। কিন্তু গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিজস্ব সংগঠন বা পুরনো অভিজ্ঞ নেতাদের উপর ভরসা করার চেয়ে দল অনেক বেশি ‘আইপ্যাক’ (I-PAC)-এর মতো একটি পেশাদার কর্পোরেট সংস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত তৃণমূলের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ পরিচালিত হয়েছে আইপ্যাকের ছকে। ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করা, কোন বুথে দল কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল তার নিখুঁত পরিসংখ্যান তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী ঘরোয়া সার্ভে করে নির্বাচনী কৌশল সাজানোই ছিল আইপ্যাকের মূল কাজ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা, বড় বড় রোড-শো সাজানো, হেলিকপ্টারে যাতায়াতের দৃশ্য থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন—সবই হয়েছে আইপ্যাকের পেশাদার কর্মীদের হাতে। কোন এলাকায় কোন প্রার্থী দাঁড়ালে সুবিধা হবে কিংবা কোন ইস্যু (যেমন: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা নারী সুরক্ষা) বেশি ভোট টানবে, তা দলের অভিজ্ঞ নেতাদের বদলে ঠিক করে দিয়েছে আইপ্যাকের ডেটা।

আইপ্যাকের হস্তক্ষেপ নিয়ে দলের ভিতরেই বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে যে ‘পুরনো বনাম নতুন’-এর লড়াই, তার মূলে রয়েছে এই আইপ্যাক সংস্কৃতি। মমতা এক সময় একে ‘আমার আইপ্যাক’ বললেও পরে এর কর্মপদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই দ্বিমুখী বার্তা দলের নিচুতলার কর্মীদের বিভ্রান্ত করেছে। এই অত্যধিক নির্ভরশীলতা একদিকে যেমন আধুনিক রণকৌশল আনে, অন্যদিকে দলকে সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

৪. যান্ত্রিকতা বনাম আবেগ

রাজনীতি কেবল কিছু সরকারি প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা বণ্টন বা ভোটের পাটিগণিত নয়; এটি আসলে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ এবং আদর্শের এক গভীর রসায়ন। গত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণে এই ‘আবেগ’ এবং ‘যান্ত্রিকতা’-র লড়াইটি খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিকতাকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেখানে বিরোধী শিবিরগুলি টিকে ছিল তাদের আদর্শিক আবেগের জোরে।

যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও একটি দলের যেটা শেষ সম্বল থাকে, তা হলো তার আদর্শিক ভোট ব্যাঙ্ক। নির্বাচনে বামপন্থীরা হয়তো মাত্র ৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে, কিন্তু এই ৪ শতাংশ ভোটার হলেন ‘সচ্চা’ বা কট্টর কমিউনিস্ট। চরম দুর্দিনেও তাঁরা দলের হাত ছাড়েননি, কারণ তাঁদের কাছে রাজনীতি মানে কেবল ভোট দেওয়া নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শনে বিশ্বাস করা। একইভাবে বিজেপিকে যারা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের একটি বড় অংশ আরএসএস (RSS) বা হিন্দুত্ববাদী দর্শনের প্রতি প্রবলভাবে আবেগপ্রবণ। রাম মন্দির বা ধর্মীয় পরিচিতির মতো বিষয়গুলি তাঁদের কাছে কেবল রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং আত্মিক আবেগের জায়গা। এই আবেগই তাঁদের ভোটকেন্দ্রে টেনে নিয়ে যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরিযায়ী শ্রমিকরাও ভোট দিলেন না মমতাকে?

West Bengal politics 2026: পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট কি এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল? ভিন রাজ্যে কাজ, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি ও স্থানীয় অসন্তোষ কি তাদের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে?

তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। দলটি ক্রমশ মানুষের মনের আবেগকে বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং ‘যান্ত্রিক’ হয়ে পড়ে। দল মাটির মানুষের মুখের কথার চেয়ে আইপ্যাকের দেওয়া ‘ডেটা’ বা পরিসংখ্যানকে বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে। কোন পাড়ায় কয়জন সুবিধাভোগী আছে, কার অ্যাকাউন্টে কোন প্রকল্পের টাকা পৌঁছল—এই সব তথ্য দিয়েই তারা ভোটের জয় নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।

এক সময় তৃণমূল ছিল লড়াকু আন্দোলনের নাম। কিন্তু বর্তমানে দলটি হয়ে পড়েছে অনেকটা ‘কর্পোরেট সাপ্লাই চেইন’-এর মতো। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পৌঁছনোর কাজটা অত্যন্ত যান্ত্রিকভাবে হচ্ছে, সেখানে দলের কর্মীদের সঙ্গে মানুষের সেই আগের মতো আত্মিক বা পারিবারিক বন্ধন আর নেই। ভোটাররা এখন নিজেদের কেবল ‘বেনিফিশিয়ারি’ বা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখছেন, দলের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে নয়।

যেমন- একজন মা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা নিলেও, তাঁর সন্তানের নিরাপত্তা, চাকরির জন্যও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এই তথ্য তো আইপ্যাকের কাছে নেই।

৫. তারকাপ্রীতি ও অযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিতে ‘গ্ল্যামার’ বা তারকাপ্রীতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই বিষয়টিকে দলটি যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, তা অভিজ্ঞ রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পোড়খাওয়া নেতাদের বাদ দিয়ে বারবার রূপোলি পর্দা বা খেলার মাঠের তারকাদের টিকিট দেওয়া সাধারণ মানুষ সহজভাবে নিতে পারেনি। তাঁদের আচরণ এবং কাজের প্রতি দায়বদ্ধতার অভাব ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারের একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়, যেখানে সায়ন্তিকা এক বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কেমন আছেন, উত্তরে সেই বৃদ্ধা বলেন, সায়ন্তিকা তো আর ভোটের পর আর দেখতে আসেননি তাদের।

প্রতি নির্বাচনে তৃণমূল টলিউডের একাধিক জনপ্রিয় মুখকে ভোটের ময়দানে নামিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন বড় মাপের জনপ্রিয় মুখ কি সবসময় একজন ভালো জন প্রতিনিধি হতে পারেন? ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তারকা প্রার্থীর তালিকায় ছিল— সোহম চক্রবর্তী, রাজ চক্রবর্তী, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, লাভলী (অরুন্ধতী) মৈত্র, অদিতি মুন্সি। এই প্রার্থীদের গ্ল্যামারকে ব্যবহার করে বড় বড় রোড-শো করা হলেও মাটির মানুষের সমস্যার সমাধানে তাঁরা কতটা অভিজ্ঞ, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

কেবল অভিনেতা নয়, এবার খেলার মাঠ থেকেও শিবশংকর পাল (ক্রিকেটার) বা স্বপ্না বর্মণকে (ক্রীড়াবিদ) টিকিট দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, নাট্যকার অর্পিতা ঘোষকেও প্রার্থী করা হয়েছে সাংস্কৃতিক আবেগ উসকে দেওয়ার জন্য। দল ভেবেছিল তাঁদের জনপ্রিয়তা সহজে ভোটে রূপান্তরিত হবে, কিন্তু বাস্তবে মানুষ তাঁদের ‘রাজনীতিবিদ’ হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধাবোধ করেছে।

তারকা প্রার্থীদের নিয়ে সবথেকে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো তাঁদের অনপুস্থিতি। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার সময় পান না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতীতেও এর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে-

  • মিমি চক্রবর্তী: ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যাদবপুরের সাংসদ থাকাকালীন সংসদে তাঁর উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ২১%। অর্থাৎ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনেই তিনি গরহাজির ছিলেন। পরে তিনি ইস্তফা দিলেও তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাছে পাননি বলে অভিযোগ ছিল।

  • নুসরত জাহান: বসিরহাটের সাংসদ হিসেবে তাঁর উপস্থিতির হারও ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক (৩০-৪০%)। সংসদের কাজে মন দেওয়ার চেয়ে তিনি ব্যক্তিগত জীবন ও গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন বলে সমালোচিত হয়েছেন। এমনকী তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

সাধারণ মানুষ যখন তাঁদের মূল্যবান ভোট দিয়ে কাউকে নির্বাচিত করেন, তখন তাঁরা আশা করেন সেই প্রতিনিধি তাঁদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াবেন। সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সাংসদ যদি অনুমতি ছাড়া টানা ৬০ দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকেন, তবে তাঁর পদ শূন্য হয়ে যেতে পারে। তারকাদের ক্ষেত্রে এই আইনগত ঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনই থাকে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভয়।

তারকারা শ্যুটিং বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকায় এলাকার মানুষের জন্য বরাদ্দ সময় দিতে পারেন না। এবং তৃণমূল দিনের পর দিন পুরনো ও দক্ষ নেতাদের টিকিট না দিয়ে কেবল ‘ভোট জেতানোর মেশিন’ হিসেবে তারকাদের বেছে নিয়েছে প্রার্থী হিসেবে। ফলে একদিকে যেমন নিচুতলার কর্মীরা হতাশ হয়েছেন অন্যদিকে ভোটাররাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

৬. নারী নিরাপত্তা ও অসংবেদনশীল মন্তব্য

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান শক্তির উৎস ছিল রাজ্যের নারী সমাজ। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্পের হাত ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারী ভোটব্যাঙ্ককে নিজের দুর্গে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে কামদুনি থেকে আর জি কর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া একের পর এক নৃশংস নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং প্রশাসনের দায়সারা মনোভাব সেই আস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।

ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হওয়া মামলাই কেবল হিসেবে আসে, কিন্তু বাস্তবে ঘটনার সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করা হয়।

২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হিসেব করলে দেখা যায়, রাজ্যে প্রায় ১৭,০০০ থেকে ১৯,০০০-এর বেশি নারী নির্যাতনের বা ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে। গত কয়েক বছরের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট কিংবা হালে আর জি কর হাসপাতালের মতো ঘটনায় দেখা গিয়েছে, সঠিক সময়ে তদন্ত শেষ না হওয়া কিংবা তথ্য-প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে বারবার প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

তৃণমূলের নারী ভোটব্যাঙ্ক ধাক্কা খাওয়ার বড় কারণ কেবল অপরাধ নয়, বরং সেই অপরাধের পর খোদ দলনেত্রী বা প্রভাবশালী নেতাদের করা কিছু ‘অসংবেদনশীল’ মন্তব্য।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মমতার ১৫ বছর: একটু একটু করে ভেঙেছে বালির বাঁধ

Mamata Banerjee: সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের নেত্রী থেকে বাংলার ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ১৫ বছর পর কেন ভেঙে গেল সেই আস্থা? দুর্নীতি, চাকরি কেলেঙ্কারি, কর্মসংস্থানের অভাব, নারী নিরাপত্তা, জঙ্গলমহলের ধস—কোন কোন ইস্যু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করল তৃণমূলের?

দুর্গাপুর গণধর্ষণ

দুর্গাপুরে মেডিক্যাল পড়ুয়ার গণধর্ষণ কাণ্ডে মাননীয়ার প্রশ্ন "একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা এটি। এর দায় কার? মেয়েটি কীভাবে রাত্রি ১২.৩০ টার সময় বাইরে বেরিয়েছিল? বিশেষত মেয়েদের, রাতের বেলা বাইরে বেরোনোর অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। তাদেরও নিজেদের রক্ষা করতে হবে"

২০২২ সালের হাঁসখালি গণধর্ষণ ও মৃত্যু

এই ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন- "অ্যাকচুয়াল রেপ হয়েছে, না প্রেগন্যান্ট ছিল.... লাভ অ্যাফেয়ার্স তো ছিলই"

২০১২ সালের পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ

এই ঘটনায় ভুক্তভোগী মহিলা সুজেট জর্ডন নিজে থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। মুখ্যমন্ত্রী পার্ক স্ট্রিটের ধর্ষণের ঘটনাটিকে "সাজানো ঘটনা" বলে অভিহিত করেন। তৎকালীন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এই ঘটনাকে "ভুল হয়ে যাওয়া যৌন চুক্তি" বলেন। মহিলা পুলিশ আধিকারিক দময়ন্তী সেন, এই ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছিলেন। আর তাই, তাঁকে নিম্নস্তরের পদে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৩ সালের কয়েকটি ধর্ষণ কাণ্ড

২৭ ফেব্রুয়ারি আলিপুরদুয়ারের একটি চা বাগানে এক সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ করে খুন করে সেখানকারই শ্রমিক। মাননীয়া বলেন "ছোট ঘটনা"।

অক্টোবর মাসে মুর্শিদাবাদের ফারাক্কায় ১৩ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন " দুজন দুজনকে চিনত।"

মুর্শিদাবাদের সুপি থানার বালিয়াপুর গ্রামে ১৪ বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। মহাশয়ার বক্তব্য ছিল "এই ঘটনা প্রচার করে সরকারকে বিব্রত করার চক্রান্ত করা হচ্ছে"।

কাটোয়া ধর্ষণ

এর পরে কাটোয়ায় ধর্ষনের ঘটনাকেও "সাজানো ঘটনা" বলেন মাননীয়া।

কামদুনি ধর্ষণ

হাড়হিম করা সেই কামদুনির ঘটনা। কলেজ ছাত্রীকে গণধর্ষণের পর খুন করা হয়। এই ঘটনাকে "সিপিএমের রাজনীতি করে" বলেন মুখ্যমন্ত্রী।

তৃণমূল সরকার মনে করেছিল যে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মাসে কিছু টাকা দিলেই নারী ভোট অটুট থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

৭. নরম হিন্দুত্ব বনাম চরম হিন্দুত্ব

বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে যে ‘নরম হিন্দুত্ব’-এর কৌশল নিয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই নির্বাচনই স্থির করবে অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যত

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের পিছনে বড় ভূমিকা ছিল অভিষেকের। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব কয়েক গুণ বেড়েছে।

এক সময় তৃণমূল কংগ্রেস কেবল ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, গত কয়েক বছরে মমতা সরকারের নীতিতে মন্দিরের প্রতি বিশেষ অনুরাগ লক্ষ্য করা গেছে। একে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের পাল্টা কৌশল হিসেবেই দেখেন।

সরকারি অর্থায়নে দিঘায় পুরীর আদলে বিশাল ‘জগন্নাথ ধাম’ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির তৈরির ঘোষণা এবং গঙ্গাসাগর মেলার আমূল ভোলবদলও এই কৌশলের অংশ।

নির্বাচনী প্রচারের সময় মুখ্যমন্ত্রীর মন্দির দর্শনের ঘটা মানুষের নজরে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, নন্দীগ্রাম সফরের সময় মাত্র ২৮ ঘণ্টার মধ্যে ১৯টি মন্দির দর্শন ও পুজো দেওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চিত হয়েছিল।

ইমাম ভাতার পাল্টা হিসেবে পুরোহিতদের জন্য ভাতা চালু করা ছিল ‘নরম হিন্দুত্ব’-এর পথে এক বড় পদক্ষেপ।

অন্যদিকে, বিরোধী দল বিজেপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে সংখ্যালঘুদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে।

দাবি করা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাজ্যে মসজিদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ২৪,০০০ নতুন মসজিদ এই সময়ে তৈরি হয়েছে বলে বিতর্কিত পরিসংখ্যান সামনে আসে।

প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের ভাতা হিসেবে খরচ করা হয়েছে। এই বিষয়টি হিন্দু ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, যা বিজেপি তাঁদের ‘চরম হিন্দুত্ব’ প্রচারে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

তৃণমূলের এই ‘নরম হিন্দুত্ব’ কার্ড শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কট্টর হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী ভোটাররা মনে করেছেন, তৃণমূল কেবল ভোটের জন্য মন্দিরে যাচ্ছে। ফলে তাঁরা চরম হিন্দুত্বের টানে বিজেপির দিকেই ঝুঁকেছেন।

অতিরিক্ত মন্দির প্রীতি সংখ্যালঘুদের একটি বড় অংশ মনে করতে শুরু করেছে, তৃণমূল তাঁদের উপর থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে আইএসএফ বা বাম-কংগ্রেসের দিকে সরে গিয়েছে।

একটি সরকার যখন রাজনৈতিক প্রয়োজনে বারবার নিজের অবস্থান বদলায়, তখন তার গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। বন্যার মধ্যেও মহাকাল মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বলা বা হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষকেই সমানভাবে খুশি করতে গিয়ে তৃণমূল আসলে একটি ‘আদর্শিক ধোঁয়াশা’ তৈরি করেছে। এর ফলে কট্টর হিন্দু ভোট যেমন সংহত হয়নি, তেমনই মুসলিম ভোট ব্যাংকেও ভাঙন ধরেছে।

৮. সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব

তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম হয়েছিল রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ২০২৬ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সেই সংগঠনের ভিত আজ নড়বড়ে। দলের আদি লড়াকু মেজাজ এবং বর্তমানের ‘কর্পোরেট সংস্কৃতি’-র মধ্যে যে সংঘাত তৈরি হয়েছে, তা দলকে আজ খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ‘মমতা বনাম অভিষেক’ বা ‘পুরনো বনাম নতুন’-এর লড়াই জনসমক্ষে আসে বহুদিন আগেই।

তৃণমূলের শুরুতে ছিলেন তাঁরা, যাঁরা ট্যাক্সি-অটো ইউনিয়ন, লোকাল ক্লাব বা ছোটখাটো সংগঠনের মাধ্যমে মমতার সঙ্গে লড়াই করে উঠেছিলেন। বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বা জাভেদ খানের মতো নেতারা ছিলেন এই সংগঠনের পুরনো খুঁটি। তাঁদের কাছে রাজনীতি ছিল মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সভা-মিছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আইপ্যাক (I-PAC) এবং নিউ টাউনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পেইন রুম থেকে যখন রণকৌশল তৈরি হয়ে আসে, তখন ব্রাত্য হয়ে পড়েন সেই পুরনো কর্মীরা।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যখন ‘নতুন তৃণমূল’ গড়ার ডাক দেওয়া হলো, তখন থেকেই ফাটলটা স্পষ্ট হতে শুরু করে।

২০২২ সালে মমতা যখন দলের জাতীয় ও রাজ্য স্তরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ সাময়িকভাবে অবলুপ্ত করার ঘোষণা দিলেন, তখন পুরনো নেতাদের অনেকেই নিজেদের গুরুত্বহীন মনে করতে শুরু করেন। অভিষেককে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করার ফলে পুরনো ও প্রভাবশালী নেতাদের ক্ষমতা এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়।

জেলা স্তর থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত কর্মীদের মধ্যে এই অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রভাব পড়েছে সবথেকে বেশি।

জেলা সভাপতি বা সম্পাদকরা আগে নিজেরা বসে প্রার্থী বা কৌশল ঠিক করতেন। এখন হঠাৎ করে ওপরতলা থেকে প্রার্থীদের তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বলা হয়, ‘এটা আইপ্যাকের স্ট্র্যাটেজি’। এতে নিচুতলার কর্মীরা নিজেদের কেবল ‘ক্যাম্পেইন ফুটসোল্ডিয়ার’ বা আজ্ঞাবহ কর্মী হিসেবে মনে করছেন। তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কেউ দাম দিচ্ছে না বলে তাঁরা প্রচণ্ড অভিমানী।

একটি রাজনৈতিক দলের মূল শক্তি হলো তার ছাত্র, যুব এবং মহিলা সংগঠন। আগে এই সংগঠনগুলো নিয়মিত সভা করে নিজেদের দাবি-দাওয়া বা কর্মসূচি ঠিক করত। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে সবটাই হতে শুরু করে কর্পোরেট পরামর্শদাতার নির্দেশে। ফলে সংগঠনের স্বাভাবিক সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। যখনই কোনো কর্পোরেট টিম নির্বাচনী রোডম্যাপ আর স্লোগান বানিয়ে দেয়, তখন কর্মীরা নিজেদের কেবল একটি ‘যান্ত্রিক অংশ’ মনে করেন।

৯. অতিরিক্ত অভিষেক নির্ভরতা

তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি সবথেকে প্রভাবশালী নাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রার্থী নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রচারের ধরন—সবকিছুতেই তাঁর ছোঁয়া স্পষ্ট। সূত্রের খবর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ পছন্দে বা তাঁর দেওয়া তালিকায় থাকা ৭০টি আসনের প্রার্থীরা কেউই জিততে পারেননি।

লোকসভা এবং বিধানসভা—উভয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শে অনেক পুরনো নেতাকে সরিয়ে নতুন মুখ, তরুণ তুর্কিদের প্রার্থী করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ৬০-৭০টি আসন ছিল মূলত অভিষেকের ‘এক্সপেরিমেন্টাল জোন’ বা পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে মাটির রাজনীতির চেয়ে আইপ্যাকের দেওয়া ডেটা এবং আধুনিক কর্পোরেট স্ট্র্যাটেজিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

১০. সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক

তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের শাসনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল রাজ্যের প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট। বিগত নির্বাচনগুলিতে এই ভোট ব্যাঙ্কের সিংহভাগ একচেটিয়াভাবে তৃণমূলের ঝুলিতে পড়ত। কিন্তু ২০২৬ সালের রাজনৈতিক মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে, এই অভেদ্য দুর্গে ফাটল ধরেছে। একদিকে মুসলিম ভোটের মেরুকরণ এবং অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের ‘এসআইআর’ (SIR) প্রক্রিয়া—এই দুইয়ের জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়েছে শাসক দল।

এক সময় যে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংক ছিল তৃণমূলের একছত্র অধিকার, আজ তা বিভিন্ন কারণে দ্বিধাভক্ত। প্রায় ১০-১২ শতাংশ মুসলিম ভোট তৃণমূলের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে।

ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আইনি জটিলতা এবং তাতে রাজ্য সরকারের অবস্থান নিয়ে অনেক সাধারণ মুসলিম ভোটারের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মনে হয়েছে, সরকার তাঁদের অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট সক্রিয় নয়।

দল যখন ‘নরম হিন্দুত্ব’ নিয়ে মাতামাতি শুরু করল, তখন মুসলিম সমাজের একাংশ মনে করল যে তৃণমূল তাঁদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

মালদহ, মুর্শিদাবাদ বা উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু প্রধান জেলাগুলিতে ভোটাররা এখন তৃণমূলের বদলে আইএসএফ (ISF) বা অন্য রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। তাঁরা আর কেবল ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ হয়ে থাকতে রাজি নন।

১১. এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব

নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াও তৃণমূলের পরাজয়ের এক অন্যতম কারণ। এটি আসলে ভোটার তালিকার একটি বিশেষ শুদ্ধিকরণ অভিযান।

২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়ায় রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০-৯১ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, ভুয়ো পরিচয়পত্র কিংবা এলাকায় থাকেন না এমন মানুষের নাম রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, এই বাদ পড়া নামের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তৃণমূলের রণকৌশলে এই ভোটারদের একটি বড় ভূমিকা থাকত।

বিধানসভা কেন্দ্র আছে যেখানে বিজেপি যে ব্যবধানে জিতেছে তার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি ভোটারের নাম এসআইআর-এর ফলে বাদ পড়ে যায়, ফলে জেতা আসনের পুরো সমীকরণই পালটে যায়। তথ্য বলছে, মোট ৪৪ টি এরকম কেন্দ্র রয়েছে। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় ১০-১২ শতাংশ মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের সরে যাওয়া, তবে সেই আসন রক্ষা করা তৃণমূলের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

মালদহ বা মুর্শিদাবাদের মতো এলাকায়, যেখানে সংখ্যালঘু ভোট মার্জিন বাড়িয়ে দিত, সেখানে ভোটার সংখ্যা কমে যাওয়া এবং ভোট ভাগ হওয়ার কারণে তৃণমূলের বহু নিশ্চিত আসন এবার হাতছাড়া হয়েছে।

যে ১১টি কারণ উপরে আলোচনা করা হলো, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে—দুর্নীতি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বহীন করে তোলা তৃণমূলকে দুর্বল করে দিয়েছিল। মানুষের হকের টাকা লুঠ আর নারী নিরাপত্তা নিয়ে নেতৃত্বের সংবেদনহীনতা সাধারণ ভোটারের মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, বিভিন্ন ধরনের জনমোহিনী প্রকল্প দিয়ে তা ঢেকে রাখা সম্ভব হয়নি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।