রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের মেগা সমাবেশ: ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বার্তা ‘ইন্ডিয়া’র
INDIA bloc rally Delhi: ভোটার তালিকা সংশোধনে কোটি কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশ করল ‘ইন্ডিয়া’ জোট। রাহুল, মমতা ও অখিলেশ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ দাবি করে ‘ভোট বাঁচাও’ স্লোগান তোলেন।
দিল্লির রামলীলা ময়দানে রবিবার, ১ নভেম্বর, বড় সমাবেশ করল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন-এর নামে দেশের বহু যোগ্য নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন হচ্ছে। এই অভিযোগকে সামনে রেখেই ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগান তুলে রামলীলা ময়দানে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ।
কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ একাধিক বিরোধী নেতা একটি খোলা বাসে করে সমাবেশের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁরা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করেন। পরে মিন্টো রোড ও কনট প্লেসের সংযোগস্থল থেকে মিছিল করে রামলীলা ময়দানে পৌঁছন।
সমাবেশে তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি, কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন এবং হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখুও উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদের বক্তব্য, নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের একটি প্রক্রিয়া নয়, এটি দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকারই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তা হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই সমাবেশের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। বিরোধী জোটের অভিযোগ, প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জড়িত। তবে এই সংখ্যাটি বিরোধীদের অভিযোগ, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত চূড়ান্ত তথ্য নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
CEC Gyanesh Kumar resignation: ‘অঙ্গুলিমাল ডাকু, কেটেছিল ১৩ কোটি আঙুল!’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে শুরু হলো অভিনব প্রতিবাদ।
সমাবেশে প্রতীকী প্রতিবাদের ব্যবস্থাও ছিল। ভোট দেওয়ার পরে নাগরিকদের আঙুলে যে কালি লাগানো হয়, সেই আঙুলকেই প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী কাটা আঙুলের প্রতিরূপ হাতে নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত হন। তাঁদের বক্তব্যের মূল কথা ছিল, ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দেওয়া মানে কার্যত তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া। ভোট দেওয়ার অধিকার না থাকলে নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়।
এই সমাবেশের ঠিক আগের দিন, ৩১ অক্টোবর, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী ‘জনতার অভিশংসন’ কর্মসূচি পালন করে বিরোধী জোট। সংসদে অভিশংসনের প্রস্তাব আনার মতো করেই সেখানে একটি প্রতীকী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। খাড়গের বক্তব্য ছিল, এসআইআরের মাধ্যমে যোগ্য ভারতীয় নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সংবিধানবিরোধী এবং গুরুতর অপরাধ। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের রাজনৈতিক স্বার্থে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে বিজেপি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের অজান্তেই নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
রবিবারের সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো হয়। নজরদারির জন্য ড্রোনও ব্যবহার করা হয়। বিরোধীদের এই কর্মসূচির পাশাপাশি পশ্চিম দিল্লিতে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার স্মরণে পাল্টা মিছিলের আয়োজন করে বিজেপি। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সেই হিংসার দায় এবং বিচার না হওয়ার প্রশ্ন তুলে সরব হয় বিজেপি।
অন্যদিকে, বিজেপি বিরোধীদের এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে টেনে আনা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো নয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় থাকা ভুল, নকল এবং অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার জন্যই সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। যোগ্য নাগরিকদের নাম বাদ পড়লে তাঁরা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন।
এখন দেখার, এই আন্দোলনের ফলে নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে কোনো পরিবর্তন আসে কি না এবং বিরোধীদের দাবির ভিত্তিতে আগামী দিনে সরকার ও কমিশনের উপর কতটা রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।






