কলকাতায় সত্যিই বন্ধ গো-মাংস বিক্রি?

West Bengal Beef Sale: কলকাতায় সত্যিই বিফ বিক্রি বন্ধ হয়ে গিয়েছে? নাকি সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো দাবির সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই? পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংস বিক্রি নিয়ে বর্তমানে কী আইন কার্যকর রয়েছে? হোটেল-রেস্তোরাঁ ও মাংসের দোকানগুলিতে আসলে কী পরিস্থিতি?

Sangita Ghorai
৫ মিনিট
কলকাতায় সত্যিই বন্ধ গো-মাংস বিক্রি?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যে গো-মাংস বিক্রি ও খাওয়া নিয়ে নানা জল্পনা ছড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, কলকাতার হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে মাংসের দোকান, সর্বত্রই নাকি বিফ বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সত্যিই কি তাই?

পার্ক স্ট্রিট, মারকুইজ স্ট্রিট, পার্ক সার্কাস, বেকবাগান-সহ কলকাতার একাধিক এলাকায় হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং গো-মাংসের দোকানে ঘুরে যে তথ্য মিলেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বিফ বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে আগের তুলনায় সরবরাহ কমেছে এবং তার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতেও।

আসলে পশ্চিমবঙ্গে গো-মাংস বিক্রির উপর কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি। রাজ্য সরকার ১৯৫০ সালের পশ্চিমবঙ্গ প্রাণীসম্পদ সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। এই আইন বহু দশক ধরেই রয়েছে। ২০২৪ সালেও কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পর একই আইন কার্যকর করা হয়েছিল।

বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে গাফিলতি করা হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই আইনই কঠোরভাবে প্রয়োগ করছে।

আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সি গবাদি পশুকে জবাই করা যাবে না। এছাড়া কোনো পশু জবাইয়ের আগে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রাণীসম্পদ দফতরের অনুমতি প্রয়োজন। পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি কি না, অথবা সেটি অক্ষম বা প্রজননে অযোগ্য কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় শংসাপত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো আবেদন অকারণে খারিজ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাজ্য সরকারের কাছেও অভিযোগ জানাতে পারেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গোমাংস রপ্তানিকারকদের থেকেও ইলেক্টোরাল বন্ডে কোটি কোটি টাকা! কে নিল?

Beef Exporter Electoral Bond: বিজেপি মুখে গো-হত্যা বিষয়ক কড়া নীতির কথা যতই বলুক না কেন গোমাংস রপ্তানিকারকদের থেকে টাকা নিতে কিন্তু কোনও বাধা রাখেনি।

আইনে পশু বলতে গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর এবং মোষকে বোঝানো হয়েছে। পাশাপাশি মাংস ঢেকে বিক্রি করা এবং বাসি মাংস বিক্রি না করার মতো স্বাস্থ্যবিধিও কার্যকর করা হচ্ছে।

বাস্তব পরিস্থিতি জানতে পার্ক স্ট্রিট ও পার্ক সার্কাসের একাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় গিয়ে কথা বলল ইনস্ক্রিপ্ট। অলি পাবের হেড অ্যাকাউন্ট নারায়ণ চন্দ্র দাস জানান, বাজারে বিফ পাওয়া গেলে তাঁরা মেনুতেও রাখছেন। গত দু'সপ্তাহ মাংসের সরবরাহ না থাকায় বিফ পরিবেশন বন্ধ ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে এবং বিক্রিও আগের মতো হচ্ছে।

অন্যদিকে ছোট রেস্তোরাঁ ও রোল কাউন্টারগুলির চিত্র কিছুটা আলাদা। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর অনেকেই বিফ নিয়ে কথা বলতে চাননি। পরিচয় গোপন রেখে কিছু গো-মাংস বিক্রেতারা জানান, আগের তুলনায় সরবরাহ অনেক কমে গিয়েছে। এখন তাঁরা ১০ থেকে ১৫ কেজি করে মাংস এনে বিক্রি করছেন।

শহরের একাধিক গো-মাংসের দোকান বাইরে থেকে বন্ধ দেখা গেলেও ভিতরে আলো জ্বলতে দেখা গিয়েছে। কোথাও কোথাও ফাঁক দিয়ে মাংসের টুকরোও চোখে পড়েছে। প্রকাশ্যে গো-মাংস কাটার উপর কড়াকড়ির কারণেই এমন পরিস্থিতি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বেকবাগানের একটি ছোট হোটেলে বিফ আইটেমের খোঁজ করলে কর্মীরা জানান, সবই পাওয়া যাবে। কিন্তু কলকাতায় সরবরাহের অবস্থা জানতে চাওয়া মাত্রই তাঁরা আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি। কিছু দোকান আবার সরাসরি দাবি করেছে, তাদের কাছে এখন বিফ নেই।

এই পরিস্থিতিতে অনেক বিক্রেতারই দাবি, আইন নিয়ে বাড়তি নজরদারি এবং বিতর্কের আবহে তাঁরা প্রকাশ্যে ব্যবসা করতে অস্বস্তি বোধ করছেন। ফলে আগের তুলনায় বিক্রিও কমেছে।

বেকবাগানের এক বিরিয়ানি দোকানদার এমডি জাফার বলেন,

বিফ বিক্রি হচ্ছে। তবে আগের থেকে কম। মুসলিমরাও বিফ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে, কারণ এটা নিয়ে হিন্দু-মুসলিম হচ্ছে। হিন্দুরা যেহেতু ভগবান মনে করে গরুকে। তাই মুসলিমরা বলছে ঠিক আছে আমরা খাব না। কোরবানি ঈদে আমরা অন্য কিছু কোরবানি দিয়ে দেব।

ফলে কলকাতায় বিফ বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবি বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। তবে সরবরাহে ঘাটতি, প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং সামাজিক বিতর্কের জেরে ব্যবসায়ীদের একাংশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রভাব পড়েছে বাজারে এবং বিক্রিতেও।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এনসিইআরটি-র নতুন ইতিহাসের বই হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চাকে নতুন জায়গা করে দিচ্ছে?

NCERT Class 9 Book controversy: নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই 'আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি'-র 'রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স' অধ্যায়ে সপ্তম শতক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আরব, তুর্কি, মুঘল ও ইউরোপীয় আক্রমণের ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় উদ্দেশ্য ও হিন্দু রাজাদের দেবী-প্রদত্ত তলোয়ারের উল্লেখ রয়েছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাঠ-শিখ-রাজপুত-অহোম প্রতিরোধের বর্ণনা। হিন্দুত্ববাদী লেখক জে. সাই দীপকের 'মধ্যপ্রাচ্যের ঔপনিবেশিকতা'র ধারণা ও হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসবিদ মীনাক্ষী জৈনের গবেষণার ছায়ায়, এভাবেই তৈরি হচ্ছে নতুন সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার পরিসর।

‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচি থেকে কমিশন ঘেরাও, ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে ঠিক কী কী হলো?

INDIA Bloc Meeting: ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে কী আলোচনা হলো? মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে কী কী নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হলো? ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের পর সংসদ ও রাজপথে কী কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে? ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ আন্দোলনের মাধ্যমে কি আরও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী জোট?

ভুচিচের পদত্যাগ: সার্বিয়ায় জেন-জি নেতৃত্বে বদলাচ্ছে ক্ষমতার সমীকরণ?

Serbian protest against the government: সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে ছাত্র আন্দোলন। নোভি সাদ স্টেশন দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এবার নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রবেশ করেছে। ভুচিচ প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার চেষ্টা করছেন। ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ও প্রশ্ন সামনে আনছে।

‘গ্রাহক পঞ্চায়েত’-এর সভায় ছুরি কোথা থেকে এল?

SRFTI Kolkata clash: সমাজমাধ্যমে যে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে, তা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে—এক ব্যক্তি হঠাৎ পিছন থেকে এসে এক শিক্ষার্থীকে সজোরে লাথি মারছে। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেও পিছনের দেওয়ালে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি দেওয়া ব্যানারটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ঝুলছিল। অর্থাৎ, যে ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগকে সামনে এনে এত প্রচার চালানো হচ্ছে, তখনো পর্যন্ত সেই ব্যানারে কোনো আঁচড়ও পড়েনি।

চার-পাঁচ বছর নিয়েছিল তৃণমূল, বিজেপি মাত্র চারমাস

SRFTI incident: গোটা দেশে যখন মানুষের বিজেপির প্রতি মোহভঙ্গ ঘটতে শুরু করেছে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এল। অথচ একসময় গর্বের সঙ্গে বলা হতো—“হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো।” আজ তা যেন উল্টে গিয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রভাবেই বদলে গিয়েছিল ভোটের অঙ্ক?

West Bengal SIR and Election Results: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ২১৫ থেকে ৮০ আসনে নেমে যাওয়া এবং বিজেপির ২০৭ আসনে জয়—এই ফলের সঙ্গে SIR-এর প্রভাব কতটা?

প্রযুক্তির যুগেও কেন জরুরি বিজ্ঞানমনস্কতা, দাভোলকার যে প্রশ্ন তুলে দেয়

Narendra Dabholkar: নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ১৩ বছর পরেও কেন প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ? কুসংস্কার, ভুয়ো তথ্য ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে কীভাবে গড়ে উঠবে মানবিক, যুক্তিনির্ভর সমাজ?

মাতঙ্গিনী হাজরা ও তমলুকের বিদ্রোহ: এক বৃদ্ধার মৃত্যু যেভাবে বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের গতিপথ

Matangini Hazra death: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪২। তমলুক শহরের দিকে পাঁচ দিক থেকে ধেয়ে এল জনতার উত্তাল মিছিল। সরকারি দপ্তর ঘিরে ফেলতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষের এক বিরাট বাহিনী এগিয়ে আসছিল শহরের উত্তর দিক থেকে—ফৌজদারি আদালতের পথ ধরে। আর সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন প্রায় বাহাত্তর বছর বয়সি মাতঙ্গিনী হাজরা।