আমিও তো হিন্দু, তবু কেন টার্গেট? যাদবপুরে ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একা মায়ের

রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও, নতুন বিজেপি সরকারকে সরাসরি দায়ী করছেন না তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ আরও জটিল। তাঁর দাবি, এলাকায় যাঁরা আগে তৃণমূল করতেন এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, তাঁরাই পরিকল্পনা করে এই হামলা করেছেন।

Sangita Ghorai
২ মিনিট
আমিও তো হিন্দু, তবু কেন টার্গেট? যাদবপুরে ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একা মায়ের

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের সামনে ছোট্ট চাইনিজ খাবারের দোকানটা শুধু ব্যবসার জায়গা ছিল না। সেটাই ছিল মধুমিতা মিস্ত্রির জীবন, লড়াই, স্বপ্ন আর দুই সন্তানকে বড় করে তোলার একমাত্র ভরসা। ভোটের ফল প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই সেই দোকান ভাঙচুর ও লুট হয়ে যাওয়ার পরে এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে একা মা— মহিলা বলেই দুর্বল ভেবে ভাঙা হলো তাঁর দোকান?

ঘটনার দু’দিন পরও লন্ডভন্ড অবস্থায় পড়ে রয়েছে মধুমিতার দোকানের ধ্বংসাবশেষ। চায়ের কাপ, ময়দা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মধুমিতার গলায় বারবার ফিরে এসেছে ক্ষোভ, অপমান, আবার একই সঙ্গে অদ্ভুত এক জেদ। তিনি স্পষ্ট বলছেন,

আমাকে পঙ্গু করে দিলেও আমি আবার উঠে দাঁড়াব।

৮ তারিখে তিনি বাড়িতে ছিলেন। ঠাকুর পুজো সেরে রান্না করে সবে বসেছেন। ঠিক তখনই ভাইয়ের ফোন। স্থানীয় আরেক দোকানদার তাঁর ভাইকে জানান, মধুমিতার দোকানে ভাঙচুর হয়েছে। খবর পেয়ে ছুটে যান তিনি। গিয়ে দেখেন, দোকানের জিনিসপত্র তছনছ।

মধুমিতা জানান, প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পরে নতুন করে দোকান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। গলায় টিউমার হয়েছিল। চোখের নিচেও টিউমার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকের কড়া নির্দেশ ছিল আগুনের পাশে না দাঁড়ানোর। সেই কারণেই দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ ছিল।

তবু থামেননি। একটু একটু করে আবার জিনিসপত্র কিনছিলেন। আটা, ময়দা, প্রয়োজনীয় সামগ্রী— সব নতুন করে তুলছিলেন দোকানে। কারণ, আবার শুরু করবেন। কিন্তু সেই শুরুর আগেই সব ভেঙে গেল।

মধুমিতা বলছেন,

আমি অসুস্থ ছিলাম বলে দোকান বন্ধ ছিল। ভোটের জন্য বন্ধ ছিল না। আবার মাল তুলছিলাম। আর তখনই এই ঘটনা।

রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও, নতুন বিজেপি সরকারকে সরাসরি দায়ী করছেন না তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ আরও জটিল। তাঁর দাবি, এলাকায় যাঁরা আগে তৃণমূল করতেন এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, তাঁরাই পরিকল্পনা করে এই হামলা করেছেন।

আমিও তো হিন্দু, তাহলে আমার দোকান কেন ভাঙবে? এটা চক্রান্ত

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বারবার রহস্যমৃত্যু, শুভেন্দুর ছায়াসঙ্গীরাই কেন?

সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে হত্যা করা হলো। কিন্তু এই প্রথম নয়, ২০১৩ থেকে ২০২৬—এই ১৩ বছরে শুভেন্দুর চারজন বিশ্বস্ত সেনাপতি সন্দেহজনকভাবে মারা যান।

বলছেন তিনি।

ওরা দেখাতে চাইছে নতুন সরকার এসে এসব করছে। যারা প্রথম থেকে রাজনীতি করেছে, তারা কোনও মেয়ের দোকানে এমন করবে না।

মধুমিতার কথায় উঠে এসেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও। তিনি লুকোননি যে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভালোবাসেন। এখনও ভালোবাসেন। সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূলের হয়ে পোস্টও করতেন, ভিডিও বানাতেন, মতামত লিখতেন। আর সেই কারণেই কি তাঁর দোকান টার্গেট করা হল? প্রশ্নটা এখন তাঁর নিজেরও। তিনি বলছেন,

এখানে তো সবাই তৃণমূলের মিছিলে যেত। সবাই মিটিং করত। তা হলে শুধু আমার দোকানটাই কেন ভাঙা হল?

এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই। তবে ভয়ও নেই।

বরং কথার মধ্যে বারবার ফিরে আসে একা হাতে সংসার সামলানোর ইতিহাস। স্বামী মারা গিয়েছেন প্রায় ন’ বছর আগে। তারপর থেকেই সন্তানদের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। রাত করে দোকান সামলে বাড়ি ফিরে রান্না করেছেন। ছেলে-মেয়েকে পড়িয়েছেন। ছেলেকে বি.কম অনার্স, মেয়েকে দর্শনে অনার্স করিয়েছেন।

আমি দোকান করে ছেলেমেয়েকে বড় করেছি

ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথোপকথনে বলেন মধুমিতা।

ব্যবসা শুরু করার জন্য পুঁজি সঞ্চয় করতে তাজ হোটেলে সার্ভিস বিভাগে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন বলরাম মল্লিক, কস্তুরী, পোপায়া-সহ একাধিক পরিচিত প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, রান্না তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, ভালবাসা।

কথা বলতে বলতে আরও একাধিক অভিযোগ সামনে আনেন মধুমিতা। তাঁর দাবি, এর আগেও দোকান ভাঙা হয়েছে। এমনকী জল সরবরাহ বন্ধ করার চেষ্টাও হয়েছিল। পাশের কয়েক জন দোকানদার নাকি জল দেওয়া বন্ধ করতে চাপ দিয়েছিলেন।

কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক ঘেরাটোপে আটকে দেখতে চান না। মুসলিমদের দোকান ভাঙার প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর জবাব,

সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা সবাই মানুষ। আর সব মানুষের রক্তই লাল।

নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ।

এখন উনিও আমার মুখ্যমন্ত্রী

বলেন তিনি।

ভয় করছে? এই প্রশ্নে মধুমিতা হেসে বলেন,

মধুমিতা কাউকে ভয় করে না।

তাঁর দোকান ভাঙা হয়েছে। মালপত্র লুট হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে আবার শুরু করতে হবে শূন্য থেকে। কিন্তু তাঁর গলায় পরাজয়ের সুর নেই। বরং আছে সেই একটাই কথা—

আমি আবার ঘুরে দাঁড়াব।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

তিন বছরেও থামেনি, মণিপুরে ফের যেভাবে বাড়ছে সহিংসতা

Manipur Violence 2026: গত ২৬ সেপ্টেম্বর সেনাপতি জেলায় দুই নাগা নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা সামনে আসে। তার দু'দিন আগে কামজং জেলার পিলং এলাকায় পৃথক হামলায় চার জন টাংখুল নাগা নাগরিক নিহত হন। এই পরিস্থিতিতে নাগা সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) চার মাস ধরে চলা জাতীয় সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করলেও রাজ্যে হিংসা থামার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

নাৎসি জার্মানি থেকে FTII–SRFTI: ফিল্ম স্কুল কেন ক্ষমতার চোখে এত গুরুত্বপূর্ণ?

History of Film school's against Fasicsm: ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা ভাঙচুর করেছিল বার্লিনের ফিল্ম স্কুল টনফিল্মশুলে। ১৯৩৫ সালে মুসোলিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন ইতালির ফিল্ম স্কুল সিএসসি। ২০১৫ সালে ভারতে পুনের এফটিআইআইতে মোদী সরকারের নিয়োগ বিষয়ক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৩৯ দিনের ধর্মঘট হয়েছিল। ২০২৬-এ কলকাতার এসআরএফটিআইতে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ইট-পাথরের হামলা সেই ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্ত করল। হামলার পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য আজও একই, স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিয়ন্ত্রণ করা। যদিও ইতিহাস বলে, ফিল্ম স্কুল কেবল একটি ভবন নয়, একটি ধারণা, একটি মতাদর্শিক বলয়।

জেলের ৭১৬ দিন: কী পড়তেন, কী ভাবতেন, কীভাবে লড়তেন ভগৎ সিং?

Bhagat Singh jail life: জেলখানায় ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিল বই। দ্বারকাদাস লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান শাস্ত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জেলের ভিতর বই পাচার করতেন। এই ৭১৬ দিনে তিনি প্রায় ৩০০-র বেশি বই পড়েছেন ভগৎ সিংহ।

বাম বসন্ত ফিরবে বার্লিনে? শতাব্দীর সংগ্রাম শেষে আবার নতুন ভোর

Left-Wing Resurgence in Hitler’s Berlin: হিটলারের বার্লিনে ফিরছে বামপন্থা। তরুণরা সংক্রমিত। ইতিহাসের এই বিদ্রূপ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন দুঃস্বপ্নের নগরীতে।

চশমা যখন টেকসঙ্গী, কীভাবে কাজ করে এআই গ্লাস?

Meta AI Glasses: চশমা ব্যক্তিগত এআই সহকারী। চোখের ইশারা ও মৌখিক নির্দেশে কল, ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ডিং থেকে গুগল সার্চ—সবই যখন সম্ভব, তখন এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে? আর ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও এআই-নির্ভর এই চশমা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখবে?

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

SRFTI: কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে?

SRFTI Clash: SRFTI-তে ডানপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে কেন আপত্তি জানালেন পড়ুয়ারা? বক্তৃতায় কী বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা? কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে? পড়ুয়া ও আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আসল ঘটনা কী?

যে নির্বাচন কমিশনার ভোট চুরি আটকেছিলেন

Election reforms of T. N. Seshan: ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসেছিলেন যে ব্যক্তি, সেই টি. এন. শেষন বলেছিলেন, 'আমাকে এই পদে বসাবেন না, আমি আপনাদের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াব।'