আমিও তো হিন্দু, তবু কেন টার্গেট? যাদবপুরে ভাঙা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একা মায়ের
রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও, নতুন বিজেপি সরকারকে সরাসরি দায়ী করছেন না তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ আরও জটিল। তাঁর দাবি, এলাকায় যাঁরা আগে তৃণমূল করতেন এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, তাঁরাই পরিকল্পনা করে এই হামলা করেছেন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের সামনে ছোট্ট চাইনিজ খাবারের দোকানটা শুধু ব্যবসার জায়গা ছিল না। সেটাই ছিল মধুমিতা মিস্ত্রির জীবন, লড়াই, স্বপ্ন আর দুই সন্তানকে বড় করে তোলার একমাত্র ভরসা। ভোটের ফল প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই সেই দোকান ভাঙচুর ও লুট হয়ে যাওয়ার পরে এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে একা মা— মহিলা বলেই দুর্বল ভেবে ভাঙা হলো তাঁর দোকান?
ঘটনার দু’দিন পরও লন্ডভন্ড অবস্থায় পড়ে রয়েছে মধুমিতার দোকানের ধ্বংসাবশেষ। চায়ের কাপ, ময়দা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মধুমিতার গলায় বারবার ফিরে এসেছে ক্ষোভ, অপমান, আবার একই সঙ্গে অদ্ভুত এক জেদ। তিনি স্পষ্ট বলছেন,
আমাকে পঙ্গু করে দিলেও আমি আবার উঠে দাঁড়াব।
৮ তারিখে তিনি বাড়িতে ছিলেন। ঠাকুর পুজো সেরে রান্না করে সবে বসেছেন। ঠিক তখনই ভাইয়ের ফোন। স্থানীয় আরেক দোকানদার তাঁর ভাইকে জানান, মধুমিতার দোকানে ভাঙচুর হয়েছে। খবর পেয়ে ছুটে যান তিনি। গিয়ে দেখেন, দোকানের জিনিসপত্র তছনছ।
মধুমিতা জানান, প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পরে নতুন করে দোকান খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। গলায় টিউমার হয়েছিল। চোখের নিচেও টিউমার ধরা পড়েছে। চিকিৎসকের কড়া নির্দেশ ছিল আগুনের পাশে না দাঁড়ানোর। সেই কারণেই দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ ছিল।
তবু থামেননি। একটু একটু করে আবার জিনিসপত্র কিনছিলেন। আটা, ময়দা, প্রয়োজনীয় সামগ্রী— সব নতুন করে তুলছিলেন দোকানে। কারণ, আবার শুরু করবেন। কিন্তু সেই শুরুর আগেই সব ভেঙে গেল।
মধুমিতা বলছেন,
আমি অসুস্থ ছিলাম বলে দোকান বন্ধ ছিল। ভোটের জন্য বন্ধ ছিল না। আবার মাল তুলছিলাম। আর তখনই এই ঘটনা।
রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে এলাকায় উত্তেজনা থাকলেও, নতুন বিজেপি সরকারকে সরাসরি দায়ী করছেন না তিনি। বরং তাঁর অভিযোগ আরও জটিল। তাঁর দাবি, এলাকায় যাঁরা আগে তৃণমূল করতেন এবং এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন, তাঁরাই পরিকল্পনা করে এই হামলা করেছেন।
আমিও তো হিন্দু, তাহলে আমার দোকান কেন ভাঙবে? এটা চক্রান্ত
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে হত্যা করা হলো। কিন্তু এই প্রথম নয়, ২০১৩ থেকে ২০২৬—এই ১৩ বছরে শুভেন্দুর চারজন বিশ্বস্ত সেনাপতি সন্দেহজনকভাবে মারা যান।
বলছেন তিনি।
ওরা দেখাতে চাইছে নতুন সরকার এসে এসব করছে। যারা প্রথম থেকে রাজনীতি করেছে, তারা কোনও মেয়ের দোকানে এমন করবে না।
মধুমিতার কথায় উঠে এসেছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও। তিনি লুকোননি যে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভালোবাসেন। এখনও ভালোবাসেন। সামাজিক মাধ্যমে তৃণমূলের হয়ে পোস্টও করতেন, ভিডিও বানাতেন, মতামত লিখতেন। আর সেই কারণেই কি তাঁর দোকান টার্গেট করা হল? প্রশ্নটা এখন তাঁর নিজেরও। তিনি বলছেন,
এখানে তো সবাই তৃণমূলের মিছিলে যেত। সবাই মিটিং করত। তা হলে শুধু আমার দোকানটাই কেন ভাঙা হল?
এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই। তবে ভয়ও নেই।
বরং কথার মধ্যে বারবার ফিরে আসে একা হাতে সংসার সামলানোর ইতিহাস। স্বামী মারা গিয়েছেন প্রায় ন’ বছর আগে। তারপর থেকেই সন্তানদের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। রাত করে দোকান সামলে বাড়ি ফিরে রান্না করেছেন। ছেলে-মেয়েকে পড়িয়েছেন। ছেলেকে বি.কম অনার্স, মেয়েকে দর্শনে অনার্স করিয়েছেন।
আমি দোকান করে ছেলেমেয়েকে বড় করেছি
ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথোপকথনে বলেন মধুমিতা।
ব্যবসা শুরু করার জন্য পুঁজি সঞ্চয় করতে তাজ হোটেলে সার্ভিস বিভাগে কাজ করেছেন। কাজ করেছেন বলরাম মল্লিক, কস্তুরী, পোপায়া-সহ একাধিক পরিচিত প্রতিষ্ঠানে। তিনি বলেন, রান্না তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, ভালবাসা।
কথা বলতে বলতে আরও একাধিক অভিযোগ সামনে আনেন মধুমিতা। তাঁর দাবি, এর আগেও দোকান ভাঙা হয়েছে। এমনকী জল সরবরাহ বন্ধ করার চেষ্টাও হয়েছিল। পাশের কয়েক জন দোকানদার নাকি জল দেওয়া বন্ধ করতে চাপ দিয়েছিলেন।
কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক ঘেরাটোপে আটকে দেখতে চান না। মুসলিমদের দোকান ভাঙার প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর জবাব,
সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা সবাই মানুষ। আর সব মানুষের রক্তই লাল।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
এখন উনিও আমার মুখ্যমন্ত্রী
বলেন তিনি।
ভয় করছে? এই প্রশ্নে মধুমিতা হেসে বলেন,
মধুমিতা কাউকে ভয় করে না।
তাঁর দোকান ভাঙা হয়েছে। মালপত্র লুট হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে আবার শুরু করতে হবে শূন্য থেকে। কিন্তু তাঁর গলায় পরাজয়ের সুর নেই। বরং আছে সেই একটাই কথা—
আমি আবার ঘুরে দাঁড়াব।








