১৩ দিন ধরে অনশনে পড়ুয়ারা, কী হচ্ছে জামিয়ায়?
Jamia Millia Islamia protest: ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে পড়ুয়াদের অনশন ও উত্তেজনার জেরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় ক্লাস অনলাইনে সরিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাসের অচলাবস্থা কি আদৌ কাটবে, নাকি প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে?
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করার দাবিতে আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। টানা ১৩ দিন ধরে অনশন করছেন পাঁচ পড়ুয়া। এই পরিস্থিতিতে ২৪ অক্টোবর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্ত পাঠক্রমের ক্লাস অনলাইনে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অনলাইনেই ক্লাস চলবে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত। তবে আন্দোলনরত পড়ুয়াদের অভিযোগ, ছাত্রদের প্রতিবাদ থামাতেই প্রশাসন নানা পদক্ষেপ করছে।
এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচন। পড়ুয়াদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ফিরিয়ে আনতে হবে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য প্রক্টর ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পঠনপাঠন ফিরিয়ে আনতে আন্দোলনকারীদের নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলে যেতে হবে এবং বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে হবে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো সমাধান মেলেনি।
কেন আন্দোলনে নেমেছেন পড়ুয়ারা?
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া দেশের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই সেখানে ছাত্র সংসদের নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। ২০০৬ সালে ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর থেকে আর নির্বাচন হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের নিজস্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিই এবারের আন্দোলনের প্রধান কারণ।
ছাত্র সংসদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের বিভিন্ন সমস্যা প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। পড়াশোনার পরিবেশ, আবাসন, গ্রন্থাগার, পরীক্ষার ব্যবস্থা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পড়ুয়াদের হয়ে কথা বলতে পারেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় পড়ুয়াদের সম্মিলিত দাবি জানানোর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে পাঁচ পড়ুয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করতে হবে। শুধু একটি কমিটি গঠন করে নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনা করার আশ্বাস দিলে চলবে না। কবে নির্বাচন হবে, তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে প্রশাসনকে।
অনশনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
আন্দোলন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক আন্দোলনকারী পড়ুয়াকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। আরও দু’জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং এক বছরের জন্য তাঁদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে আরও পড়ুয়া আন্দোলনে যোগ দেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Student Protest India: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ছাত্র-যুবদের ভূমিকা কখনো প্রান্তিক ছিল না। স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ সামনের সারিতে থেকেছে। স্বাধীনতার পরেও খাদ্য আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ কিংবা শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের দাবিতে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১৭ অক্টোবর বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী আন্দোলনস্থলে ঢুকে অনশনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তাঁদের হেনস্থা করেন। ছাত্র সংগঠনগুলির দাবি, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বন্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
২৪ অক্টোবর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বৈঠকের পর প্রতিবাদস্থল থেকে তাঁবু সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন পড়ুয়ারা। অনশনরত ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও আনা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, তাঁদের অবস্থানস্থল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হয় এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের উপর বলপ্রয়োগ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অবশ্য আলাদা। প্রশাসনের দাবি, আন্দোলনকারীরা নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের পরিবর্তে অন্য জায়গায় অবস্থান করছিলেন। তাঁদের সেখান থেকে সরে যেতে বলা হলেও তাঁরা রাজি হননি। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলাকালীন কয়েকজন পড়ুয়া নিরাপত্তাকর্মী ও শিক্ষকদের ধাক্কা দেন। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ তৈরি হয়েছে।
ছাত্র সংসদ ফেরাতে কমিটি, কিন্তু কাটছে না অচলাবস্থা
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি, ২১ অক্টোবর ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরির জন্য পাঁচ সদস্যের অধ্যাপক কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। ছাত্র সংসদ কীভাবে পরিচালিত হবে, অতীতে কেন তা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশ ও লিংডোহ কমিটির সুপারিশ কীভাবে কার্যকর করা যায়, সেগুলি খতিয়ে দেখার কথা এই কমিটির।
কিন্তু এই উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরির জন্য আরেকটি কমিটি গঠন করা আসলে নির্বাচনের দাবি পিছিয়ে দেওয়ার কৌশল। এই কমিটিতে ছাত্রছাত্রীদের কোনও প্রতিনিধি না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মহতাব আলম রিজভি জানিয়েছেন, গঠনতন্ত্র তৈরির কাজ যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, নির্বাচনও তত দ্রুত করা সম্ভব হবে। তাঁর দাবি, বৈঠকে পড়ুয়ারা এই প্রক্রিয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করেছেন, নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অনশন প্রত্যাহারের প্রশ্ন নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যুক্তি, অতীতে ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ, শিক্ষকদের উপর হামলা এবং ক্লাসে বিঘ্ন ঘটার কারণে নির্বাচন বন্ধ করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই নির্বাচন ফেরানোর আগে প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন ও গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করতে চাইছে প্রশাসন।
অনলাইনে ক্লাস, উত্তেজনা ক্যাম্পাসে
শনিবারের সংঘাতের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্ত পাঠক্রমের ক্লাস অনলাইনে করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বার ও গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পড়ুয়াদের অনলাইন ক্লাসের সময়সূচি মেনে চলতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে না আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কাছে এই সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা ও পঠনপাঠন সচল রাখার ব্যবস্থা। কিন্তু আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, এর ফলে ছাত্রছাত্রীদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ কমবে এবং আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়বে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম চালু রাখা সম্ভব হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ, শিক্ষক-ছাত্রের সরাসরি যোগাযোগ এবং ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিসর কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাসের দেওয়ালে ‘ফ্রি কাশ্মীর’ লেখা একটি স্লোগানকে কেন্দ্র করে। আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা দাবি করেছেন, এই লেখার সঙ্গে অনশনরত ছাত্রদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলেই কারা এই স্লোগান লিখেছে, তা খুঁজে বের করা সম্ভব। এই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জামিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি, অন্যদিকে প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার যুক্তি—এই দুইয়ের সংঘাতেই ক্রমশ জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি। পাঁচ পড়ুয়ার অনশন অব্যাহত, নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনও ঘোষিত হয়নি এবং ক্যাম্পাসের ক্লাস চলছে অনলাইনে।
জামিয়ার অচলাবস্থা কাটবে কি না, তা নির্ভর করছে আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষ কতটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে পারে তার উপর।







