বিহারের রাজনীতির নতুন অবতার প্রশান্ত কিশোর! যে সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে জন সুরজ যাত্রা
Jan Suraj Yatra: এবার বিহারি রাজনীতির আঙিনায় উঠে আসছে প্রশান্ত কিশোরের নাম! কেন?

দুর্নীতিমুক্ত দেশ চাই! স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বিপ্লবের আঁচেই সাতের দশকে এই স্লোগানেই পথ দেখিয়েছিল বিহার। গান্ধীপন্থী জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে উত্তাল হয়েছিল গোবলয়ের অন্যতম এই রাজ্য। পাটনার গান্ধী ময়দান থেকে দিল্লির রামলীলা। সরব হয়েছিল এক বিরাট সংখ্যক বিহারি! ছাত্র আন্দোলন, অনশন, মিছিল, যাত্রার সেই ইতিহাস জরুরি অবস্থায় এসে ব্যর্থ হলেও বিহার সেদিনই দেখিয়েছিল তার তকত!
দিন বদলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে 'পাল্টিবাজ' নীতিশ কুমার। 'দুর্নীতিবাজ জেলবন্দি' লালুপ্রসাদ যাদবের মতো নেতায় ঘিরেছে জয়প্রকাশের রাজ্য। দলাদলি আর সন্ত্রাসে বিপ্লবের বিহার অচিরেই হয়েছে জঙ্গল-রাজত্ব! অভিযোগ উঠেছে ঢের! কিন্তু...
ফের কি বদলাচ্ছে বিহার? এই প্রশ্নের টানাপড়েনে আবারও শিরোনামে উঠে এসেছেন ভোটকুশলী বিহারিবাবু প্রশান্ত কিশোর। ফের নিজের রাজ্যে প্রভাব বাড়াচ্ছেন তিনি। এবার বিহারি রাজনীতির আঙিনায় উঠে আসছে কর্পোরেট বুদ্ধির এই মহীরুহের নাম! কেন?
জন সুরজ যাত্রা
২০২২ সাল! ২ অক্টোবর! মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত, পশ্চিম চম্পারণের গান্ধী আশ্রম থেকে যাত্রা শুরু করলেন প্রশান্ত। নাম দিলেন, জন সুরজ যাত্রা। নিজের তৈরি দলের নামেই এই যাত্রার নাম। যার লক্ষ্য আগামী এক বছরের বেশি সময় ধরে বিহারের কোণায় কোণায় যাওয়া এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করা রাজ্যের মূল সমস্যা। আসলে এই যাত্রার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক কৌশলে, নতুন নেতার পরিচিতি বাড়ানোই আসল লক্ষ্য, বলা হচ্ছে এমনও!
কী হচ্ছে এই যাত্রায়
বিহারের পশ্চিম চম্পারণ জেলা থেকে শুরু হয়েছে এই পদযাত্রা। যা প্রায় ৩৫০০ কিলোমিটার এলাকা পরিদর্শন করবে মিছিল। সমগ্র বিহারের প্রত্যন্ত এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে যাবে এই যাত্রা।
প্রশান্ত কিশোরের ভূমিকা
মূলত, এই যাত্রার প্রধান মুখ প্রশান্ত কিশোর। তিনিই বিহারের বিভিন্ন এলাকায় পদযাত্রার মাধ্যমে জনসংযোগ করবেন। জায়গায় জায়গায় সেই মোতাবেক ভাষণ দিচ্ছেন বিহারের এই নতুন নেতা। প্রত্যেক ২-৩ কিলোমিটার পথ যাওয়ার পরেই মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন প্রশান্ত।
কী কী ব্যবস্থা রয়েছে
প্রশান্ত কিশোরের সৃষ্ট সংস্থা আইপ্যাক, যা সম্প্রতি ছেড়েছেন তিনি। তাদের তত্ত্বাবধানেই চলছে পুরোটা। জনতার সঙ্গে সংযোগ থেকে, মানুষের মন বোঝা, সব করছেন ওই টিমের সদস্যরা। নির্দিষ্ট স্থান, যেখানে মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন প্রশান্ত। ঠিক সেখানেই আগে থেকে তাঁবুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। থাকছে শৌচাগার থেকে শুরু করে যাবতীয় আয়োজন। পথসভার ব্যবস্থা।
এই যাত্রার উদ্দেশ্য
প্রশান্ত কিশোরের মতে, মানুষের আসল সমস্যা। অনুন্নত বিহারের ভালো না থাকার কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বিহারের ছেলে ঘুরে দেখছেন কেমন আছেন তাঁর রাজ্যের মানুষ। যাঁরা নীতিশ কুমার, লালুপ্রসাদের আমলে কোনও উপকার পাননি বলে অভিযোগ। সেই সমস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এই যাত্রা, দাবি করা হচ্ছে এমনই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
TMC inner conflict: রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে প্রাধান্য দিয়ে তৃণমূলের দুই দশকে মুখ, চরিত্রের (রাজনৈতিক) পরিবর্তন হয়েছে বারবার।
বিরোধীদের অভিযোগ
প্রশান্ত-বিরোধীরা বলছেন, নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই এমন করছেন তিনি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, এলাহি আয়োজন করে এই পদযাত্রা করা হচ্ছে। খানিকটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ঢঙে। আবার কংগ্রেসের অভিযোগ, প্রশান্ত যে যাত্রা করছেন তা রাহুল গান্ধীর অর্থাৎ কংগ্রেসের 'ভারত জোড়ো যাত্রা'-র সমসাময়িক হচ্ছে ইচ্ছা করেই। যাতে বিরোধী ঐক্যে ফাটল দেখানো যায়। বিজেপি-র সুবিধা হয়।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
প্রধানত, নরেন্দ্র মোদি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২২ এর আগে পর্যন্ত দেশের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক নেতা, রাজনৈতিক দলের জন্য, তাঁদের নির্বাচনে জয়ের জন্য কৌশলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন প্রশান্ত কিশোর। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং তার আগে মোদীর জন্য গুজরাতের বিধানসভা নির্বাচন। সব ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন কিশোর নিজেও। নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা খুলে উত্তর থেকে দক্ষিণ। এমনকি বিহারের একটি নির্বাচনে তেজস্বী যাদবের দলকেও সাহায্য করেছেন তিনি। রাজনীতিক কারবারিদের একাংশের মতে, এই সমস্ত দিক বিবেচনা করে বলা হয়, প্রশান্ত কিশোর আঁটঘাট বেঁধেই এবার মাঠে নেমেছেন। অর্থাৎ বিহারি রাজনৈতিক আবহে, একাধিক নেতার দল পরিবর্তন। অনুন্নয়নের অভিযোগ আর বিহারি-বঞ্চনার অতলে নিজেকে নিমজ্জিত করছেন সুকৌশলে!
প্রসঙ্গত, প্রশান্ত কিশোরের জন সুরজ যাত্রা শুরু হয়েছে গান্ধী নামাঙ্কিত আশ্রম থেকে। আবার এর নামের সঙ্গে খানিকটা মিল রয়েছে বিহার-পুত্র জয়প্রকাশ নারায়নের আন্দোলনের। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে, শুধু যাত্রার নাম নয় তার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছেন প্রশান্ত। যেখানে তাড়াতাড়ি নয়, ধীরে ধীরেই নিজের জায়গা পাকা করতে চাইছেন তিনি।
জনমানসে সাড়া
বিহার শুধু নয়, দেশজুড়ে প্রশান্ত কিশোর একটা বড় অংশের মধ্যে জনপ্রিয়। তাঁর এই যাত্রা এবং বক্তব্য শুনে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন অংশের মানুষও। সংবাদসংস্থা দ্য প্রিন্ট-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যাত্রায় কর্ণাটক থেকে এসেছেন এক ব্যক্তি। তাঁর কথায়, ''প্রশান্ত কিশোর কে আমি চিনতাম না, কিন্তু তাঁর কথা শুনেই এসেছি।'' আবার প্রাক্তন সেনাকর্মী জয়প্রকাশ। তিনিও যোগ দিয়েছেন এই যাত্রায়। তাঁর কথায়, ''আমি তাঁর নীতিতে সহমত। তিনি যা করতে চাইছেন বা বলছেন সেটা আমিও চাইছি।'' রাজস্থানের একটি সমাজসেবী সংস্থার অন্যতম সদস্য বিবেক কুমার। তিনিও এসেছেন এই যাত্রায় যোগ দিতে। তাঁর কথায়, "এই যাত্রা দেশের আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বের।''
প্রশান্ত লড়ছেন। এগিয়ে চলেছেন। তার সঙ্গেই তিনি বারবার বলছেন, ''আমার সঙ্গে মাত্র ১-৩ কিলোমিটার হাঁটুন, আর আমাকে আশীর্বাদ করুন।'' বরাবরই প্রযুক্তিগত দিক থেকে এগিয়ে থাকা তাঁর প্রাক্তন সংস্থা 'পিকে কানেক্ট' নামের একটি অ্যাপ চালু করেছে। যে অ্যাপ এই যাত্রার সামগ্রিক খবর, আপডেট দিচ্ছে ডিজিটাল বিহারকে। এর মধ্যে দিয়ে মাত্র ১২ দিনেই জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েছে জন সুরজ যাত্রার। বিশেষত, বিহারের একটা বড় অংশের যুবসমাজ এই যাত্রায় হাঁটছেন বলে দাবি করেছে প্রশান্ত কিশোরের দল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশান্ত কিশোর
বিহারের একটি বিধানসভা নির্বাচনে নীতিশ কুমারের বিপুল জয়ে প্রশান্ত কিশোরের ভূমিকা, নরেন্দ্র মোদীকে লোকসভা নির্বাচনে জেতানোর থেকেও বেশি গুরুত্ব পায়। নীতিশের উপদেষ্টা, পরে জেডিইউয়ের নেতা নির্বাচিত হন ভোটকুশলী। পা দেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির আঙিনায়। বেশিদিন সুখের হয়নি সেই পর্ব। নীতিশের সঙ্গে মতবিরোধ চরমে উঠলে দল ছাড়েন প্রশান্ত। ফের নতুন ভাবে শুরু করেন সবটা। তিনিই প্রথম ভারতীয় ভোটকুশলী, যিনি দেখিয়েছিলেন নির্বাচনে কৌশল আর কর্পোরেট-ছোঁয়া দিয়েও সফলতা হাসিল করা যায়। এরপর একাধিক রাজ্যে বিজেপি-কে হারাতে ডাক পড়ে প্রশান্ত কিশোরের। বঙ্গেও সেই একই কাজ করেছিলেন তিনি। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে ২০২২ আসতেই আইপ্যাক ছাড়লেন প্রশান্ত। জল্পনা সত্যি করে তৈরি করলেন নতুন দল। জন সুরজ পার্টি।
এর মধ্যেই বিহার সরকারে টানাপড়েন। ফের বিজেপি-র সঙ্গত্যাগ নীতিশের। তেজস্বী যাদবের সঙ্গে মিলে সরকার। জাতীয় রাজনীতি। সব মিলিয়ে টালমাটাল বিহার রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন প্রশান্ত। একের পর বয়ানে বুঝিয়ে দিলেন তিনিও আছেন ময়দানে। যুদ্ধ এবার অন্যভাবে! ডাক দিলেন পদযাত্রার। জেলায় শুরু করলেন জনসংযোগ। প্রস্তুতি নিয়েই শুরু হল কাজ।
প্রশান্ত-যাত্রায় প্রশ্ন
এখানেই উঠল প্রশ্নও। কেন? দেখা যাচ্ছে, ঠিক যে সময়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন রাহুল গান্ধী-কংগ্রেস। ডাক দিচ্ছেন ভারত জোড়ো যাত্রার। ঠিক সেই সময়েই প্রশান্তের এই উদ্যোগ। অর্থাৎ রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কংগ্রেসের বিরোধিতা যে বিজেপির বিরুদ্ধে, সেই একই দলের নীতির বিরুদ্ধে প্রশান্ত কিশোরের বিরোধ থাকলেও কংগ্রেসের মতো করেই আলাদা নামের কর্মসূচি একই সময়ে করছেন তিনি। যেখানে ইস্যু আলাদা হলেও একটি জাতীয় আর একটি রাজ্যের কর্মসূচি হলেও প্রশ্ন উঠছেই। আর এখানেই উঠে আসছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলি। যেখানে দেখা যায়, কংগ্রেসের হাইকমান্ড প্রশান্ত কিশোরের পরামর্শ চাওয়ার পরে তাঁকেও দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে অনুরোধ করে। কিন্তু ভোটকুশলী কিছু পরামর্শ দেন, যা কংগ্রেস নেতৃত্ব মানতে না পারার দরুন বিচ্ছেদ ঘটে তাঁদের মধ্যে। এর পর থেকে একদিকে বিজেপি এবং এক দিকে কংগ্রেস দুই দলের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হয় প্রশান্ত কিশোরের। সঙ্গে নীতিশ বা লালুর দলের সঙ্গেও বিরোধ বজায় রাখেন তিনি। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই মৌলিক কর্মসূচির পথে এগিয়েছেন দুঁদে এই কুশলী। আর এখানেই ভয় ধরেছে নীতিশ-তেজস্বীদের মনে। তাঁরা নিশ্চিত জানেন, প্রশান্ত কিশোর, নির্বাচনে জনসমর্থন আদায়ে ঠিক কী কী করতে পারেন! তিনি তাঁর সৃষ্ট সংস্থা আইপ্যাককে কাজে লাগিয়ে যে কাজ এখন থেকেই বিহারজুড়ে শুরু করেছেন। অর্থাৎ মানুষের সমর্থন নির্দিষ্ট দিকে টেনে আনার ক্ষেত্রে তাঁর কৌশল অন্যতম। এখানেই চিন্তা বেড়েছে বিহার রাজনীতির মহীরুহদের মধ্যে। একদিকে বিজেপি, অন্য দিকে নীতিশ, লালুপ্রসাদ; এঁরা প্রত্যেকেই আটকে ফেলতে চাইছেন তাঁকে। আবার যাত্রা বন্ধ করলে আরও বেশি প্রচার পাবেন প্রশান্ত, এই ভাবনা থেকেও এগোতে পারছে না সরকার। ঠিক এই আবহে মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা খর্ব করার কৌশল নিচ্ছে বিহারের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও বাধা রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, জনপ্রিয় এই যুবনেতা স্বচ্ছ। তাঁকে দিয়ে আপাতত কোনও বিশেষ কিছু সূচনা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় প্রশান্ত কিশোরের যাত্রা, রাহুল গান্ধীর সমগ্র ভারতব্যাপী যাত্রার মধ্যেও গুরুত্ব পাচ্ছে বিশেষভাবে। যা আগামী লোকসভা নির্বাচন বা বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে যে প্রভাব ফেলবে না, একথা বলছেন না কেউই।
তাহলে উপায়?
রাজনীতিক কারবারিদের একাংশের মতে, প্রশান্ত কিশোর ঠেকাতে সমঝোতার একটা চেষ্টা হতে পারে। যুবসমাজে বিকল্প নেতার যে চাহিদা সেটা আটকে দিতে, লালুময় তেজস্বীর বিকল্প হিসেবে প্রশান্ত কিশোরকে জায়গা না দিতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন কৌশল নিতে পারে। যেখানে আন্দোলন হল, কিন্তু নির্বাচনে প্রশান্ত থাকলেন কুশলী হিসেবেই।
বিহার রাজনীতি
বিদেশের চাকরি ছেড়ে দেশের রাজনৈতিক আবহে প্রবেশের ভুরি ভুরি উদাহরণ থাকলেও ভোটকুশলী থেকে সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নামার উদাহরণ বিরল। আর তার মধ্যেই অন্যতম প্রশান্ত কিশোর। অনেকেই বলছেন, এই প্রশান্ত যদি বিহারের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হন, সেক্ষেত্রেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, মন্দির ওহি বানায়াঙ্গে; ১৯৯০ সাল। সেপ্টেম্বর মাস। এই স্লোগানে উত্তপ্ত হয় গোটা দেশ। মন্দির-মসজিদ ইস্যুতে রাস্তায় নেমেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানিরা। আর সেই পথে নামার মধ্যেই স্বাধীন ভারতে প্রথম সূচিত হয় ভারতজুড়ে রথযাত্রা। যার লক্ষ্য ছিল জন সুরজ যাত্রার তুলনায় ভিন্ন। কিন্তু ভালোই ভালোই সবটা চললেও এই যাত্রার তাল কেটেছিল বিহার! দেশের মধ্যে এমন একটি রাজ্য, যা প্রথম সমস্তিনগরে বিজেপি-র রথ পৌঁছতেই তার চাকা আটকে দেয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদের নির্দেশে আইপিএস আধিকারিক আরকে সিং গ্রেফতার করেন আডবানিকে। সর্বধর্ম সমন্বয়ের পথে মাইলস্টোন সৃষ্টি করে বিহার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংয়ের সরকার থেকে এই ঘটনার প্রতিবাদে বেরিয়ে আসে বিজেপি। এই একটি যাত্রায় বদলে দেয় বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাস। বদলায় নির্বাচনী রাজনীতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট। ভাগ হয় একটা বড় অংশের জনতা। ভোটেও যার প্রভাব রয়েছে এখনও।
লড়াইয়ের ইতিহাস
১৯৭৪ সাল। জয়প্রকাশ নারায়ণ। বিহারের রাজনীতির মহাপুরুষের আন্দোলনে উত্তপ্ত হয় রাজ্য। লালুপ্রসাদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন। একাধিক যাত্রাকে হার মানিয়ে দেশের ইতিহাসে স্বাক্ষর রাখতে থাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধাচারণ করা বিহার!
অরবিন্দ কেজিওয়াল। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি। আমলাতন্ত্রের মোহ ছেড়ে ২০০০ সাল থেকেই শুরু করলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। হার-জিতের দাবদাহে একাকি অরবিন্দ একটা সময় প্রচারের আলোকে এলেন ২০১১ সালে। আন্না হাজারের দুর্নীতি-বিরোধী মঞ্চে, বিরাট সাড়া ফেলা অনশন-ধর্নায় যোগ দিলেন তিনি। তারপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি, যে লোকটিকে কেউ চিনতেন না! তিনিই প্রায় ১৪ বছরের লড়াইয়ে জিতে নিলেন লক্ষ লক্ষ হৃদয়। হয়ে গেলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী।
আবার আন্না হাজারে। ২০১১ সালের সেই আন্দোলন। রামলীলা ময়দান দেখেছে দেশ। কীভাবে এক সমাজকর্মীই ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন শাসককে।
মেধা পাটেকর। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন। দেশজুড়ে স্বাধীনতার পরবর্তীতেও একের পর এক মুখ রুখে দাঁড়িয়েছেন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। যেখানে প্রায় নুইয়ে থাকা বঙ্গের মমতাও রাজনৈতিকভাবে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরকে সঙ্গী করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ফের।
দেশের কোণায় কোণায় আন্দোলন, যাত্রা বিক্ষোভের ইতিহাস তাই ছত্রে ছত্রে বিরচিত হয় বারবার। কৃষক আন্দোলন। কৃষি বিলের বিরোধিতা। রাকেশ টিকায়েতের উঠে আসাও জানে দেশ।
ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে নেতাজির স্বরাজ দ্বীপে স্বাধীনতার সেই দীর্ঘ যাত্রা। লড়াই। যুদ্ধ। মৃত্যু। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ। ডান্ডি অভিযানের ধারা, এই ভারতেও বিদ্যমান। বদলেছে সময়, বদল হয়েছে ইস্যু। রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য যাত্রার অভিযোগ উঠেছে বারবার। কিন্তু জয়প্রকাশ, আদবানিরা ব্যাটন তুলে দিয়ে গিয়েছেন রাহুল, প্রশান্তদের হাতে। যাঁরা একাধিক কৌশল, বৃহত্তর স্বার্থে নিজেদের জয়গাঁথা রচিত করার চেষ্টা করলেও আসলে দেশীয় রাজনীতির ইতিহাসে, দেশজ রাজনীতির গৃহে এই যাত্রা-প্রবেশ তবুও বরাবরই তাৎপর্যের, বলছেন অনেকেই।






