প্রতিবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেল যন্তর মন্তর

Jantar Mantar protest site: আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল।

inscript
৩ মিনিট
প্রতিবাদের মানচিত্র থেকে মুছে গেল যন্তর মন্তর

দিল্লির যন্তর মন্তর প্রায় তিন দশক ধরে হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা, দাবি এবং প্রতিবাদের পরিচিত ঠিকানা। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, নারী অধিকারকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন—দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে এসেছেন নিজেদের কথা সরকার ও দেশের সামনে তুলে ধরতে। কিন্তু চলতি বছরের ১১ অক্টোবর দিল্লি পুলিশের জারি করা নির্দেশে জন্তর মন্তরকে আর সরকারি ভাবে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল হিসেবে রাখা হল না। তার বদলে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানকে বিক্ষোভের নতুন জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজধানীতে প্রতিবাদ করার জায়গা কি আরও সীমিত হয়ে গেল? যে জায়গায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ এত দিন ক্ষমতাসীনদের কাছে নিজেদের দাবি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেই জায়গা থেকে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার তাৎপর্য কী?

দিল্লিতে প্রতিবাদের ইতিহাসে যন্তর মন্তরের আগে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল বোট ক্লাব। ইন্ডিয়া গেটের কাছে অবস্থিত এই এলাকা থেকে সংসদ ভবন এবং তৎকালীন রাজপথের দূরত্ব কম হওয়ায় বড় জমায়েতের জন্য জায়গাটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে কৃষকদের বিশাল আন্দোলন দিল্লির রাজনীতিতে আলোড়ন তৈরি করেছিল। বিপুল সংখ্যক কৃষক সেখানে জমায়েত হয়ে নিজেদের দাবি জানিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের পর বোট ক্লাবে বড় জমায়েত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা আরও জোরালো হয়।

১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ আন্দোলনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে বোট ক্লাবে জমায়েতের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে প্রতিবাদের জন্য বিকল্প জায়গার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৯৩ সাল থেকে জন্তর মন্তরের আশপাশের রাস্তা সেই জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। সংসদের কাছাকাছি অবস্থান এবং তুলনায় ছোট পরিসরের কারণে প্রশাসনের পক্ষেও জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল।

আঠারো শতকে নির্মিত যন্তর মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার পাশের রাস্তা হয়ে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিবাদীদের মিলনস্থল। কারও জমি হারানোর অভিযোগ, কারও দীর্ঘদিনের বিচার না পাওয়া, কারও আবার কাজ, মজুরি কিংবা সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ—সব কিছুরই জায়গা হয়েছিল এখানে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দিল্লিতে বিক্ষোভ দমন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ, প্রশ্নের মুখে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি?

Human rights violation in cockroach protests: ১০ অক্টোবর, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ডাকে দিল্লির বিক্ষোভে, পুলিশি দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি আটক হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ বন্দিদের ‘তাৎক্ষণিক নিঃশর্ত মুক্তি’ দাবি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এই বিবৃতি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

যন্তর মন্তরের পরিচিতি আরও বেড়ে যায় ২০১১ সালে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লোকপাল আইন প্রণয়নের দাবিতে সমাজকর্মী আন্না হাজারে এখানে অনশন শুরু করেন। সেই আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি করেছিল। আন্না হাজারের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল-সহ একাধিক পরিচিত মুখ। পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনের সূত্র ধরেই আম আদমি পার্টির উত্থান ঘটে।

তবে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব শুধু বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বহু সাধারণ মানুষ, যাঁদের কথা সংবাদমাধ্যমে বা প্রশাসনের কাছে সহজে পৌঁছত না, তাঁরাও এখানে অবস্থান করেছেন। কেউ বছরের পর বছর ধরে বিচার চেয়েছেন, কেউ সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কেউ আবার নিজেদের অধিকার রক্ষার দাবিতে দিনের পর দিন রাস্তায় থেকেছেন। তাঁদের কাছে যন্তর মন্তর ছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে অন্তত নিজেদের কথা প্রকাশ্যে বলার সুযোগ ছিল।

কিন্তু এই প্রতিবাদের পরিসরও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে। ২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ বন্ধ করে প্রতিবাদীদের অন্যত্র সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফে শব্দদূষণ ও অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর এই নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে যন্তর মন্তরে আবার বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হলেও, প্রতিবাদের জায়গা ও পদ্ধতির উপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি থেকেই যায়।

২০২৬ সালের ১১ অক্টোবরের নির্দেশে জন্তর মন্তরের পরিবর্তে তিনটি নতুন জায়গাকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে নির্ধারণ করেছে দিল্লি পুলিশ। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান সংসদ ভবন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। উত্তর-পশ্চিম দিল্লির বুরারি ময়দান প্রায় ১৬ কিলোমিটার এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে। ফলে নতুন জায়গাগুলির অন্তত দু’টি রাজধানীর কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকা থেকে অনেকটাই দূরে।

প্রশাসনের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রতিবাদস্থলগুলিতে বিক্ষোভ আয়োজনের নিয়মকানুন জানিয়ে পরে পৃথক নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে। তবে নতুন জায়গা নির্ধারণের ফলে প্রতিবাদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়নি। পরিবর্তে, সরকারি ভাবে নির্ধারিত জায়গায় বিক্ষোভ আয়োজনের ব্যবস্থাটিই বদলে দেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ চলছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশি বাধা, আটক এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ি নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার পরেই যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংসদের কাছে প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলে নাগরিকদের দাবি জনপ্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যমের নজরে আসার সম্ভাবনা বাড়ে। দূরের কোনো জায়গায় প্রতিবাদ সরিয়ে দিলে সেই দৃশ্যমানতা কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ব্যারিকেড ঘেরা দিল্লি, নজরদারির চোখে নাগরিক: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ?

Delhi Under Siege: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে। ৩৫ হাজার পুলিশ, কাঁটাতারের ব্যারিকেড, ড্রোন নজরদারি, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, ২৪ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউন, ৭ হাজারের বেশি আটক। ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির অভিযোগ তুলেছেন, দিল্লিতে 'কাশ্মীর মডেল'-এর প্রয়োগ চলছে।

‘দুই নেহা’-র কাণ্ডে বিভ্রান্ত দিল্লি পুলিশ! AISA নেত্রী-কে আটকানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই

AISA-র সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করতে গিয়ে তাঁরই মতো দেখতে এক মেয়েকে আটক করল দিল্লি পুলিশ। অথচ সেই সময় আসল নেহা বোরা দিল্লির কনট প্লেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিলেন।

রাহুল, নেহা, অভিজিৎ, ঐশী: কাউকেই দেবতা বানানো উচিত নয়

Gyanesh Kumar resignation: আজকে আমরা নেহাকে যে জায়গায় বসাচ্ছি, কাল সকালে যদি নেহার কোনো ত্রুটি হয় তাহলে কিন্তু আমরা এক মুহূর্তে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেব। তাহলে আমরাই বা আজকে নেহাকে এই জায়গায় বসাচ্ছি কেন?

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও দিল্লিতে সাংবাদিকদের আটক কেন?

সাংবাদিকদের আটকের ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক দিনে, যখন সুপ্রিম কোর্টে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে বৈঠকে নারাজ প্রধান বিচারপতি, কী কারণ দেখালেন তিনি?

CJI surya kant rejects INDIA bloc meeting: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, মল্লিকার্জুন খাড়্গে ও রাহুল গান্ধীর বৈঠকের অনুরোধ কিছু 'কারণ দেখিয়ে' প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁর যুক্তি, বিষয়গুলি সাব জুডিস আর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক সাংবিধানিক ক্ষমতা বিভাজনের নীতি লঙ্ঘন করবে।

বিক্ষোভে বাধা, নেতাদের আটক! কোন পথে CJP-র আন্দোলন?

রাজধানীতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহে নিরাপত্তা বাহিনীর এই তৎপরতা নজর কেড়েছে। তবে রবিবারের পরবর্তী কর্মসূচি কোথায় এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সিজেপি-র ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে।

বোট ক্লাবের মতো যন্তর মন্তরের উন্মুক্ততার দিনও অতীত

Delhi protests: ১৯৯৩ নাগাদ কার্যত বোট ক্লাবের গণআন্দোলনের যুগ শেষ হয়ে গেল। এখানেই ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস।