দিল্লিতে বিক্ষোভ দমন নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের উদ্বেগ, প্রশ্নের মুখে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি?
Human rights violation in cockroach protests: ১০ অক্টোবর, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ডাকে দিল্লির বিক্ষোভে, পুলিশি দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি আটক হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ বন্দিদের ‘তাৎক্ষণিক নিঃশর্ত মুক্তি’ দাবি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এই বিবৃতি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশি দমন-পীড়নের ঘটনায় রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, ভারত সরকার কাউন্সিলের সমালোচনাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে 'অযাচিত হস্তক্ষেপ' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ১০ অক্টোবর, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের জেন-জি নেতৃত্বাধীন সংগঠনের ডাকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। নির্বাচনী ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ বিক্ষোভের অনুমতি না দিলেও হাজার হাজার মানুষ যন্তর মন্তরে জড়ো হতে শুরু করে। পুলিশ এই বিক্ষোভ দমনে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং ব্যাপক সংখ্যায় মানুষকে আটক করে।
বিক্ষোভের আগে ও বিক্ষোভ চলাকালীন মোট সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে ছিলেন একাধিক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং সিভিল সোসাইটি সদস্যরা। প্রায় আড়াই হাজার বিক্ষোভকারীকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন এবং মনিক সরকার। জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও গুরুগ্রামে তাঁর বাসভবন থেকে আটক হন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার পরিষদ এবং রাষ্ট্রসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় বিবৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পৃথক দু'টি প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও কিছু অভিযোগ নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করেছে বলে জানা গিয়েছে।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র থামিন আল-খিতান এক বিবৃতিতে জানান, বিক্ষোভের আগে ও বিক্ষোভ চলাকালীন বিক্ষোভকারী নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য, আইনজীবী এবং সাংবাদিকদের ব্যাপক গ্রেফতারি খবরে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে সম্মান করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন,
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের উপর নিষেধাজ্ঞাকে অবশ্যই প্রয়োজনীয়তার কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
তিনি আরও জানান,
সমস্ত বেআইনিভাবে আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় আরও জানায়, ভারতের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে 'চরম সংযম' অবলম্বন করতে হবে এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে 'অর্থবহ সংলাপ'-এ অংশ নিতে হবে। এই বিবৃতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ প্রক্রিয়া ব্যবস্থার আওতায় একাধিক বিশেষ র্যাপোর্টার ভারতের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়েছেন বলেও জানা গিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক রাষ্ট্রসংঘের এই উদ্বেগকে 'ভুলভাল' এবং 'অযাচিত হস্তক্ষেপ' বলে অভিহিত করে একটি বিবৃতি দিয়েছে।
মন্ত্রকের বক্তব্য,
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, যেখানে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার আমাদের সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও মুক্ত গণমাধ্যম দ্বারা সুরক্ষিত রয়েছে।
জেনেভায় ভারতের স্থায়ী মিশন রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সমালোচনাকে 'ভিন্নধর্মী' বলে উল্লেখ করে জানায়, ভারতীয় নাগরিকরা জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে এই অধিকার প্রয়োগ করেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি আইন অনুযায়ী কাজ করে। ভারত আরও অভিযোগ করে যে, রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় ভারতের ক্ষেত্রে 'দ্বৈত মানদণ্ড' অনুসরণ করছে এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বড় বড় বিক্ষোভের দিকেও তাদের সমান মনোযোগ দেওয়া উচিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানায়,
এই ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড শুধুমাত্র সংস্থার সুনাম ক্ষুণ্ণ করে এবং তাদের বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থাকে হ্রাস করে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও জানায়, দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কোনো পক্ষের মন্তব্য কাম্য নয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির অংশ।
এর আগে গত জুলাই মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ সাকেত গোখলে দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ প্রক্রিয়া ব্যবস্থার কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগে পুলিশি বর্বরতা, ইচ্ছাকৃত আটক, শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে দমন, নির্যাতন, সাংবাদিকদের উপর হামলা এবং মহিলাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ফলে অনেকেই আহত হয়েছেন এবং প্রায় সত্তর জনকে আটক করা হয়েছে। যদিও বিরোধী দলগুলোর দাবি ছিল, প্রায় তিন হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
২০২৬ সালে একাধিক রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ রিপোর্টার তথাকথিত কঠোর আইনের অধীনে রাজনৈতিক কর্মী উমর খালিদের দীর্ঘায়িত কারাবাসের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টারদের যোগাযোগের তালিকা সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে 'মানবাধিকার লঙ্ঘন' করছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডিয়ার বোর্ড চেয়ারপার্সন আখর প্যাটেল বলেন,
বিক্ষোভের অধিকার সরকারের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল নয়। এটি ভারতীয় সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত।
তিনি আরও জানান,
শুধুমাত্র বিক্ষোভের ইচ্ছা প্রকাশ করার কারণে মানুষকে আটক করা স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা স্বাভাবিক করা হচ্ছে এবং বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের অবৈধভাবে নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে 'রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের' কারণে অবনমিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারত বিষয়ক প্রতিবেদন এবং রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গিয়েছে।
দিল্লির বিক্ষোভ দমন এবং রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের উদ্বেগের ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার মধ্যে একটি জটিল সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে ভারত ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মেয়াদের জন্য সপ্তমবারের মতো রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদে নির্বাচিত হয়েছে, অন্যদিকে নিজের দেশে বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় তাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব মঞ্চে ভারতের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিশ্রুতি এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করার গুরুত্ব এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে আসে। ভারতের জন্য নিজের দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড পূরণের মধ্যে সমন্বয় সাধনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের মুক্তি, স্বাধীন তদন্ত এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা হলেই ভারত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে পারবে।







