কারগিল যোদ্ধার নামই ভোটার তালিকা থেকে বাদ: দাউদ আলির এসআইআর লড়াই
Voter List Revision in Bengal: কারগিল যুদ্ধে লড়া এক প্রাক্তন সেনাকর্মীর নামই যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এসআইআর প্রক্রিয়ায় কি সত্যিই নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে, নাকি নির্দিষ্ট এলাকাকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে?
মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা মোহম্মদ দাউদ আলি। বয়স ৬৪। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধেই এক মর্টার শেল বিস্ফোরণে তাঁর কানে আঘাত লাগে, আজও সেই যন্ত্রণা রয়ে গিয়েছে। সেনা জীবন শেষে স্বেচ্ছাবসর (VRS) নিয়ে যোগ দেন ভারতীয় রেলে। দেশের জন্য এত বছরের সেবা, রক্ত-ঘাম ঝরানো এক মানুষ আজ নিজের পরিচয় প্রমাণের লড়াইয়ে নেমেছেন। কারণ, ভোটার তালিকা থেকে তাঁরও নাম বাদ গিয়েছে।
এই ঘটনাগুলিই আজকের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR)-এর চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি শুনানির সময় পাসপোর্ট, চাকরির নথি—সব জমা দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী এখনও তালিকায় আছেন, কিন্তু পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়ে তিনি এখন প্রশ্নের মুখে। তাঁর দুই কন্যা এবং এক পুত্রর মধ্যে এক কন্যা আদালতের কর্মী হিসেবেও কাজ করছেন। তবুও তাঁদের পরিবারের প্রধানের নাগরিকত্ব নিয়েই এখন সংশয় তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় ঠিক কী ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, এসআইআর-এর চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম বাদ গিয়েছে। মোট ৬০ লক্ষের বেশি ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, এবং তার মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশকে অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পুরো যাচাই প্রক্রিয়া চালিয়েছেন ৭০৫ জন বিচারক। এখন তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ আপাতত আর কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Matua citizenship issue: নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে যাচ্ছেন মতুয়ারা? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কী হবে তাঁদের ভবিষ্যৎ? নাগরিকত্ব, কাজ, অধিকার—সবই কি এখন অনিশ্চিত? এসআইআর প্রক্রিয়া শুধু মুসলিম নয়, প্রান্তিক হিন্দুদেরও টার্গেট করছে? তাহলে কারা সত্যিই নিরাপদ?
কিন্তু এই নাম বাদ পরা মানুষদের পেছনে যে বাস্তব সমস্যা লুকিয়ে রয়েছে, তারই এক উদাহরণ মহম্মদ দাউদ আলি। তাঁর মতো আরও বহু মানুষ হঠাৎ করেই জানতে পারছেন, তাঁরা আর ভোটার নন। অথচ তাঁদের কাছে রয়েছে সরকারি পরিচয়পত্র, চাকরির রেকর্ড।
এসআইআর-এর আগের ধাপেই খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষের বেশি নাম। তার পরবর্তী ধাপগুলিতে আরও বাদের পর মোট বাদ পড়া নামের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার। ফলে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ থেকে নেমে এসেছে ৭ কোটি ৪ লক্ষের নিচে।
সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে, ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার। তারপর উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব বর্ধমান। এই পাঁচটি জেলাতেই বাদ পড়া নামের সংখ্যা মোটের অর্ধেকেরও বেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Humayun Kabir’s Viral Video: হুমায়ূন কবীরের ভাইরাল ভিডিওটি কি সত্যি, নাকি এআই দিয়ে তৈরি? এই ভিডিও কি স্টিং অপারেশন, না রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?
এই জেলাগুলির সীমান্তবর্তী, ঘনবসতিপূর্ণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ এবং মালদহে সংখ্যালঘু জনসংখ্যার অনুপাত তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই বাদের প্যাটার্ন কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে?
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের জন্য আপিল করার সুযোগ থাকলেও সেই প্রক্রিয়া কতটা সহজ? বর্তমানে মাত্র ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই কলকাতাকেন্দ্রিক। মুর্শিদাবাদ বা মালদহয়র মতো জেলার গ্রামীণ এলাকার একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে শত শত কিলোমিটার দূরে গিয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করা কতটা বাস্তবসম্মত? যাতায়াত খরচ, সময়, নথিপত্র সংগ্রহ—সব মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই প্রায় অসাধ্য হয়ে উঠছে।
মোহম্মদ দাউদ আলির ক্ষেত্রেও সেই একই পরিস্থিতি। একজন প্রাক্তন সেনাকর্মী, যিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, যাঁর কাছে সমস্ত বৈধ নথি রয়েছে—তাঁকেই এখন প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি এই দেশের নাগরিক। তাঁর বয়স, শারীরিক সমস্যা, আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে এই লড়াই সহজ নয়। তবুও তিনি লড়ছেন, কারণ এটি শুধু তাঁর নিজের নয়, তাঁর পরিবারের সম্মানের প্রশ্ন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারবেন না। পরে ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর নাম ফিরে এলেও সেই নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ আর থাকবে না। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, গণতন্ত্রে ভোটাধিকার কি শুধুই একটি প্রশাসনিক তালিকার উপর নির্ভর করবে? নাকি এটি একটি মৌলিক অধিকার, যা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব?
স্বচ্ছ ভোটার তালিকার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম সরানো জরুরি। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া যদি এমনভাবে বাস্তবায়িত হয়, যেখানে প্রকৃত নাগরিকরাই বাদ পড়ে যান, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক সংকেত বহন করে।
মোহম্মদ দাউদ আলির মতো মানুষের গল্প তাই আরও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়, রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক কাকে বলা হবে? এবং সেই পরিচয় প্রমাণের দায়ভার কতটা একজন সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, ভোটার তালিকা যতই ‘ফ্রিজ’ হোক, বিতর্ক থামার নয়।







