Exclusive|বিজেপির সঙ্গে হুমায়ূনের ১০০০ কোটির ডিল: সত্যি না AI দিয়ে তৈরি ভিডিও?
Humayun Kabir’s Viral Video: হুমায়ূন কবীরের ভাইরাল ভিডিওটি কি সত্যি, নাকি এআই দিয়ে তৈরি? এই ভিডিও কি স্টিং অপারেশন, না রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র?
পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে তৃণমূলের বহিষ্কৃত বিধায়ক তথা আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ূন কবীরকে ঘিরে একটি ভাইরাল ভিডিও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এই ভিডিওকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। একই সঙ্গে ভিডিওটি সত্যি কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। হুমায়ূন কবীর দাবি করেছেন, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। এই সব প্রশ্নে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল বলে, বিজেপির কাছ থেকে ১০০০ কোটি টাকা চেয়েছেন হুমায়ুন। ভিডিওটিতে দেখা যায় জনৈক প্রশ্নকর্তা হুমায়ূনকে বলছেন,
বিজেপির থেকে মুখ্যমন্ত্রী হলে আপনি সমর্থন করবেন?
হুমায়ুন উত্তরে বলেন:
পুরো সাপোর্ট দেব। কোনো অসুবিধা নেই। আমি মমতাকে কোনো ভাবেই আসতে দেব না।
তিনি আরও বলেন,
আজকের দিনে যে বিষয়টা তুলেছি না বাবরি মসজিদে… সেটা হবে কি না হবে, তা পরের বিষয়। আজকের দিনে পুরো ভারতের মুসলিমেরা আমার সঙ্গে আছে।
ভিডিওতে এও দাবি করা হয়েছে যে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
এখানে ক্লিক করা ভিডিওটি দেখতে পারেন: https://www.facebook.com/share/v/18nLcFdfmY/
ভিডিওটি সামনে আসার পর থেকেই শাসক দল এবং বিরোধী শিবিরের মধ্যে দোষারোপের পাল্টা দোষারোপ শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন এটি পরিকল্পিত স্টিং অপারেশন, আবার কেউ দাবি করছেন এটি সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রসূন আচার্যের বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ তিনি এই বিতর্কের মধ্যে একাধিক দিক তুলে ধরেছেন।
প্রসূন আচার্য ইনস্ক্রিপ্ট-কে বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেননি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে হুমায়ূন কবীরকে চেনার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করছেন, ভিডিওতে যে গলা শোনা যাচ্ছে তা হুমায়ূনেরই। তাঁর কথায়,
হুমায়ূনের কথা বলার ভঙ্গি, উচ্চারণ এবং স্বর—সবকিছুই ভিডিওর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ফলে প্রাথমিকভাবে তাঁর কাছে ভিডিওটিকে সম্পূর্ণ ভুয়ো বলে মনে হয় না।
বরং তিনি মনে করছেন, এটি একটি বাস্তব ভিডিও হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে এ কথা ঠিক, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ প্রসূন আচার্য এ বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকারী নন। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ডিপফেক ভিডিও বা কৃত্রিমভাবে তৈরি অডিও-ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হলেও, এত নিখুঁতভাবে একজন মানুষের গলা, কথা বলার ধরন এবং ঠোঁটের নড়াচড়া একসঙ্গে মেলানো এখনও খুব সহজ নয়। বিশেষ করে, একই সময়ে এবং একই পরিকাঠামোর মধ্যে হুমায়ূনের অন্য একটি ইন্টারভিউও রয়েছে, যেখানে ঠোঁটের নড়াচড়া এবং অডিও একেবারে স্বাভাবিকভাবে মিলছে। ফলে শুধুমাত্র ‘এআই’ বলে অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার দাগিয়েও দেওয়া যায় না, প্রয়োজন বিজ্ঞান সম্মত যাচাই।
ইনস্ক্রিপ্টের কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট ‘ডিপওয়্যার’ (Deepware) টুল ব্যবহার করে ভিডিওটির প্রায় ৯ মিনিটের একটি অংশ পরীক্ষা করেন। সেই বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, এটি ডিপফেক ভিডিও হওয়ার সম্ভবনা মাত্র ১৭ শতাংশ। ভিডিওর ভিজ্যুয়াল ও অডিওর মধ্যে অসামঞ্জস্য ধরা পড়েনি (টুলটি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষও ভিডিও-অডিও যাচাই করতে পারেন)। নিচে স্ক্রিনশট দেওয়া হলো। ডিপওয়্যার টুলটি বলছে: এই ভিডিওটি নির্মাণের ক্ষেত্রেও এআই ব্যবহার করা হয়নি।



‘ডিপওয়্যার’ (Deepware) টুল ব্যবহার করে ভিডিওটির প্রায় ৯ মিনিটের একটি অংশ পরীক্ষা করে পাওয়া ফল।
হুমায়ূন কবীরের উচ্চারণে স্পষ্ট আঞ্চলিক ভাষার টান রয়েছে। তাঁর উচ্চারণ, শব্দচয়ন ও বলার ভঙ্গিতে যে আঞ্চলিকতা দেখা যায়, তা নিখুঁতভাবে নকল করা এখনও এআই-এর পক্ষে সহজ নয়। নারকিট, ইলেভেন ল্যাবস, লিন্ডির মতো সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক ভাবে এআই অডিও নির্মাণের কাজ করে। তারা আঞ্চলিকতা তো বটেই এমন কী উচ্চারণে কলকাত্তাইয়া ভাষাতেও দর নয়। সাধারণত দেখা যায় 'স' 'শ' 'ষ'-এর ফারাক করতে পারে না এআই। জানে না 'র' আর 'ড়' এর প্রভেদ। কাজেই হুমায়ূনকে নকল করা কর্যত কঠিন চ্যালেঞ্জ।
এই প্রসঙ্গে সন্দেশখালির ঘটনাও সামনে আনা যায়। সেখানেও একসময় কিছু ভিডিওকে ‘কৃত্রিম’ বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলি প্রমাণ করা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকে সতর্ক করছেন, প্রতিটি অস্বস্তিকর ভিডিওকে এআই বলে দাগিয়ে দেওয়া একটি বিপজ্জনক প্রবণতা হতে পারে। এতে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা আরও ঘোলাটে হয়ে যায়।
এই বিতর্কের নিরসন হতে পারে শুধুমাত্র নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের মাধ্যমে। ইনস্ক্রিপ্ট এই প্রতিবেদনে সেই পথেই এগিয়েছে।
ডিপওয়্যার অভতারিফাই নামে একটি সমান্তরাল ডিটেকশন মডেল ব্যবহার করে।
এই মডেলটি বলছে, এই ভিডিওটির ডিপফেক হওয়ার সম্ভবনা মাত্র ১০ শতাংশ। সেফেরবেকভ বলে অন্য একটি মডেল বলছে, এই ভিডিওটি ডিপফেক হওয়ার সম্ভবনা ৫৩ শতাংশ। মডেলার দাবি সিদ্ধান্তে আসার জন্যে এই নম্বর যথোপযুক্ত নয়।
এই একই টুলে এনসেম্ৱল বলে আরও একটি মডেল বলছে, এই ভিডিওটি ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৩৪ শতাংশ। বলে রাখা ভালো, এনসেম্ৱল আসলে অন্য সব মডেলের উত্তর থেকে সিদ্ধান্ত নেয়। তিনটি মডেলের মধ্যে দুটি যেহেতু স্পষ্ট বলছে, এই ভিডিওটির ডিপফেক হওয়ার সম্ভবনা খুবই কম, এবং অন্যটি বলছে ভিডিওটির ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনা মাঝারি। বলাই যায়, সন্দেশখালির মতোই সম্ভবত হুমায়ূন নিজের দাবিকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারবেন না।







