লোহার পেরেক নয়, শুধু কাঠের জোড়! জাপানের মন্দির আজও অটুট কেন?
Kigumi woodworking: প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ জাপানে বহু প্রাচীন কাঠের তৈরি মন্দির বছরের পর বছর ধরে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প, টাইফুন আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া সহ্য করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও যা ভাবলে তাজ্জব বনে যেতে হয়, জাপানিরা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে আজ থেকে হাজার বছর আগে। আর এই জাদুর নাম হলো ‘কিগুমি’ (Kigumi)।
একটা বিশাল কাঠের মন্দির তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেখানে কোনো লোহার পেরেক, স্ক্রু বা আঠার ব্যবহার করাই হচ্ছে না! ভাবতে একটু অবাক লাগছে, তাই না? কিন্তু জাপানে শত শত বছর ধরে ঠিক এইভাবেই তৈরি হয়ে আসছে বড় বড় ঐতিহাসিক মন্দির ও প্রাসাদ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ জাপানে বহু প্রাচীন কাঠের তৈরি মন্দির বছরের পর বছর ধরে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প, টাইফুন আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া সহ্য করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও যা ভাবলে তাজ্জব বনে যেতে হয়, জাপানিরা সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে আজ থেকে হাজার বছর আগে। আর এই জাদুর নাম হলো ‘কিগুমি’ (Kigumi)।

কিগুমি কী?
‘কিগুমি’ হলো কাঠ দিয়ে কাঠকে লক করার এক প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জাপানি কৌশল। আমাদের ছোটবেলার জিগস পাজল (Jigsaw Puzzle) খেলার কথা মনে আছে? যেখানে একটা টুকরোর খাঁজে অন্য টুকরোটা ঠিকঠাক বসে গিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি হতো? কিগুমি টেকনিকটাও ঠিক তেমন।
এখানে কোনো পেরেক বা স্ক্রু ব্যবহার না করে, কাঠের টুকরোগুলিকে হাত দিয়ে কেটে এমন নিখুঁত খাঁজ বা নকশা তৈরি করা হয়, যাতে একটা কাঠ আরেকটা কাঠের ভিতর জাদুর মতো ঢুকে আটকে যায়। ঘরের খুঁটি, ছাদের বিম থেকে শুরু করে দেওয়ালের প্রতিটি অংশ এই পদ্ধতিতে একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লাগানো হয়।
প্রধানত দুই ধরনের জোড় বা জয়েন্ট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়:
ৎসুগিতে (Tsugite): যখন দুটো কাঠকে লম্বালম্বিভাবে জোড়া দিয়ে আরও বড় বা দীর্ঘ করা দরকার হয়, তখন এই জয়েন্ট ব্যবহার করা হয়। যেমন— লম্বা পিলার বা বিম তৈরি করতে।
শিগুচি (Shiguchi): যখন দুটো কাঠকে কোণাকোণি বা এল (L) আকৃতিতে (৯০ ডিগ্রি কোণে) জোড়া দিতে হয়, তখন এই টেকনিক কাজে লাগে। যেমন— পিলারের উপর ছাদের কাঠামো বসানো।
কেন লোহা বাদ দিয়ে শুধুই কাঠ?
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, পেরেক বা স্ক্রু ব্যবহার করলে তো কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত, তাহলে জাপানিরা কেন এই কঠিন পথ বেছে নিল? এর পিছনে রয়েছে চমৎকার কিছু বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক কারণ।
জাপানের আবহাওয়া বেশ আর্দ্র, অর্থাৎ বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। এখানে গরমকালে যেমন গুমোট গরম পড়ে, তেমনই ভারী বৃষ্টি আর টাইফুনও হয়। কাঠের ভিতর লোহার পেরেক ঢুকিয়ে রাখলে এই আর্দ্রতার কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেরেকের গায়ে মরচে ধরে যায়। মরচে ধরা পেরেক আস্তে আস্তে চারপাশের কাঠকে ফাটিয়ে দেয় এবং এক সময় পুরো জোড়টাই আলগা হয়ে ভেঙে পড়ে। কিন্তু কিগুমি পদ্ধতিতে লোহাই নেই, তাই মরচে ধরার বা কাঠ নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

জাপান হলো মারাত্মক ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। লোহার পেরেক বা মেটাল দিয়ে তৈরি ঘরবাড়িগুলি হয় খুব শক্ত ও অনমনীয় (Rigid)। ফলে ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে লোহা বা স্ক্রুগুলি একচুলও নড়তে পারে না এবং চাপের চোটে মট করে ভেঙে পড়ে।
কিন্তু কিগুমির কাঠের জয়েন্টগুলি চমৎকার নমনীয়। ভূমিকম্পের সময় এই কাঠের জোড়গুলি হালকা নড়াচড়া করতে পারে। এই সামান্য একটু নড়াচড়ার ক্ষমতা বা স্পেস থাকার কারণে পুরো ভবনটি স্প্রিং-এর মতো ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন বা ধাক্কাকে নিজের ভিতর শুষে নেয় এবং পুরো কাঠামোতে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বারবার শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার পরও জাপানের বহু ঐতিহাসিক কাঠের মন্দির শত শত বছর ধরে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কাঠের একটা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে— আবহাওয়া যখন খুব স্যাঁতসেঁতে বা আর্দ্র হয় তখন কাঠ বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে কিছুটা ফুলে ওঠে। আবার আবহাওয়া শুকিয়ে গেলে তা সংকুচিত হয়ে বা শুকিয়ে আগের জায়গায় ফিরে আসে। কিগুমির কাঠের জয়েন্টগুলিও আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গেই বাড়ে আর কমে। ফলে পুরো কাঠামোর উপর আলাদা করে কোনো বাড়তি চাপ বা টান পড়ে না।
মিয়াদাইকু: যারা কাঠকে ‘জীবন্ত’ মনে করেন
এই অসম্ভব নিখুঁত কাজ যারা হাত দিয়ে করেন, তাদের বলা হয় ‘মিয়াদাইকু’ (Miyadaiku) বা মন্দিরের বিশেষ কাঠমিস্ত্রি। এরা সাধারণ কাঠমিস্ত্রি নন, বরং একেকজন উঁচু দরের শিল্পী ও বিজ্ঞানী।
একজন মিয়াদাইকু হয়ে ওঠা মোটেও সহজ কথা নয়। এর জন্য ১০ থেকে ২০ বছর ধরে কঠোর শিক্ষানবিস হিসেবে প্রবীণ ওস্তাদদের অধীনে কাজ শিখতে হয়। মিয়াদাইকুরা পাইকারি হারে বা মেশিনে মেপে সব কাঠ কাটেন না। তারা প্রতিটি কাঠের টুকরো আলাদা করে চোখের সামনে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করেন। কাঠের ভিতরের আঁশ (Wood Grain) কোন দিকে গিয়েছে, কাঠের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া বাঁকটা কেমন, কোন কাঠের শক্তি বেশি— এসব নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন যে ওই নির্দিষ্ট কাঠটি ভবনের ঠিক কোন জায়গায় বসানো হবে।
তাদের বিশ্বাস, গাছ কেটে ফেলার পরও কাঠের প্রাণ ফুরিয়ে যায় না। তাই কাঠের এই প্রাকৃতিক স্বভাবকে সম্মান জানিয়েই তারা কাজ করেন। এই ওস্তাদ কারিগররা আধুনিক কোনো ইলেকট্রিক মেশিন ব্যবহার করেন না। তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব ধাঁচের কিছু ঐতিহ্যবাহী হাতের যন্ত্র (যেমন— টেনে কাটার বিশেষ করাত 'নোকোগিরি', কাঠ মসৃণ করার 'কান্না', এবং হরেক রকমের ছেনি বা 'নোমি') দিয়ে বছরের পর বছর ধরে একাগ্রতার সঙ্গে এই জয়েন্টগুলি খোদাই করেন। প্রতিটি জয়েন্ট এতটাই নিখুঁত হতে হয় যে, এক চুল ফাঁক থাকলেও পুরো মন্দিরের শক্তি কমে যেতে পারে।
১৪০০ বছরের পুরনো টেকসই ধারা
জাপানে প্রায় ১ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি ছোট-বড় মন্দির ও উপাসনালয় বা শ্রাইন রয়েছে। এর মধ্যে বহু প্রাচীন স্থাপনা এই কিগুমি পদ্ধতিতে তৈরি। ওসাকার বিখ্যাত ‘শিতোন্নো-জি’ (Shitenno-ji) মন্দিরটি ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে তৈরি হয়েছিল, যা এই মিয়াদাইকু ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাচীন সাক্ষী। এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো কাঠের তৈরি অক্ষত স্থাপনা ‘হোরিউ-জি’ (Hōryū-ji) মন্দিরটিও এই অসাধারণ টেকনিকের এক জীবন্ত প্রমাণ।
আজকের আধুনিক যুগে আমরা যখন 'সাসটেইনেবিলিটি' বা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জীবনযাত্রার কথা বলি, কিগুমি পদ্ধতিটি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই পদ্ধতিতে তৈরি কোনো ভবনের বা মন্দিরের একটি নির্দিষ্ট অংশ যদি কয়েকশো বছর পর নষ্টও হয়ে যায়, তবে পুরো মন্দির ভাঙার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। মিয়াদাইকুরা খুব সহজে পাজলের মতো সেই নির্দিষ্ট কাঠের জয়েন্টটি খুলে নেন, সেটি মেরামত করেন বা নতুন কাঠের টুকরো বসিয়ে আবার আগের মতো লক করে দেন। এতে কোনো কাঠের অপচয় হয় না, পরিবেশের ক্ষতি হয় না, আর ভবনের আয়ুও বেড়ে যায় আরও কয়েকশো বছর।
আজকের দ্রুতগতির যুগে যেখানে মানুষ অল্প সময়ে সস্তায় ঘরবাড়ি বানাতে চায়, সেখানে কিগুমি ও মিয়াদাইকু ঐতিহ্য আমাদের ধৈর্য, নিখুঁততা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকার এক পরম পাঠ শেখায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কঠিন কাজ শেখার মানুষের সংখ্যা হয়তো কমছে, কিন্তু জাপান সরকার এবং সচেতন সমাজ আজও এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কারণ তারা জানে, এই প্রাচীন জ্ঞান কেবলই ঘর বানানোর কৌশল নয়— এটি প্রকৃতির শক্তিকে ভালোবেসে, তাকে জয় করার এক চিরন্তন জেন (Zen) দর্শন।








