আইফোন না পেয়েই খাদে লাফ! নাকি অন্য কিছু ঘটেছিল কুণাল চন্দগুড়ের সঙ্গে?
Chhatrapati Sambhajinagar cliff Kunal Chandgude case: কুণালের মাসি পল্লবী পাটিল একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন যে প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনে কেবল ভিউ পাওয়ার লোভে পুরো ঘটনাটিকে বিকৃত করা হচ্ছে।
“আপনারা আমাদের চেনেন না, এই ঘটনার আসল প্রেক্ষাপট বা সত্যতাও জানেন না। তা সত্ত্বেও শুধু কিছু ভিউ পাওয়ার জন্য আপনারা ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন,”—কথাগুলি বলছিলেন পল্লবী পাতিল। তিনি মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজীনগরের মর্মান্তিক ঘটনায় মৃত ১৮ বছর বয়সি কুণাল চন্দগুড়ের মাসি এবং কুণালের মা সঙ্গীতার বোন। গত ২১ অগাস্ট শুক্রবার ওয়ালুজ এলাকার খবড্যা ডোঙ্গর পাহাড় থেকে পড়ে কুণাল, তাঁর বাবা মুরলীধর ও মা সঙ্গীতা, একই পরিবারের তিনজনেরই মৃত্যু হয়। আর তারপর মুহূর্তের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, কুণাল আইফোনের জন্য জেদ ধরেছিল এবং তার জেরেই বাবা-মাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। দিদি, জামাইবাবু ও ভাগ্নের অস্থি সংগ্রহ করতে যাওয়ার পথে মোবাইলে একের পর এক এমন ভিডিও দেখে ক্ষোভ ও কান্নায় ভেঙে পড়ে এই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেন পল্লবী। সেই ভিডিওতে তিনি বলেছেন, আসল সত্য না জেনেই গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তাহলে আসল সত্যটা কী?
সকাল আটটায় ব্যাগ গুছিয়ে রোজকার মতোই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল আঠেরো বছরের কুণাল চন্দগুড়ে। ছত্রপতি সম্ভাজীনগরের জাল্টা ফাটা এলাকার বাসিন্দা এই তরুণ নিট (NEET) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ডাক্তার হওয়াই ছিল তার লক্ষ্য। কিন্তু, সকাল দশটা নাগাদ ইনস্টিটিউট থেকে বাড়িতে ফোন করে জানানো হয়, কুণাল ক্লাসে পৌঁছয়নি। পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ নিয়ে তার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করতেই দেখতে পান, ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওয়ালুজ এমআইডিসি (MIDC) থানা এলাকার খবড্যা ডোঙ্গর পাহাড়ের চূড়ায়। ঠিক সেই সময়েই কুণাল ফোনে পরিবারকে জানায় যে সে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন বাবা মুরলীধর চন্দগুড়ে এবং মা সঙ্গীতা চন্দগুড়ে। খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছয় পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড এবং আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা। পাহাড়ে পৌঁছে দেখা যায়, খবড্যা ডোঙ্গরের প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো ফুট খাড়াই খাদের শেষ কিনারায় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে কুণাল। ফায়ার ব্রিগেড ও স্থানীয় উদ্ধারকারীরা নিচে সেফটি নেট পাতার চেষ্টা করতে থাকেন, কিন্তু কুণাল ক্রমাগত কিনারায় নিজের অবস্থান বদলাচ্ছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে তাকে বুঝিয়ে নিরাপদে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলে। মা সঙ্গীতা বারবার ছেলেকে ফিরে আসার অনুরোধ জানাতে থাকেন। বেলা প্রায় একটা নাগাদ বাবা মুরলীধর কিনারার কাছে এগিয়ে গিয়ে ছেলের হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু আলগা পাথরে পা পিছলে মুহূর্তের মধ্যে বাবা ও ছেলে দুজনেই অতল খাদে তলিয়ে যান। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মা সঙ্গীতাও সেই খাদে পড়ে যান। ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয় এবং পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঘাটি হাসপাতালে পাঠায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
From Naxal to Urban Naxal to ‘Dimagi Naxal’: মোদির স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে উঠে আসা ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধের অর্থ কী? সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানুষদেরই কি এই তকমা দেওয়া হচ্ছে? নকশালবাড়ির ইতিহাস, ‘আরবান নকশাল’ থেকে ‘দিমাগি নকশাল’—এই রাজনৈতিক শব্দবন্ধের আড়ালে কি মতপ্রকাশ, গণতন্ত্র ও প্রশ্ন করার অধিকারকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে?
ঘটনার পরপরই সোশ্যাল মিডিয়ায় চাঞ্চল্যকর প্রচার শুরু হয়। বিভিন্ন ভিডিও ও পোস্টে দাবি করা হয়, কুণাল নতুন আইফোন কেনার বায়না করেছিল এবং তা না পেয়ে বাবা-মাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে যখন চিতাভস্ম সংগ্রহ করা হচ্ছিল, তখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের কথা ছড়াতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে কুণালের মাসি পল্লবী পাটিল একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন যে প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনে পুরো ঘটনাটিকে বিকৃত করা হচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jadavpur University Violence: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার রাতের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কারা জড়িত? ক্যাম্পাসে কীভাবে এত সংখ্যক বহিরাগত ঢুকল? নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কি কোনো গাফিলতি ছিল? এবিভিপি ও এসএফআইয়ের পৃথক বিক্ষোভে কেন ফের উত্তেজনা ছড়াল? সিসিটিভি ফুটেজে কি মিলবে ঘটনার আসল ছবি? উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এবং পুলিশি অভিযোগের পর কি সামনে আসবে প্রকৃত সত্য?
মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা ডিসিপি (জোন-১) পঙ্কজ অতুলকরের নেতৃত্বে ওয়ালুজ এমআইডিসি পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর স্পষ্ট জানায়, একটি আইফোন কেনার দাবি এই মর্মান্তিক ঘটনার মূল কারণ নয়। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে কুণাল এবং তার মা সঙ্গীতা—দুজনেই আগে থেকেই আইফোন ব্যবহার করতেন। ফলে ফোন না পাওয়ার কারণে আত্মহত্যার তত্ত্বটি নাকচ করেছে পুলিশ। তবে ফোনগুলি ইএমআই (EMI)-তে কেনা হয়েছিল কি না এবং কিস্তি পরিশোধ নিয়ে কোনো আর্থিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল কি না, তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখছেন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, ঘটনার মূল কারণ ছিল সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক কলহ। প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর আগে মুরলীধর ও সঙ্গীতার ভালবেসে বিয়ে হয়েছিল, যা মুরলীধরের পরিবার মেনে নেয়নি। এর ফলে দীর্ঘ প্রায় সতেরো থেকে কুড়ি বছর মুরলীধর তাঁর পৈতৃক পরিবার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিলেন। প্রায় এক দশক আগে তাঁদের বড় ছেলে কপিল দূরারোগ্য রোগে মারা যাওয়ার পর কুণালই ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মুরলীধরের নামে থাকা প্রায় তিন একর পৈতৃক জমির কিছু অংশ তিনি নিজের বোনেদের দিয়ে দেন এবং পুরনো পরিবারের সঙ্গে পুনরায় ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ শুরু করেন। পেশায় ট্রাক ড্রাইভার মুরলীধর মাসের পর মাস বাড়ি থেকে দূরে থাকতেন। এই বিষয়গুলি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকা মা সঙ্গীতার বেশ কিছু পুরনো ভিডিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে, যেখানে নাম না করে পারিবারিক অধিকার হরণ এবং মানসিক অশান্তির অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
পুলিশের নথিতে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালেও কুণাল ওই একই পাহাড়ে গিয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল এবং তখন পুলিশি সহায়তায় তাকে কাউন্সেলিং করিয়ে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তদন্তকারী দলের কনস্টেবল সুরেশ ভিষে জানিয়েছেন, গত বছর ফোন সংক্রান্ত একটি অভিমান থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তির জেরে কুণাল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল এবং বাবাকে চিরতরে বাড়ি ফেরাতে বা পরিবারকে একত্র করতে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই সে পাহাড়ে উঠেছিল। তবে পরিবারের তিনজন সদস্যই মারা যাওয়ায় সরাসরি কোনো বয়ান পুলিশের হাতে নেই। পুলিশ আপাতত একে আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সমন্বিত প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া ফোনের ডিজিটাল তথ্য এবং প্রতিবেশীদের বয়ান খতিয়ে দেখে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করছে পুলিশ।






