যাদবপুরে বুধবার রাতে ঠিক কী ঘটেছিল? ভয়ঙ্কর বর্ণনা উঠে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর জবানবন্দীতে
Jadavpur University Violence: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার রাতের সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কারা জড়িত? ক্যাম্পাসে কীভাবে এত সংখ্যক বহিরাগত ঢুকল? নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কি কোনো গাফিলতি ছিল? এবিভিপি ও এসএফআইয়ের পৃথক বিক্ষোভে কেন ফের উত্তেজনা ছড়াল? সিসিটিভি ফুটেজে কি মিলবে ঘটনার আসল ছবি? উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এবং পুলিশি অভিযোগের পর কি সামনে আসবে প্রকৃত সত্য?
আরও একবার সংবাদ শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ, ক্যাম্পাসে ভাঙচুর এবং বৃহস্পতিবার এবিভিপি ও এসএফআইয়ের পৃথক বিক্ষোভকে ঘিরে দিনভর উত্তপ্ত রইল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে ভাঙচুর এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগে যাদবপুর থানায় পুলিশি অভিযোগ দায়ের করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যের তরফে জানানো হয়েছে, ১৯ অগাস্ট রাত এবং ২০ অগাস্টের ঘটনাগুলির তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। শুক্রবার ২১ অগাস্ট দুপুরের আগেই কমিটি গঠন করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের চিহ্নিত করতে ১৯ অগাস্ট রাতের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হবে। পরে সেই ফুটেজ তদন্ত কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হবে। বেআইনিভাবে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা বহিরাগতরা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কি না, কারা ভাঙচুরে জড়িত ছিল, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তায় ত্রুটি ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন উপাচার্য।
বুধবার রাত প্রায় ৯টা নাগাদ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অরবিন্দ ভবনে ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র সংগঠন ফেটসুর ডাকে একটি জিবি মিটিং চলছিল। এবিভিপির অভিযোগ, যেহেতু ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি, তাই কীভাবে জিবি মিটিং ডাকা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই প্রথমে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং এবিভিপির মধ্যে বচসা শুরু হয় বলে অভিযোগ। পরে পরিস্থিতি হাতাহাতি এবং সংঘর্ষের দিকে গড়ায়।
অভিযোগ, এরপর একদল মানুষ অরবিন্দ ভবনে ঢুকে পড়েন। সেখানেও উত্তেজনা ছড়ায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যাদবপুর থানার সামনেও বিক্ষোভ শুরু হয়। ছাত্র সংগঠনগুলির নেতাদের মধ্যে চলতে থাকে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jadavpur University Ragging: বারবার, রোজ রোজ ঘটে এমন ঘটনা। দু-চারদিন আলোচনা হয়, তার পর সেই চর্চায় পলি পড়ে যায়। আবার কোনও স্বপ্নদীপের মৃত্যু তুলে দিয়ে যায় প্রশ্ন, ফের তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন যাদবপুরের বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। সেখান থেকে তিনি যাদবপুরের শিক্ষক সংগঠন এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিকে নিশানা করে কড়া মন্তব্য করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অনুষ্ণা দাসের বক্তব্য, ঘটনাটি শুধুমাত্র দুই পক্ষের মধ্যে বচসা বা হাতাহাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর অভিযোগ, বুধবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ বাইরে থেকে একদল লোক ক্যাম্পাসে এসে পড়ুয়াদের উপর হামলা চালায়।
অনুষ্ণার দাবি, হামলাকারীদের হাতে বাঁশ ছিল। এমনকী ক্যাম্পাসের বাইরে খাবার খেতে থাকা কয়েকজন পড়ুয়াকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। গুরুতর আহত হয়ে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
এরপর প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি বাইকে করে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জনের একটি দল ক্যাম্পাসের চার নম্বর গেটের দিকে জড়ো হয়েছিল বলে দাবি ওই ছাত্রীর। তাঁর বক্তব্য, ওই দলটি পড়ুয়াদের দিকে তেড়ে আসায় নিরাপত্তার কারণে অনেকে পালিয়ে অরবিন্দ ভবনে আশ্রয় নেন।
অরবিন্দ ভবনে আশ্রয় নেওয়া পড়ুয়াদের অভিযোগ, বাইরে থেকে আসা লোকজন সেখানে গেট খুলে ঢোকার চেষ্টা করে। তাঁদের দিকে গালিগালাজের পাশাপাশি ইট-পাটকেল, বোতল এবং জ্বলন্ত কাঠের টুকরো ছোড়ার অভিযোগও করেছেন অনুষ্ণা। তাঁর দাবি, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে এই পরিস্থিতি চলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Jadavpur University CCTV: প্রগতিশীলতার বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার নামে আসলে কী চলে এখানে? নজর রাখা দরকার।
অনুষ্ণার অভিযোগ, হামলাকারীরা ‘ভারত মাতা কি জয়’ এবং ‘জয় শ্রী রাম স্লোগান’ দিতে দিতে ক্যাম্পাসে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। তাঁর দাবি, কয়েকজন গেরুয়া পতাকা নিয়ে এসেছিলেন এবং পতাকা জ্বালিয়ে পড়ুয়াদের দিকে ছোড়া হয়।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে হামলাকারীদের সঙ্গে বিজেপি, আরএসএস বা এবিভিপির যোগ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, এবিভিপি-র সঙ্গে বিজেপির কোনো যোগ নেই। বিজেপির ছাত্র সংগঠন নেই।
রাতের ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন পড়ুয়ারা। অনুষ্ণার দাবি, ক্যাম্পাসে একাধিক নিরাপত্তারক্ষী থাকার কথা থাকলেও হামলার সময় সেখানে কোনও নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা যায়নি।
কীভাবে এত সংখ্যক বহিরাগত ক্যাম্পাসে ঢুকল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের আটকানো গেল না কেন, এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে। পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ফোন করেও তাঁরা সাড়া পাননি।
পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও পুলিশ কিছুটা দেরিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বলে দাবি করেছেন অনুষ্ণা। পরে পড়ুয়াদের ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলা হলেও বাইরে জড়ো হয়ে থাকা লোকজনের কারণে নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা অরবিন্দ ভবনেই থেকে যান বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার রাতের ঘটনার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনা বজায় থাকে। নিজেদের দাবিতে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল করে এবিভিপি এবং এসএফআই। দুই পক্ষের মিছিলকে কেন্দ্র করেও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং দুপক্ষের মধ্যে সম্মুখ সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার পড়ুয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং রেজিস্ট্রারের কাছে নিরাপত্তা নিয়ে জবাবদিহি দাবি করেন। পড়ুয়াদের অভিযোগ, এত বড় ঘটনা ঘটার পরও উপাচার্যকে তাঁরা ক্যাম্পাসে পাননি। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের কাছেও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি বলে দাবি তাঁদের।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে এবার তদন্তের পথে হাঁটছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ১৯ অগাস্ট রাতের ঘটনার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হবে। বহিরাগতদের বেআইনি প্রবেশ, ভাঙচুর, সম্পত্তি নষ্ট এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য গাফিলতি, সবকিছুই খতিয়ে দেখা হবে।
কর্তৃপক্ষের তরফে থানায় অভিযোগ দায়েরের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। ফলে সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনায় কারা যুক্ত ছিল, তদন্তে কী উঠে আসে সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে আপাতত।
এদিকে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে আগামী সোমবার দুপুর ৩টেয় সিআর-১-এ বৈঠক ডেকেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সমস্ত পক্ষকে সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য ডাকা হয়েছে।









