আদিবাসী নারীদের হাতে তৈরি মহুয়া আজ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড
Mahua liquor: পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
মহুয়া। যাকে অনেকে মহুলি বা মহুরাও বলেন। কোনো শস্য বা ফল ছাড়াই স্রেফ বুনো ফুল দিয়ে তৈরি হয় চমৎকার এই মদ। ভারতে শত শত বছর ধরে তৈরি হয়ে আসছে এই অনন্য পানীয়।
পৃথিবীতে ফুল থেকে তৈরি হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের মধ্যে মহুয়া অন্যতম। এটি শুধু একটি পানীয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের গভীর জঙ্গল, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কিন্তু জংলি ফুল দিয়ে তৈরি মহুয়া এখন আর স্রেফ ‘কান্ট্রি লিকার’ নয়, বরং হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক লাক্সারি ব্র্যান্ড।
মধ্য ও পূর্ব ভারতের (যেমন মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও মহারাষ্ট্র) আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে মহুয়া গাছটি কোনো সাধারণ গাছ নয়। একে বলা হয় 'লাইফ অফ ট্রি' বা জীবনদায়ী গাছ। বসন্ত আর গরমের শুরুতে (মার্চ থেকে মে মাসের দিকে) মহুয়া গাছে হালকা হলদেটে রঙের মাংসল ফুল ফোটে। ভোরের আলো ফোটার আগেই আদিবাসী পরিবারের নারী ও শিশুরা ঝুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জঙ্গল পাহারায়। গাছ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া ফুলগুলি তারা পরম যত্নে কুড়িয়ে নেন। মহুয়ার পুরো অর্থনীতিটাই টিকে আছে নারীদের উপর। ফুল কুড়ানো থেকে শুরু করে তা রোদে শুকানো, বাজারে কেনাবেচা এবং মদ তৈরির পাতন প্রক্রিয়া—সবটাতেই নারীরা প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
ব্রিটিশদের নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক কলঙ্ক
মহুয়ার ইতিহাস কিন্তু সবসময় এত মসৃণ ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসকেরা এই পানীয়টির উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তারা মহুয়াকে একটি ‘বিপজ্জনক মাদক’ হিসেবে আখ্যা দেয়। আসলে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় পানীয় বন্ধ করে বিদেশি মদের ব্যবসা বাড়ানো এবং কর আদায় করা।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো—আইনের ভয়ে মানুষ গোপনে লুকিয়ে মদ তৈরি শুরু করল। তাড়াহুড়ো করে তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় মদের মান খারাপ হতো, এমনকী তা বিষাক্তও হয়ে উঠত। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এই দুর্নাম পুরোপুরি ঘোচেনি। সরকারি খাতায় মহুয়াকে স্রেফ সস্তা ‘দেশি মদ’ বানিয়ে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।
মহুয়া মূলত দুভাবে তৈরি করা হয় এবং দুটোর স্বাদ ও গন্ধ সম্পূর্ণ আলাদা:
১. সনাতনী পদ্ধতি (Traditional Mahua): গ্রামের মানুষ মাটির বা ছোট পাত্রে আগুনের উপর মাত্র একবার ফুল ফুটিয়ে এই মদ তৈরি করেন। এতে অ্যালকোহলের মাত্রা থাকে প্রায় ১৫ শতাংশ। এর স্বাদ ও গন্ধ ভীষণ কড়া ও বুনো। মদের সমঝদারদের মতে, এই সনাতনী মহুয়ায় পাকা কাঁঠাল, কস্তুরী, গোলমরিচ, পেয়ারার মোরব্বা আর চালের মদের (Rice Wine) একটা দারুণ মিশ্রণ পাওয়া যায়।
২. আধুনিক পদ্ধতি (Modern Craft Mahua): নতুন প্রজন্মের আধুনিক ডিস্টিলাররা এখন তামার পাত্রে মহুয়াকে দুইবার ফুটিয়ে (Double-distilled) ফিল্টার করেন। এতে অ্যালকোহলের পরিমাণ থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ। এই আধুনিক মহুয়া দেখতে একদম কাঁচের মতো পরিষ্কার এবং এর সুবাসে থাকে ফল ও ফুলের হালকা মিষ্টি গন্ধ। এটি খেতে অনেকটা বিদেশি ‘গ্রাপ্পা’ বা ‘অ্যাগ্রিকোল রাম’-এর মতো লাগে।

মহুয়ার নতুন রূপ
২০২১ সালে মধ্যপ্রদেশ সরকার মহুয়াকে 'হেরিটেজ লিকার' বা ঐতিহ্যবাহী পানীয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই খাতের চেহারা বদলে গিয়েছে। এখন বাজারে বেশ কিছু প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড পাওয়া যাচ্ছে:
ডেসমন্ডজি (DesmondJi): ডেসমন্ড নাজারেথ নামের এক উদ্যোক্তা প্রথম মহুয়ার এই বাণিজ্যিক রূপান্তর শুরু করেন। গোয়া এবং কর্ণাটকে তৈরি এই ব্র্যান্ডটি এখন যুক্তরাজ্যেও (UK) বেশ জনপ্রিয়।
সিক্স ব্রাদার্স মহুরা (Six Brothers Mahura): মহারাষ্ট্রের সাউথ সিজ ডিস্টিলারিজের তৈরি এই লাক্সারি ব্র্যান্ডটি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বাজারেও পা রেখেছে। ওক কাঠের ব্যারেলে রাখা এদের কিছু লিমিটেড এডিশন মদ মদ্যপ্রেমীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
মন্ড (Mond) ও মোহুলো (Mohulo): মধ্যপ্রদেশের ভিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ এক নারী সমবায় সমিতি এই 'মন্ড' মদটি তৈরি করে। এটি পুরোপুরি আদিবাসীদের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি প্রথম হেরিটেজ ব্র্যান্ড।
মায়াহ স্পিরিট (MAH Spirit): এটি একটি ভারত-ফ্রান্স যৌথ উদ্যোগ। ভারতের জঙ্গল থেকে শুকানো ফুল ফ্রান্সে নিয়ে গিয়ে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে এই মদ তৈরি করা হচ্ছে, যা ইউরোপের নামী বারগুলিতে জায়গা করে নিচ্ছে।
কীভাবে খাবেন এই পানীয়?
আধুনিক ৪টি বা ৪০% অ্যালকোহলযুক্ত মহুয়া আপনি স্রেফ এক টুকরো বরফ দিয়ে সরাসরি (Neat) চুমুক দিয়ে খেতে পারেন। এছাড়া ককটেলে এর ব্যবহার দারুণ জমে। মহুয়া দিয়ে তৈরি ‘মোহিতো’ (Mojito), ‘ডাইকিরি’ (Daiquiri) কিংবা লেবুর রস ও পুদিনা পাতার হাইবল ককটেল এখন শহরের বড় বড় ফাইভ-স্টার হোটেল আর লাক্সারি রিসোর্টে পরিবেশন করা হচ্ছে।
যেভাবে ভারতের নিজস্ব ‘সিঙ্গেল মল্ট হুইস্কি’ বা ‘জিন’ বিশ্ববাজারে নাম করেছে, মহুয়াও সেই পথেই হাঁটছে। তবে এই রূপান্তরের পথটা কিন্তু খুব সহজ নয়। বড় বড় লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলি সফল হলেও, গ্রামের ছোট ছোট নারী সমবায় সমিতিগুলি (যেমন মন্ড) এখনও সঠিক বাজার না পাওয়া বা পেমেন্ট দেরিতে হওয়ার কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাছাড়া এক এক রাজ্যের আবগারি আইন এক এক রকম হওয়ায় পুরো ভারতে এই মদ বিক্রি করা এখনও বেশ কঠিন।
সব বাধা পেরিয়ে মহুয়া আজ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে ডানা মেলছে। এটি কেবল একটি নেশার পানীয় নয়, এটি হলো ভারতের আদিবাসী মানুষের জীবিকা, প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার এবং শত বছরের পুরনো এক ঐতিহ্যের গল্প। বুনো ফুলের সুবাসে ভরা এই দেশি পানীয়টি আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে আরও কতদূর যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!








