কালীই ভরসা, একলা চলো রে নীতিতে কত দূর যাবেন মহুয়া?
দলমত-নির্বিশেষে সকলেই মানবেন, মহুয়ার রাজনৈতিক কেরিয়ার অত্যন্ত স্বচ্ছ। তৃণমূলের নামী অন্য বহু নেতার মতো তাঁর বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই দিয়ে চাপ তৈরি করা যায়নি। তাই দলের এই হাত ধুয়ে নেওয়া তাঁর প্রাপ্য ছিল না বলেই মনে করে একাংশ।

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে...
কালী বিতর্কে সত্যকে শিখণ্ডী করে একলা চলার নীতিই নিচ্ছেন মহুয়া মৈত্র। দল তাঁকে রীতিমতো এক ঘরে করেছে, ঘটনার বাঁক বুঝে কোণঠাসা করতে কালবিলম্ব করেনি বিজেপি। বিতর্ক শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তারির দাবিতে বিজেপি মহিলা মোর্চার সদস্যরা ৫৬টি অভিযোগপত্র জমা করেছেন বউবাজার থানায়। এই অবস্থাতেও মহুয়া মৈত্র নিজের বক্তব্যেই অনড়। ট্যুইটারে তাঁর একের পর এক বিবৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, কোনওমতেই পিছু হটতে রাজি নন তিনি। সম্প্রতি তিনি লিখেছেন, "জয় মা কালী। বাঙালি যে দেবীকে পুজো করে তিনি অকুতোভয়, কাউকে তুষ্ট করা তাঁর স্বভাব নয়।" বলা বাহুল্য, মহুয়ার এই মন্তব্যের শিকড় অনেক গভীর।
Jai Ma Kali!
The goddess Bengalis worship is fearless & non-appeasing.
— Mahua Moitra (@MahuaMoitra)
কালী বিতর্কের শুরু ভারতীয় পরিচালক লীনা মনিমেকলেইয়ের একটি তথ্যচিত্রের পোস্টার নিয়ে। সেই পোস্টারে কালীকে ধূমপানরতা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মহুয়া একটি অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন। বিজেপি তাঁকে একহাত নেওয়া শুরু করে এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই। তাতে মহুয়া দমেননি। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তিনি উত্তর ফেরাতে থাকেন বিজেপিকে। বলেন, "আমি সংঘীদের বলতে চাই, অসত্য বলে আপনারা ভালো হিন্দু হতে পারবেন না।" মহুয়া আরও বলেন, "তারাপীঠে গিয়ে দেখে আসুন সেখানে দেবীকে প্রসাদ হিসেবে কী ধরনের খাবার বা পানীয় দেওয়া হয়।" মহুয়ার বক্তব্য, তিনি ওই সংশ্লিষ্ট পোস্টারটিকে সমর্থন করেননি, ধূমপান শব্দটি উল্লেখই করেননি। তিনি কেবল তথ্য জানিয়েছেন।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'কালী’ নামক একটি তথ্যচিত্রের পোস্টার নিয়ে তুমুল বিতর্ক। চলচ্চিত্রকার লীনা মনিমেকলেই ২ জুলাই ট্যুইটারে এই পোস্টার শেয়ার করেন। তারপর এই নিয়ে উত্তাল হয় দেশ। কী আছে এতে?
সেই বিতর্কিত পোস্টারঘটনা এখানেই শেষ নয়। বরং শুরু। এই বাকবিতণ্ডার মধ্যেই তৃণমূলের তরফ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, মহুয়ার বক্তব্য দল সমর্থন করে না। দলের সঙ্গে মহুয়ার দূরত্ব বাড়তে থাকে জেটগতিতে। মহুয়া তৃণমূলের টুইটার হ্যান্ডেলকে আনফলো করে দেন।
To all you sanghis- lying will NOT make you better hindus.
I NEVER backed any film or poster or mentioned the word smoking.
Suggest you visit my Maa Kali in Tarapith to see what food & drink is offered as bhog.
Joy Ma Tara
— Mahua Moitra (@MahuaMoitra)
বিজেপি-র বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই আপসহীনভাবে মতপ্রকাশ করে গিয়েছেন মহুয়া মৈত্র। লোকসভার অন্দরে তো বটেই, নেটদুনিয়াতেও তিনি বারবার সরব হয়েছেন। এমনকী, এই প্রতিবেদন লেখার দিন সকালেও গ্যাসের দাম নিয়ে নিজের ট্যুইটার হ্যান্ডলে মতপ্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক মহলের মত, মহুয়ার অকাট্য যুক্তি সময়ে সময়ে আসলে হাত শক্ত করেছে তৃণমূলের। জাতীয় স্তরে তৃণমূলের ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে মহুয়ার ব্যক্তিত্ব। সেই মহুয়াই আজ সমর্থন পেলেন না তৃণমূলের। ট্যুইটারে দলকে অনুসরণ করাও বন্ধ করে দিলেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।
এমনকী তৃণমূলের অন্দরেও একাংশ বলছে, মহুয়া ভুল কথা বলেননি। কারণ বাংলায় মা কালী কীভাবে পূজিতা হন, তা প্রতিটি বাঙালিরই জানা। অন্য দিকে বিজেপি তথা আরএসএস ঘরানার হিন্দুত্বের উপাচার-সংক্রান্ত যে ধারণাগুলি, তার সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কাজেই এই ঘটনায় মহুয়ার পাশে না দাঁড়ানো মানে আসলে আরএসএস-এর হাতই শক্ত করা। একাংশ আবার মনে করেন, ভোট বড় বালাই। পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ব্যাটনটা এককভাবে ছাড়তে চায় না তৃণমূল, তাই এই জুতোয় পা গলানো।
দলমত-নির্বিশেষে সকলেই মানবেন, মহুয়ার রাজনৈতিক কেরিয়ার অত্যন্ত স্বচ্ছ। তৃণমূলের নামী অন্য বহু নেতার মতো তাঁর বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই দিয়ে চাপ তৈরি করা যায়নি। তাই দলের এই হাত ধুয়ে নেওয়া তাঁর প্রাপ্য ছিল না বলেই মনে করে একাংশ।
অবশ্য দল দূরত্ব করলেও পথভ্রষ্ট হননি মহুয়া। সত্যকে পুঁজি করে একলা চলার নীতি নিয়েছেন। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলছেন তিনি। ট্যুইটারে লিখেছেন, আমি কোনো কিছুকে ভয় পাই না, তোমাদের অজ্ঞতাকেও নয়, তোমাদের দুষ্কৃতীদেরও নয়, এমনকী তোমাদের পুলিশকেও নয়। তোমাদের ট্রোলারদেরও আমি ভয় পাই না আর সত্যের কোনও অবলম্বনের প্রয়োজন হয় না।
Bring it on BJP!
Am a Kali worshipper. I am not afraid of anything. Not your ignoramuses. Not your goons. Not your police. And most certainly not your trolls.
Truth doesn’t need back up forces.
— Mahua Moitra (@MahuaMoitra)
ঘটনার গতিপ্রকৃতি দেখে এটুকু বলাই যায়, মহুয়ার এই ধর্মযুদ্ধ শুধুই বিজেপির স্বরূপই চেনাচ্ছে না, বুঝিয়ে দিচ্ছে আগামী দিনে ভোটরাজনীতিকে সামনে রেখে কোন পথে হাঁটবে তৃণমূল।





